এক মাসের বেশি সময় ধরে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম কারান্তরীণ রয়েছেন। তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সাদা পোশাকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, মামলা হয়, এবং সেই মামলায় তার জামিন এখনও অনিশ্চিত! আরও কিছুদিন তাকে কারাগারে থাকতে হবে- এমনটাই আলামত।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি গুজব ছড়িয়েছেন। এই গুজব জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী ছিল এমনই অভিযোগ। দেশ-বিদেশে সরকারবিরোধী মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়েছেন। নিরাপদ সড়কের দাবিকে ভিন্নপথে চালিত করতে চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রদ্রোহের মত অপরাধ করেছেন-এমনও অভিমত রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তাসহ সরকারের অনেকেরই। এই অভিযোগগুলো গুরুতর নিঃসন্দেহে। একজন ব্যক্তি একটা সাক্ষাৎকার, এক বা একাধিক ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে এত এত গুরুতর অপরাধ করে ফেলতে পারেন- এটা কৌতূহল উদ্দীপকও।
এই কৌতূহল দিন দিন বাড়ছে যখন বিচারিক আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্ট থেকেও জামিন পান না শহিদুল আলম। হাইকোর্ট জামিন শুনানি গ্রহণ করেননি, ‘বিব্রত বোধ’ করেছেন জামিন শুনানিতে। হাইকোর্টের এই বিব্রত বোধে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ থেকে এই আবেদন চলে গেছে প্রধান বিচারপতির কাছে। এখন প্রধান বিচারপতি এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। ফলে ধারণা করা যায় এই জামিন শুনানিটা স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সমাধান কী হতে পারে সেটা জানে কেবল অনাগত আগামী।
শহিদুল আলমকে প্রথমে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে শিক্ষার্থীদের হঠাৎই গড়ে ওঠা এক আন্দোলনকে ভিন্নখাতে অর্থাৎ সরকার পতনের আন্দোলনে নিয়ে যাওয়ার উস্কানি ও গুজব ছড়ানোর অভিযোগে। গ্রেপ্তারের পর তাকে নিয়ে সরকার ও আওয়ামী লীগের সকল পর্যায়ের নেতাদের প্রতিক্রিয়া ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র ও তার তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এই গ্রেপ্তার নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বেশ কিছু মন্তব্য করেছেন। বিচার কিংবা তদন্তের আগেই তাকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রবণতা ছিল সে সব লিখায়। তিনি এর বাইরে বিদেশি সংবাদ মাধ্যমেও এই গ্রেপ্তারের পক্ষে লিখেছেন। বলেছেন, এই গ্রেপ্তার ছিল যথার্থ।
তার এই মন্তব্যগুলো বিচার প্রক্রিয়া অথবা তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন শঙ্কা ছিল শুরু থেকেই। শেষ পর্যন্ত কী হবে তা এখনই বলা না গেলেও হাই কোর্টের বিচারপতির জামিন শুনানিতে বিব্রতবোধ করায় সে শঙ্কার পালে হাওয়া যে যোগাচ্ছে এনিয়ে সন্দেহ থাকার কথা নয়। ফলে বিচারের আগে জামিন পাওয়া বিষয়ক শহিদুল আলমেরও আইনগত যে অধিকার রয়েছে সে অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কীনা এ নিয়ে ভাবনার দরকার আছে।
শহিদুল আলম বাংলাদেশে খুব বেশি পরিচিত যে ছিলেন তা নয়। নির্দিষ্ট বৃত্তের বাইরে তার পদচারণা ছিল সামান্যই। তিনি আলোকচিত্র শিল্পী, এই প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন তিনি তার বলয়ে। পেয়েছেন খ্যাতি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে। আন্তর্জাতিক এই খ্যাতির ব্যাপ্তি এতখানি বিস্তৃত ছিল যে ১২ জন নোবেল বিজয়ী তার মুক্তি চেয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। নোবেল বিজয়ীদের বাইরে অন্তত ২৮জন আন্তর্জাতিক বরেণ্য ব্যক্তি তার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। এই দলে আছেন ব্রিটেনের লেবার দলীয় এমপি টিউলিপ সিদ্দিকও।
টিউলিপ সিদ্দিকের কথা আলাদা আলোচনার দাবি রাখে কারণ তিনি ব্রিটিশ নাগরিক হলেও তার নাড়ি বাংলাদেশে প্রোথিত। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপন নাতনি তিনি। তার খালা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। তার খালাতো ভাই প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা শহিদুলের শাস্তির দাবি জানানো একজন প্রথম সারির ব্যক্তিত্ব। শহিদুল আলমের গ্রেপ্তার বিষয়ক অসহনীয় পরিস্থিতির আশু সমাধান চেয়ে টিউলিপ এ নিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে বাংলাদেশকে একটা বার্তা দেওয়ারও কথা বলেছেন। এটা কতখানি গুরুত্বপূর্ণ হলে একজন ব্রিটিশ এমপি তার মা-খালার দেশের প্রতি ব্যবস্থা নেওয়ারও কথা বলতে পারেন।
নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে আলোচিত আন্তর্জাতিক এইসব ব্যক্তিদের প্রতিক্রিয়া ও দাবি জানানোতে শহিদুল আলমের মামলা স্পর্শকাতর হয়ে গেছে। সরকারের দায়িত্বশীলদের কিছু মন্তব্যের কারণে এটা সরকারের জন্যেও ইজ্জতের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অনেকেরই অভিযোগ। অথচ অন্য অনেক মামলার মত এটাও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলছে এমন কিছু দৃশ্যমান হলে এমন কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হতো না।
তার জামিন না পাওয়াটা আরও বেশি আলোচিত হয় যখন এই ধরনের অভিযোগে গ্রেপ্তার অভিনেত্রী নওশাবাকে জামিন দেন আদালত এবং সেটা ঈদের আগের দিনেই। ওই সময়ে সরকারপক্ষ থেকে জামিনের জোর বিরোধিতা করা হয়নি বলেও জানা যায়। আলোচিত ওই গ্রেপ্তার ও জামিনের পর অনেকেই এনিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। এমনকি অভিনেত্রী পক্ষে তার স্বামী ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এর জন্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও করেছেন। তাদের এই ধন্যবাদ কিংবা কৃতজ্ঞতাকে হালকাভাবে দেখার অবকাশ নাই, যখন একই অভিযোগে গ্রেপ্তার দুইজনের প্রতি দুই ধরনের ভূমিকা দেখা যায় দায়িত্বশীলদের।
অভিনেত্রী নওশাবা নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকালীন ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছিলেন বলে অভিযোগ ছিল। আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ। এর বাইরে শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে অন্য অভিযোগ তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেছেন। সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জিভূত ক্ষোভের কারণে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে বলেও মন্তব্য করেছিলেন। এটাকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখছে সরকার।
এই অভিযোগ সম্পর্কে বলতে গেলে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন শুরুর পর শিক্ষার্থীদের নয় দফা দাবির দিকেও দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে। সড়কে নিরাপত্তার যে গণদাবি মানুষের সেই দাবির সঙ্গে অন্যতম দাবি ছিল, ‘নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে’। এই দাবি কি শহিদুল আলমের বক্তব্যের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে না? অবশ্যই করে। কারণ অনতি-তরুণ শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নেমে আসার অন্যতম কারণ ছিল সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর সড়কে মৃত্যু নিয়ে হাস্যরস এবং এটাকে বিচিত্র ভঙ্গিমায় ওড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা। নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর এর প্রতিক্রিয়ায় অট্টহাসি দিয়ে জানিয়েছিলেন ভারতে এরচেয়ে বেশি দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যায়, এনিয়ে কথাও হয় না বলে তার দাবি। মন্ত্রীর এই বক্তব্য ও প্রতিক্রিয়া বিক্ষুব্ধ করেছিল সকলকে। এবং এরপর মন্ত্রী নিহত দুই শিক্ষার্থীর বাড়িতেও যেতে বাধ্য হন, ক্ষমাও চান। এটাইতো পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, এক্ষেত্রে কি মিথ্যা কিছু বলেছেন শহিদুল আলম? এছাড়াও কিছুদিন আগেও সারাদেশে তোলপাড় হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনকে সরকার দমন করেছে, এ কারণেও কি ক্ষোভ নাই মানুষের মাঝে? এই ক্ষোভতো বাস্তবতা, এটাকে অস্বীকার করা যাবে না কোনোভাবেই। স্বীকার-অস্বীকারের ঊর্ধ্বে এটা, নিশ্চিতভাবে।
শহিদুল আলমের মামলাকে সরকার যেভাবে ব্যক্তিগতভাবে নিয়েছে তাতে করে তার ন্যায়বিচার প্রাপ্তি প্রশ্নসাপেক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার যশ-খ্যাতি-পরিচিতি তাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখান থেকে তিনি পালিয়ে যেতে পারেন- এমন না। তবু তাকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না, কিংবা আইনানুগ পথের বাইরে জামিনের পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। অথচ জামিন প্রাপ্তি ছিল তাঁর আইনগত অধিকার।
এই লেখায় বলছি না তিনি কোন অপরাধ করেননি, আবার অপরাধ করেছেন এমনও বলতে পারছি না। এখন পর্যন্ত নানা অপরাধের দায়ে ‘অভিযুক্ত’ তিনি। আমাদের স্মরণে রাখা দরকার, পুলিশের খাতায় কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ উত্থাপিত হলেই তাকে অপরাধী বলা যায় না; বিচারিক প্রক্রিয়ায় সে সব অভিযোগের প্রমাণ হলেই তবে তাকে অপরাধী বলা যায়। এক্ষেত্রে আইনের প্রভাবমুক্ত প্রয়োগ না হলে অভিযুক্তের অধিকার লঙ্ঘিত হয়। শহিদুল আলমের মামলার ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাবশালীগণ যেভাবে তদন্ত ও বিচারের আগে তাকে অপরাধীর সার্টিফিকেট দিচ্ছেন তাতে করে এক্ষেত্রে ন্যায়বিচার যে সম্ভব সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। ফলে সত্যিকার ভাবে অপরাধী হলেও সরকারি বিবিধ ভূমিকার কারণে পুরো বিচারপ্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।
শহিদুল আলম কোন দোষ করে থাকলে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিচার হোক এটা চাইবো। তবে বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় তাকে কারান্তরীণ করে রাখা হয়েছে তাতে করে আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে, তিনি জামিন প্রাপ্তির আইনগত ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এটা জনকল্যাণকামী ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল কোন সরকারের ভূমিকা হতে পারে না।
তাই আইনকে নিজের গতিতে চলতে দিন। যশ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি কোন অভিযুক্তের অধিকার প্রাপ্তি ও নাগরিক অধিকার ভোগের প্রতিবন্ধকতা হতে পারে না। প্রশাসন ও সরকার কারও প্রতি বিরাগভাজন হতে পারে না, এটা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম নয়; এটা স্রেফ ব্যক্তির বিষয়, যদিও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হওয়ার শপথ নেন দায়িত্বগ্রহণকালে।
শহিদুল আলমকে কারাগারে রেখে সরকার যে লাভবান হচ্ছে তা নয়। তবে এর মাধ্যমে সরকারের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে দেশে-বিদেশে। বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের এই দায় যেমন সরকারের, তেমনি এ থেকে উত্তরণের দায়িত্বও তাদের। বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে আরও উজ্জ্বল করবে সরকারের কাছে সেটাই আমাদের প্রত্যাশা, চিরায়ত।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








