আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। এই রায় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে অসহিষ্ণুতা, উদ্বেগ ও উত্তেজনা। বিএনপিওয়ালারা মনে করছেন, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, সাজানো। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ বলছে, এই মামলায় তাদের কোনো হাত নেই। আইনের স্বাভাবিক নিয়মেই এই মামলা পরিচালিত হয়েছে। এতে তাদের কোনো দায় নেই।
এই মামলার রায়কে ঘিরে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি এসেছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে। যদি এই রায়ে খালেদা জিয়ার সাজা হয়, তাহলে ব্যাপক আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির নেতারা। বিএনপির কোনো কোনো নেতার মতে, দলের চেয়ারপার্সনের মামলায় ‘নেতিবাচক’ কোনো রায় হলে তার পরিণতি ‘ভয়াবহ’ হবে।
পক্ষান্তরে আওয়ামী লীগ মাঠে থেকে বিএনপির যে কোনো নৈরাজ্যকে মোকাবিলা করার ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, খালেদা জিয়ার মামলার রায় নিয়ে দেশে আবার জ্বালাও-পোড়াও হলে বিএনপিই তাতে পুড়ে ‘ছারখার হয়ে যাবে’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও বলেছেন, রায় ঘিরে কেউ ‘বিশৃঙ্খলা বা ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের’ চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নেবে।
ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দিন সরকারের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার অভিযোগে বলা হয়-বিএনপি-জামায়াত জোটের ২০০১-২০০৬ মেয়াদের সরকারের সময় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বিএনপি শুরু থেকে এই মামলার ব্যাপারে আইনি লড়াই চালালেও শেষ সময়ে এসে অভিযোগ করছে যে, বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্যই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ‘অন্তঃসারশূন্য’ এই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছে।
ইতিমধ্যে ৮ ফেব্রুয়ারির রায়কে ঘিরে ব্যাপক ধরপাকড় অভিযান চালানো হচ্ছে। বিএনপির বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ তাদের নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যদি ৮ তারিখে মাঠে থাকে, পক্ষান্তরে রায়ের পর যদি বিএনপির কর্মীসমর্থকরা প্রতিবাদ কিংবা সহিংসতায় লিপ্ত হয়, তাহলে সংঘাতময় পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে।
গত কয়েক দিনে অনেকের মনেই প্রশ্ন, ৮ তারিখে কি হবে? খালেদা জিয়ার কি শাস্তি হবে? খালেদা জিয়ার যদি শাস্তি হয় তাহলে বিএনপি বা ২০ দল কি করবে? কোনো কোনো গণমাধ্যমে এমন খবরও প্রকাশিত হয়েছে যে, শেষ পর্যন্ত বেগম জিয়ার যদি শাস্তি হয় এবং সেটি এমন শাস্তি যার ফলে বেগম জিয়া, তারেক রহমান প্রমুখ নেতা নির্বাচনের অযোগ্য হয়ে পড়েন তাহলে নাকি বিএনপি তথা ২০ দল হরতাল অবরোধ মিছিল প্রভৃতি রাজনৈতিক কর্মসূচি দেবে। এ ধরনের কর্মসূচি যদি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট সত্যিই ঘোষণা করে, তাহলে অনেকেরই আশংকা, এর ফলে দেশের রাজনীতিতে প্রবল উত্তেজনার সৃষ্টি হবে। এবং সেই উত্তেজনা চূড়ান্ত পরিণামে সহিংসতার জন্ম দিতে পারে।
নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এই মামলার রায়কে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। অনেকেরই আশঙ্কা, এ মামলায় যে রায়ই হোক না কেন, সেটা রাজনীতির মাঠে উত্তাপ ছড়াবে। কারণ বিএনপি আগেই ঘোষণা দিয়েছে ‘নো খালেদা জিয়া, নো ইলেকশন’। অন্যদিকে ৫ জানুয়ারির মতো আবার একটি বিতর্কিত নির্বাচন করা সরকারের জন্য কঠিন।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় যদি খালেদা জিয়ার দুই বছরের বেশি শাস্তি হয় তাহলে তিনি আইন ও বিধি অনুযায়ী নির্বাচনে অযোগ্য হবেন। তাহলে তিনি আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। যদি বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে নেতিবাচক রায় কার্যকর হয়, যদি বিএনপি ও তোর মিত্রদের প্রতিবাদ আন্দোলন জোরালো না হয়, তাহলে বিএনপি কি করবে?
খুব সম্ভবত বিএনপির সামনে তখন একটি বিকল্প থাকবে-সেটি হচ্ছে আইনি লড়াই। যদি বেগম জিয়ার ২ বছর বা তার বেশি সময় কারাদণ্ড হয় এবং তিনি নির্বাচনের অযোগ্য হন তাহলে সেই কারাদণ্ড কার্যকর করার চেষ্টা করা হবে। সে ক্ষেত্রে বেগম জিয়ার পক্ষে আইনি লড়াইয়ের পরবর্তী ধাপ হবে উচ্চতর আদালত অর্থাৎ হাইকোর্টে আপিল করা। হাইকোর্টে আপিল করলে এখানে দুইটি সমস্যা বা সম্ভাবনার উদ্ভব ঘটবে। প্রথমটি হলো হাইকোর্টে আপীল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নিম্ন আদালতের রায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়া, অর্থাৎ স্টেট অর্ডার দেওয়া। দ্বিতীয় হলো বেগম জিয়াদেরকে জামিন দেওয়া, কিন্তু দণ্ডাদেশ স্থগিত না করে মামলা চালিয়ে যাওয়া।
যদি নিম্ন আদালতের রায় হাইকোর্টেও বহাল থাকে তাহলে বিএনপি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করবে। আইনের স্বাভাবিক গতি অনুযায়ী আপিল বিভাগ থেকে যে রায় দেওয়া হবে সেটাই হবে চূড়ান্ত।
সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী দেশের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন হবে আগামী ডিসেম্বরে। অর্থাৎ নির্বাচনের বাকি এখনও ১০ মাস। এই দশ মাস বিএনপি কী করবে, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি কি পারবে ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে আগামী ১০ মাস আন্দোলন চালিয়ে নিতে? তেমন সাংগঠনিক শক্তি ও মনের জোর কি বিএনপি নেতাকর্মীদের আছে?
বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কিন্তু আরও অনেক মামলা রয়েছে। এখনতো কেবল একটি মামলা অর্থাৎ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলার রায়
অপেক্ষমাণ। এরপরে রায় হবে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার। এই দুটি মামলা ছাড়া বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে পেন্ডিং রয়েছে আরো ৩৩টি মামলা। এর মধ্যে আবার নতুন আরেকটি মামলা যুক্ত হয়েছে। সেটি হলো ২০১৫ সালে দায়ের করা মামলা। তখন ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী চলছিল প্রবল আন্দোলন। সেই সময় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে চলমান বাসে পেট্রোল বোমা নিক্ষিপ্ত হয়। ঐ বোমা নিক্ষেপ মামলায় ৩ বছর পর বেগম জিয়াকে হুকুমের আসামী করে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
সত্যি সত্যি যদি বেগম জিয়ার শাস্তি হয়, তিনি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তাহলে কি হবে? বেগম জিয়াকে বাদ দিয়ে বিএনপি কি নির্বাচনে অংশ নেবে? বিএনপির বর্তমান নেতারা কি পারবে বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভালো ফল ছিনিয়ে আনতে? নাকি ক্ষমতাসীনদের দাপটের কাছে নিজেরা ক্ষয়ে যাবেন? দুর্বল শক্তির দলে পরিণত হবেন? প্রশ্ন অনেক আছে, কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর কেবল সময়ই দিতে পারবে!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








