একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকার সম্পন্ন হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের গণফোরাম, কৃষক শ্রমিক জনতালীগ, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য সহ ২০ দলীয় জোটের প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল নিজ নিজ মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাক্ষাতকারও শেষ করে প্রার্থীদের খসড়া তালিকা প্রস্তুত করেছে। এবার অপেক্ষা প্রার্থীতা নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়ার।
এই দুটি রাজনৈতিক জোটের নির্বাচনী একক প্রতীক আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। ধানের শীষ নিয়েই সবাই নির্বাচন করবেন বলে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে।
নির্বাচনকে সামনে রেখে এই জোট দুটি এই মুহূর্তে কিছু কর্মপ্রক্রিয়ায় ব্যস্ত আছে যেমন- আসন বণ্টন, নির্বাচনী ইশতেহার চূড়ান্তকরণ, নির্বাচনী লিফলেট ও পোস্টার কেমন হবে, ভোট কারচুপি বন্ধে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ ইত্যাদি।
প্রায় সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো সমস্যা না হলেও নিজেদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে কিছুটা দেন দরবার চলতে পারে এই জোটের নেতাদের মধ্যে। ইতোমধ্যে বিএনপি প্রায় ৩ হাজার মনোনয়ন প্রত্যাশীর সাক্ষাতকার নিয়েছে। গণফোরাম নিয়েছে প্রায় ৩৫০ প্রার্থীর, জেএসডি ৫৪৭ জনের, নাগরিক ঐক্যও সাক্ষাতকার নিয়েছে। আরো আছে কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতালীগ, তাদের প্রার্থীর সাক্ষাতকার নিয়েছে ৬০টি আসনের। এছাড়া জামায়াতসহ ২০ দলের অন্য দলগুলোও যার যার দলের প্রার্থী নিয়ে প্রস্তুত রয়েছে। বলা হচ্ছে, এর মধ্যে ঐক্যফ্রন্টকে সবচেয়ে বেশি ভোগাবে জামায়াত।
আসন বণ্টন বিষয়ে আগামী কাল বা পরদিন মধ্যে বৈঠক হবে বলে জানা গেছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐক্যফ্রন্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বৈঠক হলেও এরই মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে ভেতরে ভেতরে অনেক কথা হচ্ছে। দেন দরবার চলছে। আশা করছি, আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে একটি সিদ্ধান্ত হবে।
কে কোন আসনে জনপ্রিয় তা দেখে পরস্পরকে ছাড় দেয়ার একটি পরিবেশ তৈরি করছে জোটের নেতারা। তারা চায় যেকোনো উপায়ে বিজয়। তবে কতিপয় প্রভাবশালী নেতা ছাড় দেয়ার ব্যাপারে অনড় থাকলেও সমস্যা হবে না বলে জানা গেছে।
ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনী ইশতেহার প্রায় সম্পন্ন করেছে। আগামী রোববার ইশতেহার চূড়ান্ত হবে বলে জানিয়ছেন ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয় কমিটির অন্যতম সদস্য ও নাগরিক ঐক্যের নেতা মুমিনুল ইসলাম।
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ঘোষিত ভিশন ২০৩০-এর আলোকেই তৈরি হচ্ছে এ ইশতেহার। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রণীত ইশতেহারে সরকার, সংসদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, কৃষি, পররাষ্ট্রনীতিসহ সরকারের প্রতিটি সেক্টরকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
সুশাসন, স্বচ্ছতা ও স্ব অবস্থান- এ তিন অঙ্গীকারের মধ্যে দিয়ে নবধারার রাজনীতি ও সরকার গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকছে ইশতেহারে। থাকছে নতুন নতুন চমক ও অঙ্গীকার। ‘জনগণ এ রাষ্ট্রের মালিক’- এ ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত করার নির্দেশনা সংবলিত ইশতেহারে সব মত ও পথ নিয়ে বাংলাদেশকে একটি রেইনবো ন্যাশন বা রংধনু জাতিতে পরিণত করার বিস্তারিত ঘোষণা থাকবে। গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপরও।
ঐক্যফ্রন্ট সূত্রে জানা যায়, ইশতেহার প্রণয়ন কমিটিতে রাজনীতিবিদ ছাড়াও রয়েছেন শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতের বিশেষজ্ঞ। ইতিমধ্যে ‘দেশের মালিক জনগণ, ধানের শীষে ভোট দিন’; ‘দেশ বাঁচাতে মানুষ বাঁচাতে, আনবে পারিবর্তন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ তিনটি স্লোগানের খসড়া তৈরি হয়েছে। এছাড়া শান্তি ও কল্যাণকর সংসদীয় গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরির জন্য জাতির উদ্দেশে ৫ প্রতিশ্রুতি ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারের প্রাথমিক খসড়ায় রয়েছে। যা ইশতেহার প্রণয়ন কমিটিতে যুক্ত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রস্তাব করেছেন। প্রস্তাবিত প্রতিশ্রুতিগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে। বাস্তবতা বিবেচনায় কিছুটা পরিবর্তন এলেও এসব প্রতিশ্রুতি প্রাধান্য পাবে ইশতেহারে।
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, নির্বাচনের ইশতেহার প্রস্তুত হচ্ছে। বেগম খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০ কে গুরুত্ব দিয়ে এই ইশতেহার তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত উন্নয়ন, সুশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তরুণদের গুরুত্ব, বেকারত্ব হ্রাস, সম্পদের সমবণ্টন ইত্যাদি বিষয়।
রাজনীতিতে প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে নতুন ধারার সৃষ্টি, ক্ষমতায় গেলে জাতীয় সংসদকে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি থাকবে ইশতেহারে। আগামীতে ক্ষমতায় গেলে প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন আনার প্রত্যয় থাকবে। সুশাসন, সুনীতি ও সু-সরকারের (থ্রি-জি) সমন্বয় ও বৃহত্তর জনগণের সম্মিলনের মাধ্যমে ‘ইনক্লুসিভ সোসাইটি’ গড়ার অঙ্গীকার থাকবে এতে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প নিয়ে উন্নত বাংলাদেশের উপযোগি ইশতেহার তৈরি হবে।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর যে একক ক্ষমতা তা হ্রাস করে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যের ব্যাপারটিও থাকবে ইশতেহারে।
ঐক্যফ্রন্ট সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে ১১টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেসে তা সমন্বয় করা হবে ইশতেহারে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার প্রণয়নে যে কমিটি করা হয়েছে তাতে বিএনপি থেকে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহফুজ উল্লাহ, গণফোরামের শফিক উল্লাহ, জেএসডির শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ইকবাল সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের ডা. জাহেদ উর রহমান রয়েছেন। আর কমিটির মূল দায়িত্বে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
ইশতেহার তৈরি ছাড়াও ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনী পোস্টার, ব্যানার, লিফলেট তৈরির কাজ করছে। এবিষয়ে সমন্বয় কমিটি নিয়মিত বৈঠক করছে।
আগামী নির্বাচনকে তারা বিপ্লব হিসেবে নিয়েছে। বিএনপির তারেক রহমানেরও কথা তা। বিপ্লব হিসেবে নিয়ে অবশ্যই জিততে হবে। সেই টার্গেট নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ঐক্যফ্রন্ট। এ জন্য ভোট কেন্দ্রে পাহারা দেবে জোটটি। জনগণের ভোট নিশ্চিত করতে যা যা করার করবে। সেভাবেই প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করছে বলে জানা যায়।
সেই সঙ্গে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের উপর চাপ প্রয়োগের ব্যাপারটিও অব্যাহত রেখেছে ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোট।








