ঐতিহাসিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীগুলো কি চিরকালই পশ্চাদপদ হিসেবে চিহ্নিত হবে? অনন্তকাল ধরেই কি তাদেরকে কর্মক্ষেত্রে কোটা সুবিধা দিতে হবে?
এমনই প্রশ্ন রেখেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট।
চাকরি বা পদোন্নতি পাওয়ার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থা থেকে ‘ক্রিমি লেয়ার’দেরকে বাদ দেয়ার পরিকল্পনার বৈধতা বা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে করা উপস্থাপিত যুক্তি-তর্কের প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার এ প্রশ্ন রাখেন প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ।
বর্ণ বা জাতিভেদে ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চনার শিকার জনগোষ্ঠীগুলোকে ভারতের সংবিধানে ‘সিডিউলড কাস্ট’ ও ‘সিডিউলড ট্রাইব’ (এসসি/এসটি) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদেরকে প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে মূলধারায় তুলে আনতে রয়েছে কোটা বা সংরক্ষণ ব্যবস্থা।
এই সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মাঝে যারা সুবিধা পেয়ে তুলনামূলক অগ্রসর এবং উচ্চ শিক্ষিত, তাদেরকে ভারতীয় রাজনীতিতে ‘ক্রিমি লেয়ার’ (Creamy layer- দুধের সর) বলা হয়।
অ্যাডিশনাল সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা, নিধেশ গুপ্ত, দীনেশ দ্বিবেদী, ইন্দিরা জয়সিং, রূপিন্দর এস সুরি, এ মারিয়ারপুথাম এবং সঞ্জয় হেগড়ের মতো একদল সিনিয়র আইনজীবী এসসি বিষয়ে ২০০৬ সালের ‘নাগরাজ বিচার প্রক্রিয়া’র বর্তমান সঠিকতা দাবি করলে এ যুক্তি-তর্ক উঠে আসে। তাদের যুক্তি, এখন ওই বিচারকাজটির যৌক্তিকতা ৭ সদস্যের বেঞ্চের মাধ্যমে যাচাই করার প্রয়োজন নেই।
এই নাগরাজ বিচার প্রক্রিয়া বা রায়টিই ভারতে এসসিদের পদোন্নতিতে কোটা ব্যবস্থার প্রয়োগের বিষয়টি জোরালো করেছিল। সেখানে ভারতীয় সংবিধানের ১৬ (৪এ) অনুচ্ছেদকে যৌক্তিক প্রতিপন্ন করা হয়েছিল। ওই অনুচ্ছেদ অনুসারে, রাষ্ট্র তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পদোন্নতিতে সংরক্ষণ বা কোটা প্রদান করতে পারবে: ১. কর্মীর পশ্চাদপদতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য রাষ্ট্রকে যথেষ্ট পরিমাণ তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে, কর্মক্ষেত্রে এসসি/এসটি জনগোষ্ঠীর যথেষ্ট পরিমাণ প্রতিনিধিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে এবং প্রশাসনের সার্বিক কর্মদক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
রাষ্ট্র ও এসসি/এসটির পক্ষে এই আইনজীবীরা অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে ভেনুগোপালের যুক্তি গ্রহণ করে দাবি করেন, ২০০৬ সালের এই রায়ে এসসি/এসটির পশ্চাদপদতাকে অন্তর্ভুক্ত করে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং এর প্রেক্ষিতে যে প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার জারি করা হয়েছিল তার নতুন করে কোনো যাচাই বা বিচারের প্রয়োজন নেই।
এর প্রতিক্রিয়ায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বলেন, ‘কর্মসংস্থানের প্রথম পর্যায় বা এন্ট্রি লেভেলে অনগ্রসরতার ভিত্তিতে সংরক্ষণ কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু আমাদেরকে উদ্বিগ্ন করছে চাকরির পদ না দেখেই কোটার ভিত্তিতে এই এসসি/এসটি কর্মীদের উচ্চ পর্যায়েও দ্রুত চাকরি বা পদোন্নতি দিয়ে দেয়ার বিষয়টি।’
‘ধরুন, একজন ব্যক্তি কোটার ভিত্তিতে আইএস-এ চাকরি পেয়ে গেল এবং সেই কোটার মাধ্যমে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে সচিবও হয়ে গেল। এখন কি তার মতো একজন জ্যেষ্ঠ আমলার নাতি-পুতিকেও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে চাকরি এবং পদোন্নতি দিতে হবে? তারা কি অনন্তকাল ধরে এই সুবিধা পেয়ে যেতে থাকবে?’
এসসি/এসটি কোটাবিহীন সাধারণ চাকরিপ্রার্থীরা প্রাথমিক পর্যায় ছাড়া পদোন্নতির চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিরোধী। তাদের পক্ষের আইনজীবী হিসেবে হিসেবে যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন করেন ভারতের সাবেক আইনমন্ত্রী শান্তি ভূষণ। তিনি বলেন, সরকার উচ্চপদগুলোতে সরাসরি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে এসসি/এসটিদের জন্য কিছু সংরক্ষণ রাখা যেতে পারে। ‘কিন্তু আমলা পর্যায়ের উচ্চপদগুলো যদি শুধু সংরক্ষণের ভিত্তিতেই হয়, তবে তো দেশে বিপর্যয় নামবে।’
ভূষণের বক্তব্যের সমর্থনে সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ রাজিব ধাওয়ান বলেন, সংরক্ষণ সুবিধা থেকে ক্রিমি লেয়ার জনগোষ্ঠীকে বাদ দেয়াটা সমঅধিকারের জন্য খুবই যুক্তিযুক্ত দাবি। এন্ট্রি লেভেলে কোটা পেয়ে শত শত বছর ধরে সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরা সুযোগ পাচ্ছেন বাকিদের সঙ্গে সমপর্যায়ে উঠে প্রতিযোগিতায় নামার।
কিন্তু এদের মধ্যে যারা উতোমধ্যে অনগ্রসরতাকে পেছনে ফেলে একটা ভালো অবস্থানে চলে এসেছেন তাদেরকে আর কোটা দিয়ে পদোন্নতি দেয়া উচিত নয়। ‘সংরক্ষণ ব্যবস্থা কখনো চিরকালীন হতে পারে না,’ বলেন তিনি।
বুধবার এ নিয়ে আবার যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের তারিখ দিয়েছেন আদালত।








