কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ১১ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু। বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে মনিরুল হক পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৯৪৮ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা প্রতীকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মেয়র প্রার্থী আঞ্জুম সুলতানা সীমা পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৭৬৩ ভোট।
অথচ বিএনপি দফায় দফায় নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ করে আসছিল। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে রাজধানীর নয়াপল্টনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি নেতা দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে শাসক দলের সন্ত্রাস চলছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে ধানের শীষের প্রার্থীর এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। ঢুকলেও বের করে দেওয়া হচ্ছে। ক্ষমতাসীনরা স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবহার করছেন।’
বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল নির্বাচন কমিশন সংবিধান তাদের ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছে তা পালন করবে। প্রশাসনকে নানা অনাচার থেকে বিরত রাখবে। নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ করবে। সেই শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কোনো লক্ষণ আমরা ফুটে উঠতে দেখছি না।’

বিকেল চারটায় দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত অপর এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির এই নেতা বলেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অধিকাংশ কেন্দ্রে ক্ষমতাসীনদের ‘সন্ত্রাস-অনিয়ম’ ঠেকাতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ব্যর্থ হয়েছে।
কথিত এই ‘সন্ত্রাস-অনিয়ম’-এর নির্বাচনে দলের প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার পর কিন্তু বিএনপি নেতারা এই ফলকে প্রত্যাখ্যান করলেন না! মাঝখান থেকে নির্বাচনকে, নির্বাচন কমিশনকে কিছু কলঙ্ক দিলেন। নির্বাচনে জয় নিয়ে আত্মবিশ্বাসের অভাব, হেরে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা আগেভাগেই কিছু অভিযোগ তুলে রাখেন। যদি প্রার্থী হেরে যায়, তাহলে আগের অভিযোগকে পুঁজি করে নির্বাচন ‘প্রত্যাখ্যান’ করেন! আর জয়ী হলে সুর পালটে ফেলেন। এতে করে তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ পায়। এই মানসিকতার কারণে তাদের প্রার্থীরা হয়তো জিতে যায়, কিন্তু হেরে যায় দল, পরাজিত হয় গণতান্ত্রিক চেতনা ও মূল্যবোধ!
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনের ফলাফলে বিএনপি প্রার্থী কাগজে-কলমে জিতলেও আসলে বিএনপি হেরে গেছে। হেরেছেন বিএনপি প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কুও। তিনি হেরেছেন নৈতিকতার কাছে! এবার দিয়ে তিনবার পৌর মেয়র হিসেবে নির্বাচিত এই নেতা ভোট দিতে এসে ব্যালটে ধানের শীষে সিল মেরে তা গণমাধ্যমকর্মীদের দেখিয়েছেন। এর আগে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে ভোট দিয়ে ব্যালট পেপার প্রকাশ্যে দেখিয়ে আলোচিত হয়েছিলেন শামীম ওসমান। এটা রীতিমত আইন ও নৈতিকতা বিরোধী কাজ। প্রকাশ্যে ভোট দেওয়া, কিংবা ব্যালট পেপার অন্যদের দেখানো নির্বাচনি আইন ও বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধও।
নির্বাচনি আইন ও বিধি অনুযায়ী ভোটারদের গোপন বুথে ঢুকে ব্যালট পেপারে পছন্দের প্রতীকে সিল মেরে, তা ভাঁজ করে বাক্সে ভরে দিতে হবে। ভোটারদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে এই বিধান করা হয়। কিন্তু বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) নির্বাচনে ভোট দিতে এসে ব্যালটে ধানের শীষে সিল মেরে তা গণমাধ্যমকর্মীদের দেখিয়ে বিএনপি প্রার্থী মনিরুল হক সাক্কু নির্বাচনী বিধি ও আইনকেই বুড়ো আঙ্গুল দেখালেন! এ জন্য তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি? সে আশা দুরাশা মাত্র। শামীম ওসমানের বিরুদ্ধেও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এবারও হওয়ার সম্ভাবনা নেই। একই যাত্রায় পৃথক ফল হলে যে সরকারের কলঙ্ক হবে!
তবে বিএনপি যাই বলুক, ইচ্ছে ও আন্তরিকতা থাকলে যে একটি ভালো নির্বাচন করা যায়, কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আমরা আবারও তা দেখলাম। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া ভোটগ্রহণ মোটামুটি অবাধ ও শান্তিপূর্ণই হয়েছে। কুমিল্লায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা পক্ষপাতমূলক ছিল না এবং সেখানে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে দায়িত্বপ্রাপ্তরাও চাপমুক্তভাবে দায়িত্ব পালন করতে পেরেছেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের এটিই প্রথম নির্বাচন। ফলে তারাও চায়নি শুরুতেই কোনো বিতর্কে জড়াতে।
অনেকে মনে করছেন, বিএনপিকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নির্বাচনি মাঠে নিয়ে-আসার জন্যই আওয়ামী লীগ ‘কুমিল্লা মডেলের’ নির্বাচন একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র। আগামী নির্বাচনে বিএনপি মাঠে এলেই শুরু হবে ‘ফাউল গেম।’ যেহেতেু তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামক ‘রেফারি’ আর নেই, কাজেই ‘ফাউল’ করেও জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে তেমন কোনো বাধা থাকবে না।
এই নির্বাচনের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করার সময় এখনও আসেনি। স্থানীয় একটি নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকেও বিচার করা যাবে না। সাধারণ মানুষ পরিবর্তন চায়, তাই তারা ক্ষমতাসীন প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দিয়েছে কিংবা দলীয় কোন্দলের কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরেছে-ইত্যাদি অনেক কথাই বলা হচ্ছে। যদিও একটা সিটি করপোরশেনের নির্বাচন এবং এই নির্বাচনের ফল দিয়ে ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করাটা খুব একটা কাজের কথা নয়।
যাহোক, কুমিল্লা সিটি করপোরেশেনের নির্বাচন আমাদের দেশে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিধারায় কতটুকু কী প্রভাব ফেলে সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে। এ ব্যাপারে খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার মত উপাদান সত্যিই কী আছে? তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিংবা নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের চেয়ে আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলের মানসিকতা পরিবর্তন করা দরকার। নির্বাচনের রায়কে মেনে নেওয়ার মানসিকতা সবার আগে সৃষ্টি করা দরকার। যে জিনিসটা আমাদের মধ্যে নেই বললেই চলে। মূল সমস্যা আমাদের মানসিকতায়। আমরা সব কিছুর সমালোচনা করি। নিজের পক্ষে না এলে কোনো কিছুই গ্রহণ করি না। অজপাড়া-গাঁয়ের সেই একরোখা লোকটার সালিশি মানার গল্পটার মতই আমাদের দেশের রাজনীতিকদের মনমানসিকতা। সিদ্ধান্তটা আগেই নির্ধারণ করে সালিশের মজলিশে যান তিনি। তারপর বলেন, সবই মানি, স্বীকারও করি কিন্তু তালগাছটা আমার! আমাদের রাজনীতিতেও সেই প্রথাই চলছে। এখানে নির্বাচনকে তখনই সুষ্ঠু হিসেবে মানা হয়, যখন তারা বিজয়ী হন। তাদের নির্বাচনটা হারের জন্য নয়, বিজয়ের জন্য। নির্বাচনের আগের দিন, এমনকি নির্বাচনের দিনও নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। কিন্তু বিজয়ী হলে সুর বদলে যায়। তখন বলা হয়, নির্বাচনের ফল পাল্টে দেয়ার একটা গভীর চক্রান্ত হয়েছিল বটে, তবে ভোটাররা তা রুখে দিয়েছে!

এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনের কথা। বরিশালের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন। রাত দুটায় তিনি বরিশাল রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, প্রশাসন উদ্দেশ্যমূলকভাবে তার ফলাফল ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছে। তাই ঘোষণার আগেই তিনি ফল প্রত্যাখ্যান করলেন। এর পর দেখা গেল তিনি জিতে গেছেন। ব্যস, রাত পেরিয়ে সকাল হতে না হতেই প্রত্যাখ্যাত ফল সাদরে গ্রহণ করে হিরন প্রমাণ করলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই!
আমাদের দেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা হলো শিক্ষা না নেওয়ার শিক্ষা। আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নিই না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না। অভিজ্ঞতা থেকেও নয়। আমরা কেবল শিক্ষা দিতে চাই। কুমিল্লা সিটি করপোরশন নির্বাচনের সবচেয়ে শিক্ষা হলো, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ। প্রধান দলগুলোর অংশ্রগহণের মাধ্যমেই সম্ভব কার্যকর নির্বাচন। এতে প্রাণ থাকে, আনন্দ থাকে, থাকে উৎসবের সমারোহ। এর বাইরে নির্বাচন পরিণত হয় প্রহসনে। কাজেই আগামী জাতীয় নির্বাচনে প্রধান সব দলের অংশগ্রহণ সবচেয়ে বেশি জরুরি।
বিএনপিরও এই নির্বাচন থেকে শিক্ষা নেয়ার আছে। রাজনীতির ইতিবাচক ধারায় অবশ্যই তাদের ফিরে আসতে হবে। বর্জন-প্রতিরোধ কিংবা জ্বালাও-পোড়াওয়ের ইমেজ থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে। গণতন্ত্রে ক্ষমতা পরিবর্তন বা নিজের পছন্দের ব্যক্তির মাথায় মুকুট পড়াতে কিংবা অপছন্দের ব্যক্তিকে প্রত্যাখান বা জব্দ করতে নির্বাচন বা ভোটই হচ্ছে একমাত্র লাগসই অস্ত্র। এর কোনো বিকল্প নেই। কোনো সর্টকাটও নেই।
ভোটারবিহীন নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সুযোগ কাউকেই দেওয়া যাবে না। নির্বাচনে অংশ নিয়েই নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রক্রিয়া চালাতে হবে। দোষ-ত্রুটি-গলদগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে। তাহলে জনগণও গায়ের জোরে টিকে থাকা অপশক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)










