প্রবাদ আছে যে, ভালোবাসা আর যুদ্ধে অসঙ্গত বলে কিছু নেই। সত্য হলে যুদ্ধাপরাধ বলে কিছু থাকে না। প্রকৃত পক্ষে যুদ্ধ কখনও ন্যায়-অন্যায়ের ঊর্ধ্বে নয়, যেমনটি নয় ভালোবাসা। এটাই সত্য সঙ্গতও।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সহসম্পাদক বদরুল আলম ভালোবাসার দোহাই দিয়ে যেভাবে নার্গিস নামে এক কিশোরীকে খুন করতে গিয়েছিল তা সত্যিই বেদনাদায়ক। ধৃত বদরুল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে,‘নার্গিসের সঙ্গে শেষ বোঝাপড়া করতে সঙ্গে চাপাতি নিয়ে গিয়েছিলাম। মুখোমুখি হতে চাইলে সে এড়িয়ে যায়। এরপর রাগ করে কোমরে থাকা চাপাতি দিয়ে বান্ধবীদের সামনেই নার্গিসকে কোপাতে থাকি।’ মেয়েটিকে বিশ্বাসঘাতক মনে হওয়ায় ক্রোধান্ধ হয়ে সে তাকে শাস্তি দিয়েছে। সোহাগ করলে শাসন করা যায়, এমনটাই তার ধারণা।
অতএব প্রকাশ্য রাস্তায় সে মেয়েটিকে ছুরিকাঘাত করেছে। ভালোবাসায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার যন্ত্রণা নিশ্চয় ছেলেটিকে কুরে খাচ্ছিল। কিন্তু তার জন্য মেয়েটিকে কুপিয়ে জখম মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার তার আছে, এমন মনে করবার কারণ কী? কারণ পুরুষতন্ত্রে ভালোবাসা বহুলাংশে যুদ্ধ। তদুপরি অন্যায় যুদ্ধ। যুদ্ধ মানে দখল। দখল করবার যুদ্ধ, দখল না ছাড়বার যুদ্ধ। আমাদের দেশে ছেলেরা দখল হারাবার আশঙ্কা দেখা মাত্র সক্রিয় হয়। এমনিতে পুরুষ ‘না’ শুনতে পছন্দ করে না। সিদ্ধান্ত নেবার হক শুধু তারই আছে বলে মনে করে। প্রেমিকা যদি না বলে, সেটি প্রথমত সরাসরি তার পৌরুষে গিয়ে আঘাত করে। দ্বিতীয়ত, না বলবার স্পর্ধা আদৌ সে দেখাবে কেন, এই মৌলিক প্রশ্নটি তাকে সংক্ষুব্ধ করে তোলে। দুঃখ, বেদনা ইত্যাদি অনেক পরের কথা। পুরুষ বিরহে কাতর হতে পারে, প্রত্যাখ্যান বা প্রতারণায় সাধারণত পরাজয়ের মনোভাবটিই মুখ্য হয়।
মেয়েটি অন্য পুরুষের প্রতি আসক্ত হওয়া মানে পরিত্যক্ত প্রেমিকের দ্বিগুণ জ্বালা। সে শুধু মেয়েটির কাছেই পরাজিত নয়, অন্য একটি পুরুষের কাছেও পর্যুদস্ত। পুরুষতন্ত্রে এটাই মরণফাঁদ। সে পুরুষ কে হারতে শেখায় নাই। পরাজয় কে বরণ করবার মধ্যেও যেকোনও শিল্পিত সৌন্দর্য থাকতে পারে, তা চেনায় নাই। পুরুষ শুধু জানে, এ বসুন্ধরাবীর ভোগ্যা। পুরুষ কে তার অভীষ্ট ছিনিয়ে নিতে হবে। একান্ত না পারলে, যা আপন হস্তগত হয় নাই, তা অপরে যেন না পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। ছাড়বার উপক্রম করলে তাকে প্রয়োজনে ছিন্ন ভিন্ন করে দিতে হবে, অ্যাসিডে ঝল সে দিতে হবে! না হলে কাপুরুষ দুর্নাম জুটবে!
সিলেটের যে যুবক তার কথিত ‘প্রেমিকা’কে রাস্তার ও পর কুপিয়ে কুপিয়ে ভয়াবহ জখম করল, তার এমন নৃশংতার কারণ কী? অনেকে মনে করেন, সে ক্ষমতাসীন দলের সদস্য বলেই সে এমন বেপরোয়া হয়েছে। কথাটা কী ঠিক? ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলে মানুষ বেপরোয়া হয়, বেপরোয়া হতে দল সবসময়ই উস্কানি দেয়-এ কথা ঠিক। কিন্তু, ক্ষমতাসীন দলের সদস্য হওয়ার কারণেই সে এমনটা করেছে-তা ঠিক নয়। প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে নারীর উপর চড়াও হয়েছে-এমন উদাহরণ আমাদের সমাজে প্রচুর রয়েছে। তারা সবাই ছাত্রলীগ নয়। প্রকৃত পক্ষে এর পেছনে আছে ইগো পুরুষতন্ত্র, নিজের পুরুষ বা ব্যাটা প্রমাণের ঔদ্ধত্য।
প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে এত তার কষ্ট হয়েছে যে সেসব জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল? আমি এতদিন ধরে তোমার পিছু নিচ্ছি, তোমায় আমার প্রেম জানাচ্ছি, আমি তোমাকে চাই, মানে তোমাকে দখল করতে চাই, অতএব তুমি শুধু আমার মূল্যে আমার কাছে চলে এসো। আমি চাইছি, এটাই কি শেষ কথা নয়? তোমাকে আমার হতে হবে, হতে ই হবে, ব্যস। সেটা হল না। মেয়েটি সাড়া দিল না। অতএব এই বীর পুঙ্গব ঠিক করলেন তোমাকে চরম মূল্য দিতে হবে। আর সেটা আমি নিজের হাতে আদায় করে নেব, রাজপথেরও পর, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে ওই যুবক হয়তো বলবে, তার না-পাওয়ার যন্ত্রণা সে সহ্য করতে পারেনি। আরও অনেক প্রত্যাখ্যাত পুরুষের মতোই। যারা তাদের না-পাওয়া মেয়েটি কেবলে আমার যন্ত্রণার মূল্য তুমি বুঝলে না, অতএব তোমায় যন্ত্রণা দিয়েই বুঝিয়ে দেব, আমার যন্ত্রণাটা কতখানি ছিল। তোমার পিছু নিয়ে জীবন অতিষ্ঠ করব, তোমায় অ্যাসিড ছুঁড়ব, তোমায় কিডন্যাপ করব, তোমায় ধর্ষণ করব, তোমায় কুপিয়ে কুপিয়ে খুন করব।
আমাকে প্রত্যাখ্যান করে তুমি মন্ডা-মিঠাই জীবন কাটাবে আর আমি দেবদাস হব? আমি আঙুল চুষব? আমি সংযত হব? কখনওই নয়। আমি তো তাহলে ছোট হয়ে গেলাম। বন্ধুরা আঙুল তুলে বলবে না যে, ‘এবাবা, ফেকলু, তোকে মেয়েটা পাত্তা দিল না! তোর ভালোবাসা মাড়িয়ে চলে গেল।’ তাহলে এই ‘আমি’টা তো সবার কাছে ছোট হয়ে গেল। আমি যে বড়, সে প্রমাণ তো আমায় করতেই হবে। অতএব আমি মারব, অ্যাসিড ছুঁড়ব, ইত্যাদি ইত্যাদিতেই গো-যাপন করব। পুরুষ-ইগো।
এই ইগো-পুরুষের দাবি মূলত দু’টি। এক, আমার কাছে সব থাকতে হবে। আর দুই, অন্যেরা আমাকে সমঝে চলবে। এ দুইয়ের নড়চড় হলেই হাহাকার, ক্রোধ, প্রতিশোধ! কারণ তার সবটি গেল। কেন? তার তো নিজের বলতে কিছুটি নেই। সে তো নিজের আনন্দের উপকরণ নিজে খুঁজে নিতে শেখেনি। অন্যের পাত্তা তাকে মহান করেছে। এবার অন্যে পাত্তা না দিলে সে যায় কোথায়? সে তখন অন্যের ক্ষতি করে। নিজে ভালো থাকা তার কাছে যথেষ্ট নয়, অন্যের খারাপ থাকাটাও জরুরি। কী সাংঘাতিক অধঃপতন! খুন, ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপ, চরিত্র হনন পরাভূত প্রেমে প্রতিহিংসাই মলম। উৎকৃষ্ট নমুনা, শেক্সপিয়ারের ওথেলো। মনোবিদ্যাতেও ‘ওথেলো এফেক্ট’ নামে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। বিশ্বস্ততাকে বিশ্বাসঘাতক বলে ভুল করবার অভ্যাসকে ওই নামে ডাকা হয়ে থাকে।
কিন্তু ডেসডিমোনা বাস্তবিকই যদি বিশ্বাসঘাতিনী হতেন, তবে কি তার হত্যা বৈধতা লাভ করত? প্রশ্নটি তুলবার সময় এসেছে। ভালোবাসার লিঙ্গবৈষম্য এবং ক্ষমতার আস্ফালনকে প্রেমের আরকে চুবিয়ে রাখে। আত্মনাশকে আত্মত্যাগ এবং শোষণ-পীড়নকে উদ্দাম প্রণয়োচ্ছ্বাস রূপে চালিয়ে দেয়। সাহিত্যের পাতায়, সিনেমার পর্দায়, প্রতিভাবানের জীবন চর্যার আলোচনায় মানব মনের অন্ধকার দিকগুলি সযত্নে আলোকিত হয়। জরুরি কাজ নিঃসন্দেহে। হিংস্রতা, মনোবিকার এবং অপরাধ মনস্ক তার উৎস ভূমি অবশ্যই চিহ্নিত হোক। কিন্তু তাকে মহিমান্বিত করবার বিপজ্জনক প্রবণতাটি যেন উঁকি না দেয়। যেন ভুলে না যাই, দিনের শেষে মহান প্রেমিক নন, ওথেলো একজন মনোরোগীমাত্র। হত্যাকারী। অপরাধী!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








