নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার রায়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলো। সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন আলোচিত ৭ খুনের ঘটনায় দু’টি মামলায় প্রধান আসামি নূর হোসেন, কর্নেল সাঈদ, মেজর আরিফ, মেজর রানাসহ ২৬ জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ এবং যাবজ্জীবনসহ ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডাদেশ দেন। প্রায় তিন বছর আগে নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনাটি সারাদেশে আলোড়ন তুলেছিল। ঘটনার একদিন পর কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা বাদী হয়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা (পরে বহিষ্কৃত) নূর হোসেনসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর উত্তেজিত জনতা সন্দেহভাজন কয়েকজনের বাড়িঘর ও অফিস পুড়িয়ে দেয়। পরে বেরিয়ে আসে যে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরই কেউ কেউ। হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি নুর হোসেনের পালিয়ে যাওয়া নিয়েও সমালোচনার ঝড় উঠে। ভারতে পলাতক অবস্থায় নুর হোসেনের সঙ্গে সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানের ফোনালাপ প্রকাশ হয়ে গেলে তা নিয়েও মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে। নুর হোসেনকে পরে ভারতীয় পুলিশ গ্রেফতার করে। সরকার তাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনে। হত্যাকাণ্ডে নিহতদের স্বজনদের করা দুই মামলায় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ৩৮টি শুনানির পর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সোমবার দুই মামলায় একসঙ্গে রায় দিয়ে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। এই রায়ে আইন শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের আত্মীয় বা নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী নেতার অনুগত কেউ আনুকূল্য পায়নি। নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী, মামলার বাদি সেলিনা ইসলাম বিউটি আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমরা খুবই সন্তুষ্ট, দ্রুত এই রায় কার্যকর করা হোক সেটাই আমরা চাই। উচ্চ আদালতেও এই রায় বহাল থাকবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা।’ তবে রায়ের পর আতঙ্কেও আছেন জানিয়ে সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, আমরা যেন এখন নিরাপদে থাকতে পারি। রায়ের পরে আমরা আরো আতঙ্কে আছি।’ বাদীপক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘এই রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে অপরাধ করে পার পাওয়ার সুযোগ নাই।’ আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, ‘রায়ে জনগণ সন্তুষ্ট।’ এই হত্যাকাণ্ড জনমনে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিলো তা দূর হবে বলে আশা তার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁনের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপথগামী সদস্যদের জন্য এই রায় বিশেষ বার্তা বহন করছে। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ শাসনামলে মানুষ যে ন্যায়বিচার পায় ৭ খুন মামলার রায় তারই প্রমাণ।’ বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু’র আশা, ৭ খুন মামলার রায় আইনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। মামলায় ফাঁসির দণ্ড পাওয়া র্যাবের দুই সাবেক কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যরা রায় নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তারা বলেছেন, ‘এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর মামলা। এ নিয়ে এখনই কোন মন্তব্য করা ঠিক হবে না।’ এলিট ফোর্স র্যাব আনুষ্ঠানিকভাবে কোন প্রতিক্রিয়া না জানালেও র্যাবের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘আইন আইনের গতিতে চলেছে। আইন সবার উর্ধ্বে। অপরাধী অপরাধ করেছে, বিচার হয়েছে। র্যাব কখনো অপরাধীদের প্রশ্রয় দেয় না। র্যাবের যারা সাত খুনের ঘটনায় জড়িত ছিলো তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে র্যাব।’ মামলার রায় ঘোষণার পর থেকে সমাজের নানা পর্যায় থেকেও বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। খুনের মামলায় সরকারের এলিট ফোর্স র্যাবের সিনিয়র কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তা দণ্ডিত হওয়ায় পুরো বাহিনীর কর্মকাণ্ডও আলোচনায় চলে আসছে। কেউ কেউ মনে করছেন, নারায়ণগঞ্জের ঘটনা র্যাবের একটি ইউনিটের কয়েকজন সদস্যের সিদ্ধান্তে হলেও সামগ্রিকভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বাহিনী সদস্যরা আরো সতর্ক হবেন। এলিট ফোর্সকে ঘুষ দিয়ে যদি ৭ জনকে হত্যা করানো যায় তাহলে এরকম ঘটনা আরো থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে আজ না হলেও অন্য কোন সময় ‘সাজানো’ ক্রসফায়ারের ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। সাত খুন মামলার রায় এই বার্তাই দিলো যে, ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা প্রভাবশালী বাহিনীর সিনিয়র কর্মকর্তা হলেও কেউই আইনের উর্ধ্বে নয়।








