কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে নীল সাগর এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়ে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশ্যে শনিবার রওনা হবেন আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল৷ দলটির নীতিনির্ধারক মহল বলছে, এই সফরের মধ্যে দিয়ে সরকারের গত দুই মেয়াদের উন্নয়নের চিত্র সরাসরি জনগণের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, সাধারণের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি যোগাযোগ যেমন তৈরি হবে। ঠিক তেমনই সফররত অঞ্চলের তৃণমূলের আন্ত:কলহ ও স্থানীয় নেতাদের মধ্যকার বিভেদ দূর করতে মিলবে মোক্ষম সুযোগ।
৮ সেপ্টেম্বর উত্তরবঙ্গ সফরের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে এমন সাংগঠনিক প্রক্রিয়া চলবে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত। এই সুযোগে দেশের সকল সাংগঠনিক ইউনিট এবং এর তৃণমূলকে কেন্দ্রীয় নির্দেশনার বাইরে না যাওয়ার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়ে আসবে দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। দলীয় সূত্রে এসব জানা গেছে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী লীগের এমন সফরের মধ্যদিয়ে দেশের রাজনীতিতে বৈচিত্র আনার চেষ্টা থাকবে বলে জানিয়েছেন এবারের সফরের প্রতিনিধিদলে নাম থাকা একাধিক আওয়ামী লীগ নেতা। তাদের দাবি, বৈচিত্র আনতেই সারাদেশ সফরের প্রথম পর্যায়ে বেছে নেওয়া হয়েছে ট্রেন।
সফরকারীদলের অন্যতম সদস্য এবং দলের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, ট্রেনে চড়ে সরকারের উন্নয়নের চিত্র জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে চায় আমাদের দল।
তিনি আরও বলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে ট্রেনে করে উত্তরবঙ্গ সফরে আমরা প্রায় ১১টির মতো পথ সভায় অংশ নেবো। এতে করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের একটা যোগাযোগ তৈরি হবে। আমরা কি বলতে চাচ্ছি, সেটাও তারা জানতে পারবে। এতে করে আমাদের সংগঠনের নেতাকর্মীরা যেমন উজ্জীবিত হবে, সাধারণ মানুষও উজ্জীবিত হবে। দেশের অগ্রগতি চিত্র সরাসরি আমরা সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরবো। মানুষ আমাদের উন্নয়নের কথা জানতে পারবে।
একটা সময় দৈন্যদশার জন্য ট্রেন যাত্রী না পেলেও এখন অবস্থার উন্নতি হয়েছে। সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। এমন বার্তা দেশবাসীর কাছে দিতে চাইছে দলটি। ইতিপূর্বে দেশের রাজনীতিতে নেতাদের সড়ক পথ, নদীপথ এবং আকাশ পথে গিয়ে জনসভা, পথসভা বা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা গেলেও ট্রেনে বৃহৎ পরিসরে এবারই প্রথম। এ ট্রেন যাত্রাকে দলটির দেশের রাজনীতিতে নতুনত্ব যোগের পাশাপাশি বৈচিত্র্য আনতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।
উত্তরবঙ্গ সফরের প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে তৃণমূলের কর্মী, সাধারণ ভোটার এবং আপামর জনসাধারণের সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টিতে বড় ভূমিকা রাখবে এমন সফর।
তিনি আরও বলেন, যে রেলে এক সময় মানুষ যাতায়াত করত না। সেই রেল আমরা কোন জায়গায় নিয়ে গেছি। এর মধ্য দিয়ে সেই বার্তা দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে যাবে। এই সফরে আমরা বিভিন্ন স্টেশনে যাত্রা বিরতির সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করবো। এর পাশাপাশি, রেল যাত্রীদের সঙ্গেও কথা বলার চেষ্টা করবো। তাদের মনোভাব জানবো এবং আমাদের কথাগুলো তাদের সামনে তুলে ধরবো।
রাজনীতিতে বৈচিত্র আনতেই আওয়ামী লীগের এমন উদ্যোগ দাবি করে তিনি বলেন, শুধু দলীয় নেতাকর্মী এবং ভোটার নয়; আপামর জনগণ এ রেল যাত্রাকে অভিনন্দন জানাবে বলে আমরা মনে করছি। আমরা রাজনীতিতে বৈচিত্র আনতে চাই। আমাদের এ ইচ্ছা উত্তরবঙ্গ সফরের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে জনগণের কাছে আমরা তুলে ধরবো।
দলের এমন কর্মসূচির মূল টার্গেট আরও বেশি জনগণের কাছাকাছি পৌঁছানো এবং তাদের কাছে সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরা বলেও জানান আওয়ামী লীগের এ নেতা।
টানা তৃতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার লক্ষ্যে মাঠে নামার আগে পূর্বের যে কোন সময়ের থেকে সতর্ক এবং কঠোর ক্ষমতাসীনরা। দলটির নীতিনির্ধারকরা চ্যানেল আই আনলাইনকে জানিয়েছে, সারাদেশে এমন সফরের মধ্য দিয়ে অান্ত:কোন্দল এবং বিভেদের বিষয়ে কঠোর বার্তা পৌঁছে দিতে চায় দলটি। অতীতে কেন্দ্রীয় নির্দেশ অমান্যকারীদের ব্যাপারে সদয় আচরণ করা হলেও এবার আর তা করা হবে না। কেন্দ্রীয় নির্দেশ না মানলে অভিযুক্তের বিরূদ্ধে নেওয়া হবে দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা, থাকবে আজীবন বহিস্কারের মতো কঠোর সিদ্ধান্তও। দলীয় সভাপতির পক্ষ থেকে এ বার্তা সারাদেশে পৌঁছে দেবে দলটির বিভিন্ন প্রতিনিধিদল। এতেও দ্বন্দ্ব নিরসন না হলে ঢাকাতেও ডেকে পাঠানো হবে আন্ত:কোন্দল প্রবণ এলাকার নেতাদের। এবিষয়ে দলীয় সভাপতির সরাসরি নির্দেশনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বলে আসছেন, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির চেয়েও বড় প্রতিপক্ষ হবে নিজ দলের মধ্যে ধীরে ধীরে জন্ম নেওয়া পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্ব।

নির্বাচনের অল্প সময় বাকি থাকতে, এ সময়টাতে দলীয় প্রতিনিধি দলের সারাদেশ সফরের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকেও দেখা যাবে দেশের বিভিন্ন জেলায় জনসভায় অংশ নিতে। দলীয় সংহতি মজবুত ও দ্বন্দ্ব মোকাবেলায় তার উপস্থিতি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে বলেও ধারণা আওয়ামী লীগ শীর্ষ নেতাদের। বিভিন্ন জেলাতে বিভিন্ন জনসভায় সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরে জনগণের কাছে ভোট চাইবেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।
সংবিধান অনুযায়ী, আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হবে। সেই সঙ্গে নভেম্বরের শুরুতে কিংবা মাঝামাঝি ঘোষণা হতে পারে নির্বাচনী তফসিল। তাই গত দশবছরের অর্জনকে জনগণের সামনে তুলে ধরে ভোটারদের মন জয়ের কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীনরা।
জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্ষমতাসীনদের এমন কর্মসূচি সাধারণ জনগণ কীভাবে গ্রহণ করে সেটা এখন দেখার অপেক্ষা।
উত্তরবঙ্গ সফরে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্ব আরও অংশ নেবেন জাহাঙ্গীর কবির নানক, ড. হাছান মাহমুদ, অসীম কুমার উকিল, আহমদ হোসেন, বি.এম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া ও আনোয়ার হোসেনসহ কেন্দ্রীয় অনেক কেন্দ্রীয় নেতা।
এ সফরে নীল সাগর এক্সপ্রেস কমলাপুর থেকে ছেড়ে গিয়ে যাত্রা শেষ করবে নীলফামারীতে গিয়ে। এ যাত্রাপথে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর, বগুড়া, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও নীলফামারী জেলার অন্তর্ভুক্ত রেল স্টেশনগুলোতে যাত্রা বিরতি নেওয়া হবে। এসময় মোট ১১টির মতো সংক্ষিপ্ত পথ সভায় অংশ নেবেন আওয়ামী লীগের নেতারা। ট্রেনে গিয়ে একদিনে এতগুলো রাজনৈতিক সমাবেশ করাও দেশের রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে বলে মনে করছেন দলটির নীতিনির্ধারকরা।








