গুলশানে জঙ্গি হামলার পর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার অংশ হিসেবে কূটনীতিক পাড়া গুলশান থেকে অন্যান্য স্থাপনা ও ভবন সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ও সরিয়ে দেওয়া হতে পারে এই খবরে দলটির ভেতর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ।
দলটির একাধিক নেতা তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, সরকার আসলে কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে কৌশলে চেয়ারপারসনের কার্যালয়কে সরিয়ে দেয়ার নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে। বিএনপির নেতারা খালেদা জিয়ার এই কার্যালয় উচ্ছেদ কার্যক্রমকে তার সেনানিবাস থেকে বাসভবন উচ্ছেদের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া বলে মনে করছেন ।
তারা বলছেন, গুলশান থেকে খালেদা জিয়ার কার্যালয় সরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রকে যেকোন মূল্যে প্রতিহত করা হবে। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি সরকারের এই হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে বলেও তারা জানান। তবে চেয়ারপারসনের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, কার্যালয় উচ্ছেদের সরকারি সিদ্ধান্ত ও কঠোর অবস্থানের সংবাদে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন খালেদা জিয়া।
কার্যালয় সরিয়ে নেয়ার প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় নিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গুলশান কিংবা শোলাকিয়ার ঘটনার জন্য কী তাহলে পর্যায়ক্রমে গুলশান , শোলাকিয়া সহ সারাদেশ থেকে বিএনপির অফিস উচ্ছেদ করা হবে? তিনি এ ব্যাপারে সরকারের আভ্যন্তরীণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে গনমাধ্যমকে জানান, জঙ্গি সমস্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বিএনপির দেয়া জাতীয় ঐক্যের আহবানে সাড়া দিতে বলেন।
বিএনপির এই নেতা গুলশান কার্যালয় উচ্ছেদের পাশাপাশি নয়াপল্টনে দলের মহানগর অফিসকেও নিরাপত্তার আওতায় আনতে সিসি ক্যামেরা লাগানোর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উদ্যোগকে ভালভাবে দেখছেন না । তিনি জানান, এই ক্যামেরা কেন লাগানো হবে?
তিনি বিএনপিকে নজরদারিতে আনার সরকারী এসব উদ্যোগকে নিয়ন্ত্রণমূলক হিসেবে উল্লেখ সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন, গুলশানে দলের ওই একটা অফিস সরিয়ে দিয়ে বিএনপিকে স্তব্ধ করা যাবে না। তখন ঢাকায় এবং বাংলাদেশের ঘরে ঘরে দেশনেত্রীর কার্যালয় তৈরি হবে।
বিষয়টিকে সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে তিনি জানান, আমার অফিসে ক্যামেরা লাগবে কি লাগবে না, এটা আমার ব্যাপার। খুব বেশি হলে এ ব্যাপারে সরকার আমাকে উপদেশ দিতে পারে। আমার অফিসে প্রয়োজন হলে নিজের পয়সায় ক্যামেরা লাগিয়ে নেব। কিন্তু জোর করে ক্যামেরা লাগানোর অর্থ হল যে আপনারা আর অফিসে আইসেন না।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক প্রভাবশালী সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় জানান, দেশের প্রতিটি অঞ্চলই আজ হুমকির সম্মুখীন। শুধু পার্টিকুলার গুলশান থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয় সরে গেলে সেই এলাকা নিরাপদ হবে, সেই গ্যারান্টিটা সরকার কোথা থেকে পেল? তিনি তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে জানান, জঙ্গিরা কী সরকারকে জানিয়েছে যে আমরা গুলশান কূটনীতিকপাড়া ছাড়া অন্য কোথাও হামলা করব না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের আইন শৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রয়োজন মনে করলে পর্যায়ক্রমে দেশের সব বৈধ-অবৈধ ভবন ও স্থাপনাকে কঠোর নজরদাররি আওতায় নিয়ে আসবে। এক্ষেত্রে সংস্থাগুলো সবার আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করে। এখন দেশের অন্যতম বড় দল হিসেবে বিএনপি যদি সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করে তবে সেটা কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
দুই।।
গুলশান, শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা এবং সর্বশেষ কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় স্ট্রম টুয়েন্টি সিক্স অপারেশন – এইসব ঘটনার পরম্পরায় জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির ঘোলা জলে মাছ শিকারের পাঁয়তারা সরকারের ভেতরকার সব হিসেব নিকেশ বদলে দিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, জঙ্গি প্রশ্নে সরকার তার পুরনো অবস্থান থেকে সরে এসে উপলব্ধি করছে, এতদিন তারা ভুল পথে হাঁটছিলেন। জঙ্গি দমন প্রশ্নে আর কোন ধরনের ছাড় না বরং এ ব্যাপারে কঠিন থেকে কঠিনতর পদক্ষেপ নিতেও কুণ্ঠাবোধ করবে না সরকার। একই সঙ্গে গুলশান ঘটনায় বিএনপির চেয়ারপারসনের রহস্যজনক ভূমিকাকে সরকার গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দেশ ও মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্যের মধ্যে এনেছে ।
বিশেষ করে কূটনৈতিক এলাকা বলে পরিচিত গুলশান-বারিধারাকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার বলয়ে আনতে সম্ভাব্য সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণকে সরকার বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। কূটনৈতিক এলাকার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকাকেও কঠোর নিরাপত্তায় আনা হচ্ছে। রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরীহ মানুষ হত্যার পর জঙ্গিরা এবার কূটনৈতিক পাড়ায় নৃশংস হামলা চালিয়ে তাৎক্ষনিকভাবে তা প্রচার করে বিশ্ব মিডিয়ার নজরে এনে দিয়ে জঙ্গিরা নিজেদের সাফল্য তুলে ধরার ট্রায়াল দিয়েছে ।
আর এসব ঘটনার পেছনে সরাসরি ইন্ধন যুগিয়েছে কিছু চিহ্নিত রাজনৈতিক শক্তি। বিশ্লেষকরা বলছেন, গত দুই আড়াই বছর সরকার জঙ্গি আশ্রয়-প্রশ্রয়ের বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখলেও গুলশান ঘটনার নারকীয়তা ও বিভৎসতা সরকারের শীর্ষমহলের ঘুম হারাম করে দিয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ ও ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তদের রায় কার্যকর বানচাল করতে পেট্রোল সন্ত্রাস -চাঁদে সাঈদী দর্শন থেকে শুরু করে দেশব্যাপী ধারাবাহিক অস্থিরতা তৈরিসহ সর্বশেষ গুলশান-শোলাকিয়া-কল্যাণপুর ইস্যুকে একই সুতোয় গাঁথা বলে বিশ্বাস করছেন সরকার ।
জামায়াতে ইসলামি তাদের শীর্ষ নেতাদের বাঁচাতে দেশে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে সরকার পতনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। আর জামায়াতকে জোটে রেখে জামায়াতের এসব দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র ও কর্মকাণ্ডকে নৈতিকভাবে সমর্থন দিয়ে বিএনপি ছায়ার মত তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তৃত করার চক্রান্তে জড়িয়েছে।
সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নেতা জানিয়েছেন, গুলশানে জঙ্গি হামলার পর বিএনপির চেয়ারপারসনের দেয়া তাৎক্ষণিক বক্তব্য দেশবাসীর সামনে তার অবস্থানকে পরিস্কার করে দেয়। একইসঙ্গে খালেদা জিয়ার দেয়া জাতীয় ঐক্যের ডাককে সন্দেহজনক হিসেবে উল্লেখ করে তারা জানান, এই মুহূর্তে দেশ ও মানুষের বৃহত্তর স্বার্থে জাতীয় নিরাপত্তাকে বড় করে দেখছে সরকার। এই নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে রেখে এগুতে চায় সরকার ।
জানা যায়, আগামী ৩ মাসের মধ্যে রাজধানীর গুলশান, বনানী ও বারিধারাসহ সকল আবাসিক এলাকায় গড়ে উঠা সকল প্রকারের অবৈধ ও অননুদোমিত স্থাপনা অপসারণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








