রাত তখন মধ্য, কিংবা তারও অধিক। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কথনে- ‘দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে গেছে পাড়া’-এমন। ধরা যাক সময়টা শীতকাল। আর তখনি পাড়াময়, মহল্লার মাঝখানে অথবা নিবিড় আবাসিক এলাকার ভেতরে বেজে উঠলো গাড়ির হর্ন। সব নীরবতা ভেঙে খান খান। যে শিশু ঘুমিয়েছিলো গভীর। যে বৃদ্ধ অনেক কষ্টে ঘুম এনেছিলেন রোগে জীর্ণ শরীরে। যে অসুস্থ মা চোখ বন্ধ করেছিলেন একটুখানি। যে শিক্ষার্থী সকালের পরীক্ষার প্রস্তুতি শেষে কিছুক্ষণ আগে গিয়েছিলেন বিছানায়। আচমকা বিকট শব্দে সবার ঘুম, তদ্রা ভেঙে গেলো। ঘুমের শিশু লাফিয়ে উঠলো ধড়ফড় করে। সারারাত আর ঘুমই হলো না অসুস্থ মায়ের, বৃদ্ধের। সারাদিন ঘরের কাজে ক্লান্ত গৃহবধূর চোখের পাতা আর এক হলো না।
দিনে দিনে এই শহরে গাড়ির হর্ন রীতিমত এক আতঙ্ক, ভীতির নাম হয়ে উঠছে।
এ নিয়ে অনেক কথা, অনেক সেমিনার, উচ্চ আদালতের নির্দেশ; তারপরও পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
তাহলে মুক্তি? পথ নিশ্চয়ই আছে; থাকতে হয়! কেউ না কেউ, কোথাও না কোথাও কাজ নিশ্চয়ই হচ্ছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের প্রাঙ্গণ। শান্ত মেজাজে এক তরুণ হাঁটছেন। তার হাতে একটা প্ল্যাকার্ড। তাতে চোখপড়ার মতো করে লেখা- ‘হর্নমুক্ত বাংলাদেশ/আরো সুস্থ বাংলাদেশ।’ যদিও এখনকার নিয়মে হর্ন বানানটি ভুল। ওই তরুণ এটা জানেন। বানানটি ঠিক করা হবে বলে জানালেন তিনি। যারা আগ্রহ দেখান তাদের হাতে একটি করে লিফলেট দেন তরুণ। যারা আরো সুস্থ বাংলাদেশ চেয়ে সংহতি জানায় তাদের সঙ্গে ওই তরুণ হাসিমুখ করে ছবি তুলতে দাঁড়ালেন। যতদুর মনে পড়ছে তরুণটির নাম নাজমুল আলম। তিনি জানালেন, একটু নাগরিক জ্ঞান, একটু সময় আর পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হলে
আমরা হয়তো রক্ষা পেতে পারি এই ‘দানব’ থেকে। অনড় জ্যামে আটকে আছে সব গাড়ি। এর মধ্যেই একজন বা কয়েকজন বাজিয়ে চলছে হর্ন। একটুও বুঝতে চাইছে না সামনে যারা তারাওতো যাবে। তাহলে হর্ন বাজানো কেনো? মধ্যরাতে বাড়ির দারোয়ানকে ডাকার জন্য হর্ন বাজানোর কোনো দরকার নেই। দারোয়ান বা নিরাপত্তাকর্মী ওই কাজটি করার জন্যে সর্বক্ষণ সজাগই থাকেন। গাড়ি, হেডলাইটের আলো দেখলেই তিনি বা তারা ছুটে আসেন। এই শহর যখন আরো ছোট ছিলো, গাড়ির সংখ্যা ছিলো কম, যখন ধানমণ্ডি আর গুলশানে বিশাল জমিতে দালান ছিলো ছোট; তখন প্রয়োজন ছিলো হর্ন বাজিয়ে দারোয়ান ডাকার। এখন প্রয়োজন নেই।
এমন সব কথা উঠে আসে ওই তরুণের সঙ্গে আলাপে। তিনি জানান, ছোট পরিসরে হোক, একজন একজন করে হোক, বিষয়টা নিয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে। লিফলেটে দেখা গেলো এই শহরের উচ্চ শব্দ আমাদের স্বাভাবিক জীবনের কী কী কেড়ে নিচ্ছে। আমরা কেমন করে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছি। মেজাজ খিটমিটে হয়ে যাচ্ছে। হারিয়ে ফেলছি স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি।
এসব দেখে শুনে হাইকোর্ট বলে দিলো, নির্দেশ হলো রাত ১০টার পরে আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজানো যাবে না। গণমাধ্যম সে ‘অর্ডার’ ফলাও করে প্রকাশ করলো। কিন্তু কথা হলো অর্ডার কার্যকর করবে কে? কে দেখবে রাত ১০টার পর আবাসিক এলাকায় হর্ন বাজালো কে? সেই হর্নের শব্দে কার মেজাজ খারাপ হলো, কে আঁতকে উঠলো? কোন হার্টের রুগির হৃদকম্পন বেড়ে গেলো? তা দেখার কেউ নেই, এসব অনিয়মের কথা শোনার কেউ নেই। গাড়ির পেছনে বসে আছেন ডাক্তার। তার গাড়ির চালক অযথা হর্ন বাজিয়ে চলেছেন। ডাক্তার সাহেব একবারও বারণ করছেন না চালককে। এদেশে এখনো, বলা যায় ৯০ ভাগ ব্যক্তিগত গাড়ি চলে ড্রাইভার দিয়ে। এবং এই চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক দীক্ষা থাকলেও শিক্ষা গাড়ির মালিকদের বরাবর নয়। তারা এটা জানেই না অযাচিত শব্দ মানুষের জীবনে কতোটা ক্ষতি ডেকে আনে। তাহলে তাকে বোঝানোর দায়িত্ব কার? মালিক যদি বলে দেন, তাড়াহুড়ো করে গাড়ি চালানোর কোনো প্রয়োজন নেই, দরকার নেই নিয়ম ভাঙার। আর একান্ত দরকার না হলে একবারও হর্ন নয়। তাহলে চালকের কী শক্তি যে, তিনি এ কাজ করবেন। এই শহরে আমি দু-চারজন গাড়ির মালিক পেয়েছি তারা এটা করেন। এবং তারা ভালো আছেন।
একদা, এই দেশে ‘ওয়ান ইলেভেন’ নামে একটা আজব সময় এসেছিলো। তখন একটা অদ্ভুত ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ হয়েছিলো। সেই সরকার জরুরি সময় ঘোষণা করে তখন আমাদের অনেক অধিকার হরণ করে নিয়েছিলো। তবে সেই সরকার অনেকগুলো ভালো কাজ করেছিলো। ফটাফট অনেক অবৈধ স্থাপনা ভেঙে, গুড়িয়ে দিয়ে পথ বানিয়েছিলো। আর মহামারি আকার নেয়া শব্দদূষণ কমাতে একটা নিয়ম করে দিয়েছিলো; জাহাঙ্গীর গেট থেকে শাহবাগ পর্যন্ত হর্ন বাজানো যাবে না। বাজালেই জরিমানা করবে পুলিশ। তখন অনেকে জরিমানা দিয়েছে হর্ন বাজিয়ে। তখন বলা হয়েছিলো পর্যায়ক্রমে পুরো শহরই এই নিয়মের আওতায় আসবে।
সেই বিধি বা নিয়মটা নিশ্চয়ই কাগজে এখনো বহাল। কেবল কার্যকর করতে ভুলে গেছে পুলিশ।
এবং আবারো বলি, আরো সুস্থ বাংলাদেশ চাই, আরো সুস্থ ঢাকা শহর চাই। এখনি এই চাওয়ার একটুও পূরণ হবে না, যদি না দুই চাকার মোটর সাইকেলের হর্ন নিয়মে বেধে দেয়া না যায়। এক একটা মোটর সাইকেলে লাগানো হয়েছে ট্রাকের হর্ন। আর এটা বাজিয়ে শহরময় মোটর সাইকেল এভাবে ছুটে যেন কোথাও প্রলয় ঘটে যাচ্ছে! আর সেই মরণঝড় থামানোর দায়িত্ব এই শহরের মোটর সাইকেল চাকদের ওপর!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







