ছাত্রদের দাবির মুখে কোটা ব্যবস্থা বাতিল করার পর নতুন করে তা নিয়ে ‘হা-হুতাশ’ কেনো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
সম্প্রতি তিনটি দেশ সফর নিয়ে বুধবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন: (কোটা নিয়ে) যখন এতো আন্দোলন, এতো সংগ্রাম, এতো কিছু, তো ঠিক আছে আমি দাবি মেনে নিয়েছি। দাবি করেছে ছেলেপেলে, এরাতো আমার নাতির বয়সী। আমার নাতনীইতো এখন কলেজে পড়ে। কাজেই তারা যখন দাবি করেছে, তখন আমি বলেছি ঠিক আছে, আমি দাবি মেনে নিলাম, সব কোটা বন্ধ। তো এখন আবার নতুন করে কথা উঠবে কেন? হা-হুতাশ আসবে কেন?
কোটা নিয়ে নতুন করে যারা কথা তুলছেন তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন: আপনাদের মাঝে এই যে বোধোদয় হলো (কোটা রাখার বিষয়ে), কই ছাত্ররা যখন আন্দোলন করলো তখনতো আপনাদের মাঝে এই বোধোদয়টা দেখিনি। তখন ছাত্রদের আন্দোলনের পক্ষে আপনারা এমন সোচ্চার হয়ে পড়লেন যে, তখনতো আপনাদের মাঝে এই বোধোদয়টা দেখেনি বা আপনারা ছাত্রদের থামানোর চেষ্টা করেননি।
ছাত্রদের এ আন্দোলনের সঙ্গে কারা মিশে যাচ্ছে সেটা নিয়েও খুব বেশি একটা কাউকে সোচ্চার হতে দেখা যায়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের কঠোর সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো ধরনের অসম্মান সেটা আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়।
কেন চাকরির ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিলো তার যৌক্তিকতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন: স্বাধীনতার পর একটা যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলা, সেখানে সমাজের বিভিন্ন স্তরের পড়ে থাকা মানুষ, তাদেরকে যেমন সুযোগ করে দেওয়া, মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা অংশগ্রহন করেছিলেন তাদেরকে সুযোগ করে দেওয়ার জন্য জাতির পিতা প্রতিটি ক্ষেত্রে কোটার ব্যবস্থাটা করে দিয়েছিলেন। এবং কোটা ব্যবস্থাটা খুবই বাস্তব সম্মত।
‘‘কিন্ত হঠাত কথা নেই বার্তা নেই, কোটা চাইনা এই আন্দোলন শুরু হলো। এবং সে আন্দোলন শুধু আন্দোলন না, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দিয়ে, এমনিতেই যানজট, তারমধ্যে সমস্ত রাস্তাঘাট বন্ধ, সেখানে তিন তিন-চারটি হাসপাতাল, সেখানে রুগী যেতে পারছে না, এমন একটা অবস্থার সৃষ্টি। আমরা চেষ্টা করেছি তাদের বোঝাতে, চেষ্টা করেছি তাদের জানাতে, এটাতো ছাত্রদের বিষয় নয়। এটা সরকারের নীতি নির্ধারণের বিষয়। কোটা থাকবে কি থাকবে না, কে কী সুযোগ পাবে, সেটাতো তাদের বিষয়।’’
৭৫ এর পর থেকে ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কেউ চাকরি পায়নি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন: ৭২ সালে জাতির পিতা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাকরির ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ কোটা করে দিলেন। আপনারা বিবেচনা করে দেখেন, জাতির পিতা কোটা করে দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু ৭৫’র পর ওই কোটায় কোনো মুক্তিযোদ্ধা কি চাকরি পেয়েছে?
‘‘আমি বহু অফিসারকে জানি, তারা চাকরির ফরমে তারা যে মুক্তিযুদ্ধ করেছে এই কথাটা লিখতে ভয় পেতো, কারণ লিখলে চাকরি পাবে না। শুধুমাত্র এ কথাটা চেপে যেয়ে কেউ চাকরির জন্য আবেদন করেছে তখন চাকরি পেয়েছে।’’
জেলা কোটা রাখার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন: আপনারা নিজেরা বিচার করে দেখেন, আপনারা যদি প্রতিবছর চাকরির হিসাব নেন দেখবেন কোনো কোনো জেলা থেকে হয়তো ১৫ জনই চাকরি পেয়েছে। আর কোনো কোনো জেলা থেকে দেখবেন দুই জন, তাও ওই কোটা আছে বলেই চাকরি পেয়েছে।
এখন কোটা বাতিলের ফলে জেলা কোটা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো ধরণের কথা শোনা হবে না বলেও ইঙ্গিত দেন প্রধানমন্ত্রী।
সরকারি চাকরিতে কোটা ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের এক পর্যায়ে গত ১১ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী সংসদে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন।
গত ২৭ এপ্রিল আন্দোলনকারী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ক্ষমতাসীন দলের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তার ঘোষণা কীভাবে কার্যকরে ‘স্বল্প সময়ের মধ্যে’ প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে গত ৮ এপ্রিল থেকে। ওইদিন পাঁচ দফা দাবিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতাকর্মীরা রাজধানীর শাহবাগে পূর্ব ঘোষিত অবস্থান কর্মসূচি শুরু করে। এক পর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে তারা।
সেদিন রাতভর সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় চলে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের তাণ্ডব। আক্রান্ত হয় উপাচার্যের বাসভবনও। প্রতিটি কক্ষে ঢুকে সবকিছু তছনছ করে একদল মুখোশধারী।

পরেরদিন সোমবার তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে সরকারের প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনার পর ১ মাসের জন্য চলমান অান্দোলন স্থগিত ঘোষণা করে আন্দোলনকারীরা।
তবে একাধিক মন্ত্রীর ‘বিতর্কিত’ মন্তব্যের জেড়ে নতুন করে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ১১ এপ্রিল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন।








