গত বছর ধন্যবাদজ্ঞাপন অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে মার্সিয়া স্টিফেল যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী শহর বিসমার্কে বাড়িতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলেন। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি এসেই হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল তার। পায়ে কোনো রকম শক্তি পাচ্ছিলেন না। কিছুই বোঝার আগে গাড়ি নিয়ে ধাক্কা খেলেন নিজের বাড়ির প্রাচীরের সাথে। তখনই তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায় তার ছেলে।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর কিছু পরীক্ষা করানো হয় তার। ভেবেছিলেন হয়তো স্ট্রোক করেছেন। কিন্তু এমআরআইয়ের রিপোর্টে একি কী ফলাফল আসলো! ‘আমার ক্যন্সার?’ এমনটাই বলছিলেন মার্সিয়া। কোনোভাবেই যেন বিশ্বাস হচ্ছিলো না তার। তার উপর ব্রেইনে টিউমার পুরো আস্ত একটি টেনিস বলের মতই বড় হয়ে গেছে।
৬৮ বছর বয়সি মার্সিয়া বলছিলেন, তাৎক্ষনিকভাবে ডাক্তার আমাকে টিউমারটি অপারেশন করে কেটে ফেলতে বললেন। কারণ ক্যান্সার ততক্ষণে ৪র্থ স্তরে পৌছে গেছে।
মার্সিয়া যে ধরণের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন তাকে বলা হয় গ্লিওব্লাসটোমা। প্রাণঘাতী ক্যান্সারগুলোর শীর্ষেই আছে এটি। পূর্ণ চিকিৎসা নেয়ার পর সাধারণত পাঁচ বছরের মত বাঁচে এই ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীরা। তবে ৭৫ ভাগ রোগিই চিকিৎসা নেয়ার এক বা দুই বছরের মধ্যেই মারা যান। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কারণেই মার্সিয়া আগে থেকেই এই তথ্যগুলো জেনে গিয়েছিলেন।
প্রায় ভেঙ্গেই পরেছিলেন তিনি। ‘আমি সর্বক্ষনই কাঁদতাম। আমি জানতে চাইনি যে আমি আর কিছুদিন পরই মরতে যাচ্ছি’ বলছিলেন মার্সিয়া। নিজের স্বামীও এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েই মারা গেছেন। মার্সিয়া বলেন, ২০০৯ সালে তার স্বামী ক্যান্সারেই মারা যান।
তিনি বলেন, ‘ও আক্রান্ত হবার পর টিউমার রিমুভ করার জন্য অপারেশান করানো হয়। অপারেশনের পর ওর জ্ঞানই ছিলো না, কথাবলার শক্তিও ছিলো না। ওকে বাথরুমে নিয়ে যেত হত। কিন্তু বেশিদিন বাঁচেনি সে। অপারেশনের কয়েকদিন পরই মারা যান। আমি ভেবেছিলাম ওর মত আমার অবস্থাও হয়তো তাই হবে।’ কিন্তু মার্সিয়ার ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি।
এক বছর হল তিনি তার ব্রেইন টিউমার অপসারণ করিয়েছেন। এখন বেশ ভালই আছেন। পরিবারের সবার সঙ্গে এই সুন্দর পৃথিবীকে উপভোগ করছেন তিনি। তার চিকিৎসা পদ্ধতি ছিলো রেডিয়েশন, সার্জারি এবং কেমোথেরাপি।
মার্সিয়ার মতো একই ধরণের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির আরেক নারী ম্যারিয়ান আনসেলমো। তাকেও প্রথমে মার্সিয়ার মত প্রথাগত চিকিৎসা পদ্ধতি অনুযায়ীই চিকিৎসা দেন ডাক্তাররা। কারণ প্রথম দিকে দুই নারীর চিকিৎসকরাই ভেবেছিলেন তাদের উভরে ক্যান্সার একই ধরণের। কিন্তু দেখা যায় যে,ম্যারিয়ান কেমো সহ্য করতে পারছিলেন না।
ফলে তার চিকিৎসা নেয়ার প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত মেমোরিয়াল স্ল্যোন কিটেরিং ক্যান্সার সেন্টার (এমএসকেসিসি) এ ক্ষেত্রে এগিয়ে আসে। তারা ম্যারিয়ানের সম্মতিতে তাদের নতুন আবিস্কৃত একটি ঔষধের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা চালায়। সেখানে দেখা যায় মারিয়্যান ওই নতুন ঔষধের কারণে সুফল পাচ্ছেন।
এমএসকেসিসির এই উদ্যোগের মাধ্যমে এটা প্রমাণিত হয় যে ক্যান্সারের একই ধরণ ভিন্ন ব্যক্তিতে ভিন্নভাবে কাজ করে কিনা। এমএসকেসিসির জন্য এটা মোটেই কঠিন কোনো কাজ ছিলো না। কারণ তারা প্রায়ই বিভিন্ন রোগীর উপর ট্রায়াল চিকিৎসা চালায় যা অধিকাংশ সময়ই সফলতার মুখ দেখে।
এই দুই নারীর ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াইয়ের কাহিনীই পরবর্তীকালে গবেষণার ক্ষেত্রে কেস স্টাডি হিসেবে উঠে আসে। গত কয়েক শতাব্দী ধরে ক্যান্সার নিরাময়ে যে চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে তা নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। এখন নতুন নতুন কৌশল এবং ঔষধ ব্যবহার করার ফ্রি ট্রায়াল চালানো হচ্ছে। এর ফলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফলতাও পাওয়া যাচ্ছে।
এ সকল গবেষণায় প্রমাণ হচ্ছে যে মূলত সব ক্যান্সারই এক নয়। এমনকি একই ব্যক্তির অভ্যন্তরে টিউমার থাকলে তাও পরিবর্তিত হয়ে অন্য কোনো আকার ধারণ করে যে কোনো সময়। শুধু তাই নয়, একই ধরণের ক্যান্সারে আক্রান্তদের জন্য একই চিকিৎসা পদ্ধতিও কাজ করে না সবসময়। ফলে দরকার হয় নতুন ধরণের চিকিৎসা পদ্ধতির।
এমএসকেসিসির ক্রাভিস সেন্টার ফর মলেকিউলার অনকোলোজি বিভাগের পরিচালক ডাক্তার ডেভিড সোলিত বলেন, ‘সব কোলন ক্যান্সার একই বা সব ফুসফুসের ক্যান্সার কিংবা সব ব্রেস্ট ক্যান্সার একই ধরণের হবে এমন ধারণা থেকে আমরা বের হয়ে আসছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমরা জানার চেষ্টা করছি আপনি ইজিএফআর লাঙস ক্যান্সারে ভুগছেন কিনা বা এএলকে ফিউশন লাঙস ক্যান্সারে ভুগছেন কিনা কিংবা বিআরএএফ মিউট্যান্ট ব্রেইন ক্যান্সারে ভুগছেন কিনা। সেই সঙ্গে আমরা আরো ভালো করে জানার চেষ্টা করছি মিউশনের ভিত্তিতে এসব ক্যান্সার কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়।’
এখানে ডাক্তারদেরকে অন্তর থেকে অনুভব করতে হবে বিষয়টি। একবার যদি ক্যান্সারের মূল কারণটি চিহ্নিত করা যায় তবে এর বেড়ে ওঠা নিয়ন্ত্রণ করার নতুন প্রতিষেধক বের করাটা সহজ হবে। মূল মন্ত্র হচ্ছে মার্সিয়া স্টিফেল এবং ম্যারিয়ান অনসেলমোর মত রোগীদের কীভাবে অবস্থা অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা।
এ বছরের জানুয়ারীতে যুক্তরাষ্ট্রে একটি জরিপ চালনা করা হয়। সেখানে কতজন ক্যান্সার রোগী আছেন তাদেরকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনা হচ্ছে। এ সকল রোগীদের উপর ক্যান্সার নিরাময়ী চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ করা হবে। যাদের ক্ষেত্রে নতুন আবিস্কৃত ঔষধ কাজ করবে তাদেরও একটি তালিকা করা হবে।
এসব পদ্ধতির ফলাফল কেমন আসে তা জানার জন্যই মূলত এটা করা হচ্ছে। তবে সব মিলিয়ে এখানে যে দুই নারীর অবদান উঠে আসে তারা হলেন এই মার্সিয়া স্টিফেল এবং ম্যারিয়ান অনসেলমো। কারণ এ দুজনের উপর ক্যান্সার চিকিৎসার নতুন আবিস্কারের ফ্রি ট্রায়াল চালানো হয়।
তবে এখনও মার্সিয়া জানেনা তাকে আরো কত দিন এই কেমোথেরাপি নিতে হবে। এখন তার থেরাপির দ্বিতীয় ধাপ চলছে। তার চুলগুলো পড়ে গেছে, চলতে গিয়ে শরীরে মোটেই শক্তি পান না। সবসময় ঘুম পায় তার। মনোবলও ভেঙ্গে গিয়েছিলো মাঝখানে। এজন্য মাঝখানে কিছুদিন একজন সাইকোলোজিস্টের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
তবে ম্যারিয়ানের অবস্থা এমন হয়ে গিয়েছিলো যে কোনো ডাক্তারই তার অবস্থার উন্নতি করতে পারছিলেননা। পরে অন্য কোনো উপায় না দেখে তার ডাক্তার তাকে এমএসকেসিসিতে যেতে বলেন। কারণ সেখানেই ক্যান্সারের জন্য আবিস্কৃত নতুন পদ্ধতিগুলো পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হয়। সেখানে তার ডাক্তার থাকেন ডেভিড হাইম্যান।ডেভিড ক্যান্সার নিরাময়ের জন্য যে ঔষধটি নিয়ে তখন গবেষণা চালাচ্ছিলেন তা ম্যারিয়ানার উপর পরীক্ষমূলকভাবে প্রয়োগ করেন।এতে সুফল আসে।
তবে শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বা নতুন আবিস্কারই মানুষের জীবন বাঁচাতে পারেনা।অনেক দেশ আছে যেখানে নতুন আবিস্কারটি ট্রায়াল দেবার সুযোগই নেই। অনেকের সেই অর্থও নেই। এই দুই নারী উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের। তাদের পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা ছিলো। কিন্তু অধিকাংশের তা নেই।
তবে তার পরও বলা যায় সকল দেশেই যদি চিকিৎকেরা প্রাণপণে চেষ্টা করে তবে বিস্ময় অসম্ভব কিছু না। ক্যান্সারের মত প্রাণঘাতি রোগগুলো নিরাময়ে পুরো বিশ্বকে একযোগে কাজ করতে হবে।






