ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে তথা সমাজের প্রায় সবখানেই বিবাহযোগ্যা কন্যার যোগ্যতা বিচারে অন্যতম শর্ত হলো – কুমারীত্ব। বিয়ের পূর্বে নারী কুমারী থাকা নিয়ে আছে নানা কু সংস্কার। এমনকি নারী প্রতি নির্যাতনের অস্ত্র হিসাবে প্রথমেই ব্যবহার করা হয় তার কুমারীত্বকে। মূলত যে অর্থে ‘ কুমারী’ ট্যাবু কে ব্যবহার করা হয় তা অনেকটাই ভ্রান্ত।
একজন নারীকে যৌনতার দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করে তাকে কুমারী, সতী বলে আখ্যায়িত করা ভুল। অথচ এ ভুল ধারণাই হলো বিয়ের কনের স্বভাব-চরিত্র, এমনকি তার পরিবারের ভাল মন্দ বিচার করার মাপকাঠি।
নির্মম হলেও সত্যি যে, কোন পুরুষের যৌনলোলুপতার স্বীকার হয়ে রেপ, এসিড নিক্ষেপ ইভটিজিং সহ অন্য কোন হয়রানি শিকার হলে ; মেয়েটি হারায় তার কুমারীত্ব। আর এমন মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে মা বাবা। কারণ মেয়েটি আর কুমারী থাকে না সমাজের দৃষ্টিতে।
নারীদের কুমারী থাকা সম্পর্কিত এ ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বিয়ের কাবিননামার (বিবাহ রেজিস্ট্রেশন ফর্ম) ৫ নম্বর কলামে নারীর বৈবাহিক অবস্থা বোঝাতে ‘কুমারী’ ‘বিধবা’ ও ‘তালাকপ্রাপ্ত’ কিনা তা উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু পুরুষের জন্য এ রূপ কোন কলাম রাখা হয়নি।
কাবিননামার ৫ নাম্বার কলামটি নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ । কারন পাবলিক ডকুমেন্টসে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য দেয়ার যৌক্তিক কারন নাই। অন্যভাবে বিয়ের আগে কেউ কুমারী থাকবে কি থাকবে না – সেটা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব অভিমত। কেননা আইনগত ও সামাজিক রীতিনীতি মেনে স্বাধীনভাবে চলার অধিকার রয়েছে প্রাপ্ত বয়স্ক সকল নারী পুরুষের। আর বর্তমান আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে সকল ক্ষেত্রে নারী স্বাধীন। তাই কাবিননামাতে নারীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রদানের বাধ্যবাধকতা ন্যায় সংগত নয়। এছাড়া একজন নারী প্রতিকূল পরিবেশের কারনেও কুমারীত্ব হারাতে পারে। তার অর্থ এটা নয় যে,সে বিয়ের অযোগ্য।
মুসলিম বিয়েতে কাবিননামা হলো একটি চুক্তি পত্র। যা সম্পাদন হয় বর কনে উভয়ের সম্মতিতে। সেখানে ব্যক্তিগত তথ্য প্রদানে বৈষম্যতা নারী প্রতি অবিচার।
দীর্ঘদিনের এ বৈষম্যতামূলক বিষয়টির অবসান ঘটে গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ হাইকোর্টের এক যুগান্তকারী আদেশে।
বিচারপতি নাইমা হায়দার ও খিজির আহমেদের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে উচ্চ আদালত আদেশ করেন, এখন থেকে কাবিননামাতে নারীর নামের পূর্বে তার বর্তমান অবস্থা বোঝাতে ‘কুমারী’ শব্দের ব্যবহার আর থাকছে না। এ শব্দটি মুছে তৎপরিবর্তে ‘অবিবাহিত’ লিখতে হবে। পাশাপাশি কাবিননামার ফরমে ৪-এর (ক) উপধারা সংযোজন করে ছেলেদের ক্ষেত্রে বিবাহিত, অবিবাহিত, তালাকপ্রাপ্ত কি না তা লিপিবদ্ধ করতেও নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মুসলিম বিবাহ ও তালাক আইনের ৯ ধারার ঐ অনুচ্ছেদ বৈষম্যমূলক বলে দাবি করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড ট্রাস্ট , নারীপক্ষ ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এক রিট আবেদন করেন। সে রিট আবেদনের রায়ে প্রাপ্ত এ আদেশের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতায়ন আরও এক ধাপ এগিয়েছে। যাতে নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতার জয় হয়েছে।
রিট আবেদনে বলা হয়েছিল, কাবিননামার আবেদনপত্রটি পাকিস্তান আমলে তৈরি। মূলত পাকিস্তান শব্দের পরিবর্তে বাংলাদেশ শব্দ লেখা ছাড়া আর কোন সংশোধন এতদিন হয়নি। আরো বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে ,কাবিননামার আবেদনপত্রে শুধু কনের বৈবাহিক অবস্থা ও তথ্য সন্নিবেশ করার জন্য অনুচ্ছেদ রয়েছে। বরের বৈবাহিক অবস্থা সংক্রান্ত কোন কলাম নেই। এতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। যা সংবিধানের ২৭,২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান পরিপন্থী ও নারী পুরুষ সমতার সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলোর সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এগুলো থাকা বাধ্যতামূলক নয়। মুসলিম শরীয়তে এ ধরনের শর্ত নেই।
রিটকারি আইনজীবীদের মতে কুমারী শব্দটি নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার ও ব্যক্তি স্বাধীনতাকে চ্যালেঞ্জ করে। কাবিননামায় শব্দটি বৈষম্যের সৃষ্টি করে বিধায় এর বিরুদ্ধে রিট করেন আইনজীবী আইনুন্নাহার সিদ্দিকি ও জেড আই খান পান্না। রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার।
রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানীর পর আদালত কাবিননামার পাঁচ নম্বর কলাম কেন বৈষম্যমূলক ও বেআইনি ঘোষণা করা হবে না; তা জানতে চেয়ে ২০১৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এক রুল জারি করে। রুলে ৫ নাম্বার কলাম থেকে ‘কুমারী’ শব্দটি বিলোপ করে ফরমটি সংশোধন করা এবং বর সম্পর্কিত কোনো ক্রমিক ফরমে কেন উল্লেখ করা হবে না; তাও জানতে চাওয়া হয়। উচ্চ আদালত জনপ্রশাসন সচিব, ধর্ম সচিব, প্রিন্টিং এবং প্রকাশনা অধিদপ্তরের মহাপরিচাকলসহ সংশ্লিস্টপদের রুলের জবাব দিতে বলেন। এর মধ্যে রুল শুনানিতে অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে মতামত দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বেলায়েত হোসেন। তিনি বলেন ৫ নম্বর কলামে কুমারী শব্দটি থাকা উচিত না। কারণ এটি ব্যক্তির মর্যাদা ও গোপনীয়তাকে ক্ষু্ণ্ণ করে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এছাড়া ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী এগুলো থাকা বাধ্যতামূলক নয়। মুসলিম শরীয়তে এ ধরনের শর্ত নেই।
মুসলিম বিয়ের পদ্ধতিতে কাবিননামা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর সেখানে কুমারী শব্দটি নারী আত্মমর্যাদাকে হেয় করে দিত। তাই কাবিননামার দুটি কলামের পরিবর্তনের ফলে নারী পুরুষের অধিকার ও স্বাধীনতায় ভারসাম্য এসেছে। আর কুমারী শব্দের বিলোপে নারীর মর্যাদাকে কটাক্ষ করার সুযোগ আর থাকল না। তাই কুমারী শব্দ মুছে ফেলার এ রায় বাংলাদেশে নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় জয়ের নব কেতন উড়িয়ে দিয়েছে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







