খুলনা সিটি কর্পোরেশন (খুসিক) নির্বাচনের দু’দিন আগে, ১৩ মে রাতে, একটি টেলিভিশনের টকশোতে বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব বেশ জোরের সাথেই বললেন, নির্বাচনে এবার তারা আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে অন্তত এক লাখ ২৫ হাজার ভোট বেশি পেয়ে জিতবেন।
তার যুক্তি ছিল, ২০১৩ সালের খুসিক নির্বাচনে তারা আওয়ামী লীগের একই প্রার্থীর বিরুদ্ধে জিতেছিলেন প্রায় ৬২ হাজার ভোটে। দেশের অবস্থা ইতোমধ্যে, তার ভাষায়, আরও অনেক ‘খারাপ’ হয়েছে, ভোটাররা আরও বেশি করে তাদের দিকে ঝুঁকেছে। উপরন্তু, তাদের এবারের প্রার্থী আগেরবারের প্রার্থীর চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। তাই তারা এবার ‘ডাবল’ ভোটে জিতবেন।
কিন্তু নির্বাচনের ফল বেরোলে দেখা গেল, বিএনপি প্রার্থী এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে প্রায় ৬৬ হাজার ভোটে হেরেছেন। ঘটনাটা খুব খেয়াল করার মতো। গতবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী যত ভোটে হেরেছিলেন এবার তিনি তার চেয়েও কিছু বেশি ভোটে জিতেছেন।
এটা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ছয়-সাত মাস বাকি; সঙ্গত কারণেই গোটা জাতির নজর ছিল এর ওপর। প্রায় সব সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, স্থানীয় নির্বাচন হলেও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে জনগণ কী ভাবছে তা বোঝা যাবে খুসিক নির্বাচনের ফল দেখে। তাদের এ কথার রেশ ধরে বলা যায়, খুসিক নির্বাচন হলো প্রভাতের সূর্যেও মতো যা দেখে বোঝা যায় দিনটা কেমন যাবে।
খুলনা শহর সম্পর্কে একটা কথা চালু আছে, এটা হল সবুর খানের শহর, যা এক সময়ে ছিল মুসলিম লীগের ঘাঁটি। মিডিয়াতেও বলা ও লেখা হচ্ছিল যে সংসদের খুলনা-২ আসন এ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত, সেখানে ভোটার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে গোটা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রায় ধুয়ে-মুছে গেলেও এ আসনটি জিতেছিল বিএনপি। প্রার্থী ছিলেন নজরুল ইসলাম মঞ্জু, যিনি এবারের খুসিক নির্বাচনেও দলটির প্রার্থী ছিলেন। গত নয় বছরে সংঘটিত নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার ফিরিস্তি তুলে ধরে এটাও বলা হচ্ছিল যে দেশের অন্যান্য অংশের মতো খুলনার মানুষও সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ, তারা সরকারের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। বিএনপি তো রীতিমত দাবিই করে বসেছিল যে তাদের নেত্রী খালেদা জিয়া হলেন ‘গণতন্ত্রের জননী’ আর সরকার গণতন্ত্রকে ‘হত্যা’ করেছে; তিনি দুর্নীতির দায়ে জেলে গেলেও মানুষ তা মেনে নেয়নি, যার প্রতিফলন খুলনার ভোটে দেখা যাবে।
সবচেয়ে বড় কথা হল, দেশের সুশীল সমাজের প্রভাবশালী অংশটি এবং তাদের মুখপত্র বলে পরিচিত দুটি পত্রিকা, দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ওপর যাদের প্রভাব বিপুল এবং সম্ভবত এ কারণে, বেশিরভাগ মূলধারার গণমাধ্যম খবর পরিবেশন ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যাদেরকে অনেকাংশেই অনুসরণ করে, বিএনপি’র উক্ত প্রচারণার সাথে সুর মিলায়। তারাও বলতে থাকেন যে আওয়ামী লীগ উন্নয়নের নামে গণতন্ত্রকে দুর্বল করে দিয়েছে, খুলনার ভোটে বোঝা যাবে মানুষ গণতন্ত্র না উন্নয়ন চায়। এসব প্রচারণা এতটাই প্রবল ছিল যে, এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক সমর্থকও বিশ্বাস করতে পারেননি যে তাদেও প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক খুসিক নির্বাচনে জিতবেন।
কিন্তু বাস্তবতা হল, খালেক সাহেব শুধু জিতেছেন তা নয়, ২০১৩ সালে যত ভোট কম পেয়েছিলেন এবার তার চেয়েও বেশি ভোট পেয়েছেন। অর্থাৎ খুলনার ভোটাররা ২০১৩ সালে বিএনপিকে যেভাবে ঢেলে দিয়েছিলেন এবার আওয়ামী লীগকেও সেভাবেই ঢেলে দিয়েছেন। এ থেকে কি এটাও বলা যায় না যে ২০১৩ সালে দেশে যে রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল ইতোমধ্যেই তা পাল্টে গেছে?
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ভুমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পর থেকেই আওয়ামী লীগ একটার পর একটা প্রলয়ঙ্করী ঘটনার মুখোমুখি হতে থাকে; এগুলোর যে-কোন একটাই মধ্য এশিয়ার কোন প্রজাতন্ত্র হলে যেখানে কিছুদিন পরপর লাল-নীল-বেগুনি বিপ্লব ঘটতে দেখা যায় সরকার পতনের জন্য যথেষ্ট ছিল।
দলটি সরকার গঠন করে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে আর ফেব্রুয়ারি মাসেই জনমনে প্রবল শোক আর আতঙ্ক ছড়িয়ে ঘটে ‘বিডিআর বিদ্রোহ’, যেখানে ৫৭ জন সিনিয়র ও চৌকষ সেনা অফিসার খুন হন এবং এর সুযোগ নিয়ে কোন কোন মহল থেকে সেনাবাহিনীকে ক্ষমতা দখলের উস্কানি দেয়া হয়। সরকার অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় এ পরিস্থিতি সামাল দেয়।
কিন্তু এর রেশ কাটতে না কাটতেই, ২০১০ সালে, শেয়ার বাজারে ঘটে এক মহা আর্থিক কেলেঙ্কারি যার ফলে কয়েক লাখ ব্যক্তি-বিনিয়োগকারী সর্বসান্ত হওয়ার পাশাপাশি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে প্রচণ্ড সরকারবিরোধী ক্ষোভ দেখা দেয়। এ ক্ষোভের মাঝেই ২০১১ সালে উন্মোচিত হয় হলমার্ক কেলেঙ্কারি যার মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা হলমার্কনামী এক অর্বাচীন কোম্পানির দখলে চলে যায়। আবার এ নিয়ে যখন তোলপাড় চলছিল তখনই বিশ্বব্যাংক সরকারের শীর্ষ কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদ্মাসেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রেও অভিযোগ তুলে এর অর্থায়ন থেকে সরে যায়।
এখানে বিশেষভাবে বলা দরকার যে শেয়ার ও হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো ঘটনাবলির পেছনে সরকারের কিছু ভুল পলিসি এবং সরকার ঘনিষ্ঠ কিছু মহলের লুটেরা মানসিকতা কাজ করলেও পদ্মাসেতু প্রকল্পে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ ছিল একেবারেই বায়বীয়। সর্বশেষ এ সংক্রান্ত এক মামলায় কানাডার আদালতের দেয়া এক রায়েও বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু প্রথমোক্ত দুই ইস্যুতে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী যে প্রচারণা হয়েছে, পদ্মাসেতু ইস্যুতে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। এসব প্রচারণার ফলে সরকারের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একটা অংশ, বিশেষ করে যারা প্রতিষ্ঠার পর থেকে শত ঝড়-ঝঞ্জার মুখে দলটিকে আগলে রেখেছিলেন, এমন পরিস্থিতিতে হতাশ হয়ে পড়েন।
পরিস্থিতিটা আরও জটিল হয়ে পড়ে ২০১৩ সালে, যখন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে সংঘটিত অপরাধের দায়ে আদালত কর্তৃক একের পর এক শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীকে সাজা প্রদান শুরু হয়। একদিকে আসামীপক্ষের লোকেরা, যাদেও বেশিরভাগ ছিল জামাত-বিএনপি’র লোক, এ বিচারকে বিতর্কিত করার লক্ষ্যে দেশে-বিদেশে নানা অপপ্রচার চালায়, অন্যদিকে প্রগতিশীল বলে পরিচিত এ বিচারের পক্ষের লোক বলে দাবিদার গোষ্ঠীগুলোও, বিশেষ করে কোন আসামীর ফাঁসির বদলে যাবতজীবন সাজা হলেই, বলতে থাকে যে এসব রায় জামাতের সাথে সরকারের আঁতাতের ফল। এ প্রচারণার ফলে, বিশেষ করে, যুদ্ধাপরাধের বিচারে সরকারের ভূমিকা নিয়ে জনমনে একপ্রকার ধোঁয়াশা তৈরি হয় এবং এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের একটা দাবি পূরণের পরও সরকার এ থেকে প্রাপ্য প্রশংসা থেকে বঞ্চিত হয়।
শুধু কি তাই, একই সময়ে গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মতো ঘটে আরও একটি ঘটনা। কথিত নাস্তিকদের ঠেকানোর নামে হেফাজতে ইসলাম নামক একটি চরম প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠন মূলত জামাত-বিএনপি’র ইন্ধনে গজিয়ে ওঠে। তারা রাজধানীর শাপলা চত্বরে জড়ো হয়ে অনির্দিষ্টকাল অবস্থানের ঘোষণা দেয়। দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র থেকে এদের সরানোর লক্ষ্যে সরকার স্বাভাবিক কারণেই বল প্রয়োগ করে। আর সাথে সাথে শুরু হয় সরকার ওই উচ্ছেদ অভিযানের মাধ্যমে হেফাজতের ‘অন্তত আড়াই হাজার’ লোককে মেরে ফেলেছে বলে প্রচারণা। কয়েকটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও মিডিয়াও এ অপপ্রচারে যোগ দেয়, যদিও তারা এ দাবির সপক্ষে কোন প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয়।
এ প্রচারণাটাও ধর্মভীরু আওয়ামী সমর্থকদেরকে দলের পক্ষে সক্রিয় হতে নিরুৎসাহিত করে। শুধু তা নয়, ওই একই বছরে খুসিকসহ যে পাঁচটা সিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেগুলোতে জামাতের পুরুষ ও নারী কর্মীরা হেফাজতের এ প্রচারণাটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়, তারা গণহত্যার ভুয়া ছবি দেখিয়ে সাধারণ নারী-পুরুষ ভোটারদেরকে কোরআন স্পর্শ করিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেওয়ার শপথ করায়।
যা হোক, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর, এ নির্বাচনটি বিএনপি-জামাত ও তাদের বন্ধুরা বয়কট করে এবং আওয়ামী লীগ খুব সহজেই দু’তৃতীয়াংশ আসন জেতে, পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি-জামাত ব্যাপক জ্বালাও-পোড়াও কৌশল অবলম্বন করে, এতে বহু মানুষ প্রাণ ও সম্পদ হারায়, আর এর ফলস্বরূপ দল দুটোর নেতা-কর্মীরা সরকারের তরফ থেকে ব্যাপক হামলা-মামলার শিকার হয়। এর ধকল দল দুটো এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এর পাশাপাশি সরকার উন্নয়ন কর্মকা-ের গতি জোরদার কওে যার সুফল একেবাওে তৃণমূলের মানুষেরাও কিছুটা হলেও ভোগ করছে।
এ সময়ে সরকার আরও কিছু কৌশল নেয় যা ভোটের রাজনীতিতে বিএনপিকে দুর্বল করে দেয়। যেমন, তারা নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে কয়েকজন মিত্রকে বের করে আনে এবং হেফাজতের মূল নেতৃত্বকেও একই কায়দায় বিএনপি থেকে বিচ্ছিন্ন করে। এবারের খুসিক নির্বাচনে যে আগেরবারের মতো ‘হেফাজতি ঝড়’ দেখা যায়নি তা এ কৌশলেরই ফসল।
খালেক সাহেবের জয়ের পেছনে আরও কিছু বিষয় ছিল যা আগেরবার দেখা যায়নি। যেমন ভোটারদের কাছে প্রার্থী হিসেবে তার গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। আবার নির্বাচনী প্রচারে আওয়ামী লীগের সকল নেতা-কর্মী একাট্টা হয়ে কাজ করেছে, যার প্রভাবে, আগেরবার যেখানে দলীয় কাউন্সিলর প্রার্থীদেরকে ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি করতে দেখা গেছে, এবার তারা মেয়রের জন্যও ভোট চেয়েছেন। এমনকি বিএনপি’র কোন কোন কাউন্সিলর প্রার্থীকেও খালেক সাহেবের পক্ষে ভোট চাইতে দেখা গেছে, যে কারণে বিএনপিকে অন্তত একজন কাউন্সিলর প্রার্থীকে নির্বাচনের মাঝপথে দল থেকে বহিষ্কার করতে হয়েছে।
মোদ্দা কথা, ক্রিকেটের পরিভাষায় বলা যায়, খুসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ লাইন-লেন্থ ফিরে পেয়েছে, যে-কারণে দলটি শুধু মেয়র পদেই নয় সিংহভাগ কাউন্সিলর পদেও জয় পেয়েছে। এ লাইন-লেন্থ ধরে রাখতে পারলে শুধু সামনের সিটি নির্বাচনগুলোতেই নয় আগামী জাতীয় নির্বাচনেও জয়ের ব্যাপারেও দলটি আশাবাদী হতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







