সময়টা ১৯৯৪। দুর্দান্ত অগ্রগতির জন্য ওই বছর ফিফার ‘বেস্ট মুভার অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড’ পায় ক্রোয়েশিয়া। সেটিও স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায়। একটা ‘শিশু’ দেশ তার নিজ ফর্মুলা আর পরিশ্রম দিয়ে ফুটবল খেলে নজরকাড়া উন্নতি করেছিল র্যাঙ্কিংয়েও। স্বাধীন হওয়ার দুই বছর পর বিশ্ব ফুটবলের অংশ হয় ক্রোয়েটরা। সেই যে শুরু।
ফিফায় যোগ দেয়ার দুই বছর পরই ইউরোতে চমক দেখায় ক্রোয়েশিয়া। ১৯৯৬তে অংশ নিয়ে নিজেদের প্রথম আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। এর দুই বছর পর আরও বড় চমক। ১৯৯৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে তৃতীয় হয় ক্রোয়েটরা। ওই বিশ্বকাপে টপ স্কোরার হয়ে বিশ্বের চোখ উপরে তুলেছিলেন এক ক্রোয়েশিয়ান, ডেভর সুকার।
তাদের উজ্জ্বল শুরুর সেই বর্ণচ্ছটায় কিছুটা ধীরগতি এসেছিল। পরের ২০ বছরের তাদের সেরা অর্জন ছিল ২০০৮ ইউরোতে কোয়ার্টার ফাইনাল। তবে ক্রোয়েশিয়ার ফুটবলের বীজ নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না।
রোববার রাশিয়া বিশ্বকাপের ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বর্তমান দল যখন লুঝনিকি স্টেডিয়ামে নামবে, সেটা বিস্ময়কর হতে পারে, তবে কোনোভাবেই বিরক্তিকর বা বেদনাদায়ক হবে না। লুকা মদ্রিচ, ইভান রাকিটিচ, পেরিসিচ বা কোভাসিচ, তারা সবাই দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ফুটবল সংস্কৃতির সংগ্রামের ফসল।
ক্রোয়েশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে শীর্ষস্থানেই আছে ফুটবল। এর যোগসূত্র অবশ্য বিচ্ছেদ হওয়া সার্বিয়ার সঙ্গে থাকার সময় থেকেই। তবে এই অঞ্চলের জটিল ও রক্তাক্ত ইতিহাসের সাথে এটির একটি জটিল সম্পর্কও রয়েছে।
আশির দশকে বলকান অঞ্চলে সার্ব, ক্রোয়েট এবং বসনিয়া এই তিনটি জাতিগত গোষ্ঠীর মধ্য জাতিগত এবং ধর্মীয়দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যার জন্যে অনেক রক্তও ধরেছে। রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্যেই ১৯৯১ সালে স্বাধীনতার ঘোষণা দেয় ক্রোয়েটরা।
যুদ্ধের পুরো প্রক্রিয়ার মূল কারণ ছিল ক্রোয়েশিয়ানদের পরিচয় এবং জাতীয়তাবাদের অনুভূতি। নতুন দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাতা ফ্রাঞ্জো টুডজম্যানও বারবার এর উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি নিজেদের নতুন পরিচয় প্রবর্তনের জন্য খেলাধুলার ক্ষমতার বিষয়ে সচেতন ছিলেন। বলেছিলেন, ‘যুদ্ধের পর, খেলাধুলাই হল প্রথম জিনিস যা দ্বারা আপনি একটি জাতিগোষ্ঠীকে পার্থক্য করতে পারেন।’
প্রেসিডেন্টের কথা মতোই ক্রোয়েশিয়ার ক্রীড়াবিদরা ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৯১ সালে ইউএস ওপেন টেনিসের শিরোপা জিতে বিশ্ব দরবারে ক্রোয়েশিয়ার নাম চেনানোর কাজটা শুরু করেন গোরান ইভানিসেভিচ।
ফাইনাল জিতে গোরান ইভানিসেভিচ র্যাকেট উচিয়ে বলেছিলেন, ‘এই র্যাকেটই আমার বন্দুক।’ দ্বিতীয় রাউন্ডে তার কাছে হেরে প্রায় একই রকম কথা বলেছিলেন ইভানিসেভিচের স্বদেশী গোরান পেরসিচ।
যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পেরসিচ বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে সবাই যেতে পারেন। কিন্তু ক্রোয়েশিয়ায় কি ঘটছে বিশ্বকে সেটা জানাতেও কাউকে থাকতে হয়।’
সেটা যাইহোক, ফুটবলের চেয়ে শক্তিশালী কোনো বড় খেলা সেখানে ছিল না। আর এটা এখন সত্যিও। ফুটবল ইতিমধ্যে দেশটির ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্রোয়েটদের উপর হামলা চালায় যুগোস্লাভিয়া। যুদ্ধের মীমাংসা অনুসারে ক্রোয়েশিয়ার অনেক জায়গা ইতালিয়ানদের দখলে চলে যায়। দখলের পর অনেক ক্লাবের নাম পরিবর্তন করতে চায় ইতালিয়ানরা এবং ইতালিয়ান লিগে সেগুলোকে যোগ করতে চায়।
১৯৯০’র দশকের বলকান যুদ্ধেও ফুটবল সম্পর্কিত মাইলস্টোন রয়েছে। ওই বছরের ১৩ মে ক্রোয়েশিয়ার ডায়নামো জাগরেব ও সার্বিয়ার রেড স্টার বেলগ্রেড ম্যাচ পরিত্যক্ত করা হয়েছিল। কারণ ম্যাচের আগেই দুই ক্লাবের সমর্থকর স্লোগান দেন, ‘যুদ্ধ শুরু’।
একই বছরের সেপ্টেম্বরে দেশের দুই অংশের দুই ক্লাব হাজদুক ও পার্টিজান বেলগ্রেডের সমর্থকরা মাঠে ঢুকে সংঘর্ষে জড়ায়। তখন যুগোস্লাভিয়ার পতাকা পুড়িয়ে বর্তমানে ক্রোয়েশিয়ার জাতীয় পতাকা ওড়ায়। ওটাই যুগোস্লাভিয়ার ক্রীড়া পরিচয় চিরদিনের জন্য পরিবর্তন করে দেয় বলে মনে করা হয়।
১৯৮৭ সালে ক্রোয়েশীয় ফুটবলই স্বাধীনতার জন্য একটি উপযুক্ত মুহূর্তে এনেছিল। ওই বছর ফিফার যুব চ্যাম্পিয়নশিপের (বর্তমানে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ) শিরোপা জেতে সার্বিয়া। যে দলে ছিলেন এখন ক্রোয়েটদের বীর ফুটবলার ডেভর সুকার, জভোনিমির বোবান ও রবার্ট জারনি। তারা সবাই পশ্চিম জার্মানির বিরুদ্ধে ফাইনালে ছিলেন। যৌথভাবে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন দুই ক্রোয়েট রবার্ট প্রসিনেকি ও ইগর সিম্যাচ। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া দলের মূল অংশ ছিলেন তাদের সবাই।
ক্রোয়েশিয়ার এই দলের সদস্যেদের কারণেই ইউরোপে দাপট দেখিয়েছিল হাজদুক ক্লাব। অ্যালেন বোকসিচ (ক্রোয়েশিয়ার অন্যতম গ্রেট ফুটবলার, ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি), স্ল্যাভেন বিলিচি, যিনি পরে জাতীয় দলের কোচ হয়েছিলেন। তাদের কল্যাণেই ১৯৯৫ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল হাজদুক।
ছোট একটি দেশ। মাত্র ৪০ লাখের মতো জনসংখ্যা। কিন্তু তারাই সারাবিশ্বে নিয়মিত ফুটবল প্রতিভা সরবরাহের বড় পাইপলাইন। স্পেন, ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড বা জার্মানি বিশ্বের বড় লিগগুলোর সবগুলোতেই ছোট ক্রোয়েটদের বড় দাপট। যার জ্বলন্ত উদাহরণ মদ্রিচ, রাকিটিচ, মানজুকিচ, পেরিসিচ ও লভরেনরা। যারা এখন বিশ্বকাপেও উড়াচ্ছেন দেশের পতাকা।








