কীভাবে কাটবে রমজানের ২৪ ঘণ্টা

সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সময় মসজিদের silhouette এবং পাখির উড়ান, শান্তিপূর্ণ পরিবেশের ছবি।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ
সময় কাটে না। দিন ফুরায় না। কী যে করি, কী যে করি… রোজার দিনে এমন সমস্যা প্রায়-ই হয়। এ-বছর তো অবস্থা আরো খারাপ। সময় যেন যেতেই চায় না। অস্থিরতার সব মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে বহু আগেই। কিন্তু একটু চেষ্টা করলেই অস্থিরতা যেমন দূর করা যায়, প্রচুর কাজও বের করে ফেলা যায় সহজেই। নিচের কাজগুলোতে মন দিলে সময় না-কাটার এই সময়টাতে সময় খোঁজে পেতে মুশকিল হয়ে পড়বে।
চলুন দেখে নিই, কী কী করা যায়? শুরু থেকে শুরু করা যাক। একদম সাহরি থেকে। সেই দশ কিংবা এগারোটায় ঘুমিয়েছেন নিশ্চয়? এবার ওঠে যান। সাহরির সময় হয়েছে। অজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যান। শেষ রাতের নামাজ। তাহাজ্জুদ। স্রষ্টার কাছাকাছি হবার সবচেয়ে যুগান্তকারী মাধ্যম। চার কিংবা আট রাকাআত পড়তে পারেন। নবীজি প্রায়শই আট রাকাআত পড়তেন। সুনানে আন-নাসায়ি শরিফের ১৬১৪ নং হাদিসে এসেছে ‘ফরজ নামাজের পর সবচে’ উত্তম নামাজ হচ্ছে তাহাজ্জুদ’।
তাহাজ্জুদ শেষ। এবার কাজে হাত লাগান। ব্যাচেলর হলে তো কথাই নেই। নিজের খাবার নিজেই প্রস্তুত করুন। আর যদি পরিবারের সাথে থাকেন, মহিলাদের কাজে হালকা-পাতলা সাহায্য করুন। সাহরি খাওয়া সুন্নাত। প্রস্তুত হয়ে গেলে ধীরে-সুস্থে খেয়ে নিন। খাওয়া শেষ। আজান হয়ে গেলে এবার নামাজে মনোনিবেশ করুন। নামাজে তাড়াহুড়ো একেবারেই নয়; যতটা সম্ভব ধীরে-সুস্থে। শাহরু রমাদ্ব-নাল্লাজি উনজিলা ফি-হিল কুরআন। এ মাসেই পবিত্র কুরআনের অবতরণ। তাই দিনের শুরুটা কুরআন তিলাওয়াত দিয়ে হোক। ঘুমের তাড়া থাকলে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে ঘুমিয়ে যান। অন্যথা যতটুকু সম্ভব পড়তে থাকুন।
পর্যাপ্ত ঘুম হয়ে গেলে ওঠে পড়ুন। শরীর চাঙা করতে গোসল করে নিতে পারেন। মনে রাখবেন, এ-মাসের সকল ফরজে সত্তর গুণ, নফলসমূহ ফরজ সমপরিমাণ (বায়হাকি)। কুরআন নাজিলের মাস হিসেবে সময়টা আবারো ওখানেই দিতে পারেন। সাওয়াবও বেশি বেশি। সাধারণত প্রতি হরফে দশগুণ। রমজানের হিসাবে তা হবে মণিকাঞ্চন যোগ। সম্ভব হলে অর্থসহ জানার চেষ্টা করুন। তবে লক্ষ রাখবেন, তাফসিরের দিকে। কেননা কুরআনের অনেক আয়াত দুর্বোধ্য। ইন্টারনেটে অনেক তাফসিরের কিতাব বাংলাতেই পাওয়া যায়। তাফসিরে ইবনে আব্বাস, ইবনে কাসির, জালালাইন বা খানজুল ইমান ডাউনলোড করে নিতে পারেন। আর যদি পড়তে না-জানেন, ইন্টারনেট থেকে পুরো কুরআনের তিলাওয়াত ডাউনলোড করে নিন।
অতঃপর মনোযোগ সহকারে শুনতে থাকুন। মনে রাখবেন, তিলাওয়াত শ্রবণকারী পাঠকারীর মতোই সমান সাওয়াব পায়। আজকাল ইন্টারনেট ভিত্তিক কুরআন শিক্ষার অনেক কোর্স পাওয়া যায়। সেখান থেকেও তিলাওয়াত শিখে নিতে পারেন।
কুরআন ছাড়াও পড়তে পারেন ধর্মীয় নানান বই। জেনে নিতে পারেন, নামাজ-রোজাসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ মাসলা-মাসায়েল। কোনো একটি বই পড়বেন পড়বেন করে রেখে দিয়েছেন অনেকদিন ধরে? ওটা নিন, শুরু করুন। চাকরির প্রস্তুতিটা কিন্তু এই সুযোগে নিয়ে নিতে পারেন। সামনে পরীক্ষা থাকলে তো আপনার সময় থাকারও কথা না। সামর্থ্যবান হলে যথাসাধ্য দান করুন। আশপাশের কেউ অভুক্ত আছে কি-না খবর নিন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে বেশি পরিমাণ দান করতেন (বুখারি-৬)। একইভাবে তিনি বেশি দোয়াও করতেন। তাই প্রত্যেকটি ভালো কাজের পর মাওলার নিকট একান্তে প্রার্থনা করুন। শুয়াবুল ইমানের ৩৬২৭ নং হাদিসে এসেছে—এ মাসে নিয়মিত জিকিরকারীকে ক্ষমা করা হয়। অতএব, হাতে একটা তাসবিহ রাখুন সবসময়। হাঁটতে, বসতে, চলতে, ফিরতে মনে মনে জপতে থাকুন—আল্লাহু আল্লাহু…
বাড়িতে ছোটো বাচ্চাকাচ্চা থাকলে আড্ডা জমতে দিন। বাচ্চারা গল্প ভালোবাসে। গল্পের ছলে শিখিয়ে ফেলুন, প্রয়োজনীয় কোনো দোয়া। বলতে পারেন, নবি, সাহাবি কিংবা অলিদের জীবনী থেকে শিক্ষামূলক কোনো ঘটনা। সতর্কতার সাথে আশপাশের প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নিন। ফুলের সুঘ্রাণ দেহমনে প্রশান্তি আনে। বাসার ছাদে কিংবা আঙিনা সাজাতে পারেন গোলাপ, গাঁদা, চামেলি কিংবা রজনীগন্ধাদের মাধ্যমে।
বিকেলটা বড্ড বোরিং। কাটতেই চায় না। আপনি কোনটা ভালো পারেন? লিখতে, আঁকতে না-কি গাইতে? যা-ই পারুন না কেন, যেটাই আপনার স্ট্রংজোন হোকনা কেন, ওটাতেই মনোনিবেশ করুন। প্রাক্টিস করতে থাকুন। অবসর কোনদিকে কাটবে, খেয়ালই করতে পারবেন না। আসরের সময় হলে নামাজ পড়ে নিন। শেষ বিকেলের হাওয়াটা ভালো। স্নিগ্ধ। হৃদয় ছোঁয়ে দেয়। গ্রামে থাকলে বাড়ির চারপাশে দুকদম হেঁটে নিতে পারেন। শহরে থাকলে ঘরেই পায়চারি করুন। আপাতত বের হবার দরকার একদম নেই।
এবার বসুন। আপনার পিসি কিংবা স্মার্টফোনটা সামনে নিন। ডাউনলোড করা কুরআনের তিলাওয়াতটা মাঝারি ভলিউমে চালিয়ে দিন। প্লে করতে পারেন না’তে রাসুল কিংবা ইসলামি গানও। অথবা দেখতে পারেন বিজ্ঞ আলেমদের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত চ্যানেল আইয়ের নিয়মিত অনুষ্ঠান ‘রমজানুল মোবারক’। নবিজির বাণী অনুসারে রোজাদারের দুটি আনন্দের মুহূর্তের একটি ইফতারের সময়। অতএব, ইফতার তৈরিতে মনোনিবেশ করুন। পুরুষ হয়ে থাকলে গৃহকর্ত্রীদের অল্পস্বল্প সাহায্য করুন। এতে পারিবারিক ভিত শক্ত হয়। সম্পর্ক মজবুত ও মধুর হয়। সময়ও কাটবে ভালো। ইফতারের সময় হয়ে গেলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রণীত সূচী অনুসারে ইফতার করে নিন—আল্লাহুম্মা লাকা ছুমতু ওয়া আলা রিজকিকা আফতারতু বিরহমাতিকা ইয়া আরহামার রা-হিমিন!
ইফতার শেষে সালাতে মাগরিব। পড়তে পারেন অতিরিক্ত ছয় রাকাআত সালাতে আওয়াবিনও। এবার শুয়ে পড়ুন। বিশ্রাম নিন। সোশ্যাল মিডিয়ায় যেতে মন উসখুস করলে ওখানে সময় দিন কিছুক্ষণ। এশার সময় হয়ে এলে ধীরে ধীরে প্রস্তুতি নিন। জায়নামাজটা খোঁজে নিন। দাঁড়িয়ে যান তাঁর উদ্দেশ্যে, যাঁর কাছে প্রত্যেককেই ফিরে যেতে হবে। এশা পড়ুন। পড়ুন বিশ রাকাআত সালাতে তারাবি। মোনাজাতে হাত তুলে দিন। পাপের জন্য ক্ষমা, মুক্তির জন্য দোয়া করুন অশ্রু ছেড়ে। কুরআনে শিখিয়ে দেয়া নিয়মেই বলতে থাকুন—
“প্রভু হে,
করেছি গো শত অনাচার;
না-বুঝে কদর খাঁটি আত্মার।
যদি,
না-করো ক্ষমা, না-করো দয়া;
এ মোদের ধ্বংস নহে রুখিবার।” —(সুরা আরাফ-২৩)






