কানাডায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের নাকি চলন বাঁকা, অনেকেই দেখতে পারেন না। অনেকে নামও শুনতে পারেন না। কানাডাপ্রবাসীদের ঘরোয়া আসরগুলোতে আমি সাধারণত চুপচাপ থাকি। উদ্দেশ্য কে কী বলে কীভাবে বলে শোনা ও বোঝার চেষ্টা করা। অনেকে ভোগান্তির লম্বা ফিরিস্তি দেন। হাইকমিশন কাকে কীভাবে কষ্ট দিয়েছে সে’সব গল্প। চুপচাপ শুনলে বোঝা যায় অনেক কথায় মাত্রাতিরিক্ত অতিরঞ্জন আছে। অনেকে নিজের নয় অন্যের অভিজ্ঞতার গল্প শোনান। শালা-শালি, খালা-খালু কে কখন কীভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছে ইত্যাদি। প্রায়শই ভাবতাম অন্যদের কথা তো শোনা গেল। হাইকমিশনের কর্তা-কর্মকর্তাদের গল্পগুলো অভিজ্ঞতাগুলো শোনা দরকার। জানা দরকার মানুষকে কষ্ট দিয়ে তাঁদের কী অনুভূতি হয়, কেমন লাভ হয়। নাকি এ’সব নিছক যোগাযোগের সমস্যা? সেবাদাতা-সেবাগ্রহীতা একজন আরেকজনকে বুঝতে পারছেন তো?
যোগাযোগ সমাজতত্ত্বের প্রথম পৃষ্ঠার পাঠই হচ্ছে— “কম্যুনিকেশন ইজ ইন্যাভিট্যাবলি অ্যা টু-ওয়্যে প্রসেস”। যোগাযোগ মাত্রই একটি দ্বিপাক্ষিক প্রক্রিয়া। ছাত্র-শিক্ষক, ক্রেতা-বিক্রেতা, সেবাদাতা-সেবাগ্রহীতা এ’রূপ বাইনারি সম্পর্ক একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ের সরল ও একরৈখিক যোগাযোগ প্রক্রিয়া মাত্র। এই সরল-সোজা প্রাথমিক পর্যায়েই যদি পরপস্পর যোগাযোগরত ‘ক’ এবং ‘খ’ এর মধ্যে বুঝাবুঝির অভাব বা আস্থার ও বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়, তাকেই ‘যোগাযোগের গভীরতম সমস্যা’ বলা যায়। বাসর শেষেই বর-কনের কলহ যেমন ‘যোগাযোগের গভীর সমস্যা’! বিচ্ছেদই যেমন এই ধরণের সমস্যার নিয়তি-পরিণতি। দীর্ঘ যৌথজীবন-শেষে এই একই সমস্যাই ‘নগন্য’ বা ‘গৌণ’ সমস্যা বা আদৌ সমস্যাই নয়।
হাইকমিশনের সঙ্গে সেবাপ্রার্থীদের সমস্যাগুলোর বেশিরভাগও নবদম্পতির ‘যোগাযোগের গভীর সমস্যার’মত। শুরুই সমস্যা শুরুতেই সমস্যা? কিন্তু কেন? হাইকমিশনের সেবাদাতারাই বা সমস্যাগুলোকে কীভাবে দেখেন? সমাধানের কথা কখনো ভেবেছেন কি? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর পাবার সুযোগটি তৈরি হয়েছে কানাডা-ম্যানিটোবা অ্যাসোসিয়েশন (সংক্ষপে সিবিএ) এর নিবেদিতপ্রাণ নির্বাহীবৃন্দ ও স্বেচ্ছাসেবকদের কল্যাণে।
সিবিএ চারদিনের জন্য হাইকমিশনের কন্স্যুলার সেবাকে কানাডার ম্যানিটোবায় বসবাসকারী বাংলাদেশিদের নাগালের মধ্যে নিয়ে এসেছিলেন। সংগঠনটির আমন্ত্রণে কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের কর্মকর্তা দল তিন রাত চার দিনের জন্য তাঁদের যাবতীয় সেবা সরঞ্জাম বাক্সভর্তি করে ম্যানিটোবায় নিয়ে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য ম্যানিটোবার বাংলাদেশিদের কন্স্যুলার সেবা দেয়া। সরাসরি ও সামনাসামনি হাতে-কলমে সহায়তা যেন তাঁরা দ্রুততম সময়ে নির্ভূ্লভাবে আবেদনপত্র পূরণ করতে পারেন। হাতে লেখা পাসপোর্ট প্রতিস্থাপন করিয়ে নতুন মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট পেতে পারেন কিংবা পুরনোটি নবায়ন করে নিতে পারেন ইত্যাদি। সেবার আওতায় আরো ছিল নাগরিকত্ব কার্ড, জন্ম-নিবন্ধন ও ভোটার কার্ড এর আবেদনপত্র গ্রহণ, ফরম পুরণের খুঁটিনাটি সরাসরি তত্ত্বাবধান, সত্যায়ন, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দান, এবং আবেদনকারীদের ছবি ও আঙ্গুলের ছাপ গ্রহণের মাধ্যমে বায়োমেট্রিক তথ্য নিবন্ধন ইত্যাদি।
আড়াইশ’ জনেরও বেশি বাংলাদেশি সরাসরি উপকৃত হলেন। তা-ও দ্রুততম সময়ে। নির্ভূল ও নিশ্চিতভাবে। সর্বোপরি আনন্দঘন ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে। খুটিনাটি খুনসুটি ও ঠাট্টা-কৌতুকও চলছিল নিরন্তর। কন্স্যুলার দলকে মনে হচ্ছিল ম্যানিটবাবাসীদের আজন্ম পরিচিত। যেন সকলেই একটি পরিবারেরই সদস্য। জনম জনমের পরিচিত। একবারের জন্যও মনে হচ্ছিলনা তাঁরা অতিথি। বড় সুবিধাটি হয়েছিল আলাপ-আলোচনার, ভাব ও তথ্য বিনিময়ের, সমস্যাগুলো চিহ্নিতকরণের। তাঁরা মন খুলে বলে গেলেন কীভাবে কোন কোন প্রেক্ষাপটে কেন সেবাগ্রহিতারা তাঁদের ভুল বুঝেন, বিরক্ত হন, দোষারোপ ও সমালোচনায় ছিন্নভিন্ন করেন। তাঁরা ম্যানিটোবায় না এলে, তাঁদের সীমাবদ্ধতাগুলো, অনিচ্ছাকৃত বাধ্য-বাধকতামূলক দায় ও দায়িত্বের কথাগুলোও মন খুলে না বললে আমার অনেক প্রশ্নের উত্তরও মিলত না।
নিজ চোখে দেখা অনেকগুলো হতে মাত্র একটি উদাহরণ দিই। তা-ও নিজেকে নিয়েই। আমি দৃঢ়বিশ্বাসী ছিলাম আমার নিজের পাসপোর্টের ফর্ম পূরণে কোনো ভুল হয়নি। কারণ, এখন ফরমগুলো আগের তুলনায় অনেক সহজবোধ্য, সোজাসাপ্টা, সংক্ষিপ্ত ও ঝামেলামুক্ত যা যে কোনো সাধারণ অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষের পক্ষেও সহজে পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু সরাসরি সহায়তা নিতে গিয়ে দেখলাম আমিও একটি-দু’টি নয় অনেকগুলো ভুল করেছি।
পাসপোর্ট সংক্রান্ত বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। সামান্য অসতর্কতায় সামান্য ভুলে ভ্রান্ত তথ্যসমেত পাওয়া পাসপোর্ট যে কাউকে যে কোনো সময় অনেক বড়সড় বিপদে ফেলতে পারে। ফরম পুরণে যে সুক্ষ মনোযোগ দরকার— ভুলভ্রান্তি বারবার পরীক্ষা করে দেখার দরকার— জীবনযুদ্ধের ব্যস্ত-সমস্ততার কারণে আমরা অনেকেই তা পারিনা বা করিনা। চাক্ষুষ করলাম কন্স্যুলার কর্মকর্তা দল তাঁদের সাধ্যের মধ্য থাকা ভুলভ্রান্তিগুলো নিজেরাই শুদ্ধ করে নিচ্ছেন। কিন্তু যে আবেদনকারীর পরতে পরতে ভুলভ্রান্তি, হাতের লেখা পাঠযোগ্য নয়, তাঁর কাছে আবেদন ফরম ফেরত পাঠানোই যথার্থ। ফরম ফেরত পেলে ভুল করা ব্যাক্তিটিও বাকরুদ্ধ হন। হয়ত রেগে গিয়ে অনলাইনে নেতিবাচক মন্তব্য দিয়ে এলেন। ফলাফল ভালো হবার কথা নয়। কন্স্যুলার সেবাদাতাগণও মানুষ। তাঁরাও সেবাগ্রহীতাদের দ্রুত প্রতিক্রিয়ায় হতাশ হন। তাঁদের ও অবসন্নতা, অনাগ্রহ, অনিচ্ছা ও বিরক্তি তৈরি হয়।
একটু গভীরে নজর দেয়া যাক।
উন্নত দেশের সেবা খাতে “আউটরিচ” কর্মকান্ড বাধ্যতামূলক। গুগল-এর মতে শব্দটির বাংলা অর্থ ‘প্রচার’। গুগল ডাহা ভুল অনুবাদ করেছে! এটি আসলে ‘রিচ আউট’ বা ‘রিচিং আউট’ বা ছুটে গিয়ে কাউকে ছুঁয়ে দেয়া, মন ভালো করিয়ে দেয়া, ক্ষোভ-অভিযোগ আমলে নিয়ে কারণ জেনে ভুল বুঝাবুঝির সুরাহা করে সম্প্রীতিভাব প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বুঝায়। শব্দটি কাছে যাওয়া, পাশাপাশি বসে পরস্পরের অনুধাবনের ভিন্নতাগুলো কমিয়ে আনা ইত্যাদি ভাববাচক “আউটরিচ” এর যথার্থ সংজ্ঞা মেলে কবিগুরুর কথায়। “অন্তরে তার ডাক পাঠাবো আনবো ডেকে” ভাবটিতে। বিকল্প হিসেবে ‘জনসম্পৃক্ততা’ ভালো শব্দ। তবে রাজনীতিবিদদের পেছনে ব্যবহৃত হওয়ায় শব্দটির গায়ে রাজনীতি-রাজনীতি গন্ধ লেপ্টে আছে। ‘জনমূখিতা’ শব্দটি দিয়ে কাজ চলতে পারে, তবে পারস্পরিকতার মুলভাবটি পষ্ট হয়না। আবারো কবিগুরুই ভরসা। “দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে”ই ‘আউটরিচ’ এর সারকথা।
কিন্তু এই চর্চা কি দেশে বা বিদেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে আদৌ হয় বা হওয়া সম্ভব?
ঠিক দশ বছর আগে আমি এক এনজিওর প্রশিক্ষণসূচিতে “আউটরিচ” লিখলে খোদ এনজিও-প্রধানই বোঝেননি শব্দটি কী বা কেন! তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের সামনেই একাধিকবার পড়ছিলেন ‘আউটবিচ’। ‘আউট বিচ’ শুনতে গালির মত শোনাচ্ছিল। তিনি পাশের চেয়ারে এসে বসলে কানে-কানে বলেছিলাম— আপনার কম্পিউটার অপারেটর ভুলে সম্ভবত ‘র’ লিখতে গিয়ে ‘ব’ লিখছে, ‘আউটরিচ’কে ‘আউটবিচ’ লিখেছে। [আসলে অপারেটর ঠিকই লিখেছে, উনাকে লজ্জা দিতে চাইনি, তা-ও উনি বোকা বোকা চেহারায় তাকিয়েছিলেন। শরীরি ভাষায় জানতে চাইছিলেন ‘আউটরিচ’ আবার কি জিনিষ!]
সেই দিনগুলোতে ‘পার্টিসিপেটরি’ আর ‘পার্টিসিপেশন’ অর্থাৎ ‘অংশগ্রহণমুলক’ আর ‘অংশগ্রহণ’ শব্দ দু’টির বাড়াবাড়ি ব্যবহারই শুধু দেখতাম। ‘অংশগ্রহণমুলক’ হতে হলে ‘আউটরিচই’ যে আসল প্রথম শর্ত তা হয়ত সেই এনজিওকর্তার জানা ছিল না। বাংলাদেশের সকল সেবা-সংস্থাই বর্তমানে অনেক আধুনিক ও পরিণত হয়েছে শুনতে পাই। অনুমান করি সব বিভাগেই ‘আউটরিচ’ বা দোরগোড়া পর্যন্ত যোগাযোগের ব্যবস্থা হয়েছে ইতোমধ্যে। উন্নত দেশে সামাজিক বিজ্ঞানের সিলেবাসে ‘আউটরিচ ম্যানেজমেন্ট’ এবং ‘স্টেইকহোল্ডার ম্যানেজমেন্ট’ (সংশ্লিষ্টজনা ব্যবস্থাপনা) থাকবেই। এই দু’টি জানা না থাকলে সমাজকর্মী হওয়া অসম্ভব।
কিন্তু এর অর্থ মোটেই এটি নয় যে ‘আউটরিচ ম্যানেজমেন্ট’ এবং ‘স্টেইকহোল্ডার ম্যানেজমেন্ট’ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকলে সমাজকর্মী হওয়া সম্ভব নয়। আসলে খুব ভালোভাবেই সম্ভব। সমাজকর্মের জন্য দরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, ইচ্ছা ও আগ্রহ, একাগ্রতা এবং নিরলস পরিশ্রমের মানসিকতা। কারণ এটি সহজকর্ম নয় বরং যথেষ্ঠ পরিশ্রমসাধ্য যোগাযোগের বিষয়।
সিবিএ কন্স্যুলার সেবাটির জন্য ক্যারিবিয়দের একটি পরিপাটি কম্যুনিটি সেন্টারের কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে অস্থায়ী কার্যালয় তৈরি করেছিল। কানাডার ম্যানিটোবার বাংলাদেশিরা সকৃতজ্ঞ চাক্ষুষ করছিলেন নিরলস দৌড়ঝাঁপ, অতিথিদের হোটেল-সেন্টারে আনা-নেওয়া, তত্ত্বাবধানও আতিথেয়তার ব্যস্ততায় গলদ্ঘর্ম সংগঠনটির কর্মকর্তা রানা এসএমএ, ফায়সাল শিবলি, ড. মানিক হোসাইন, সামিলাত কায়সার, রেজা কাদির, ও রবিউল ইসলাম খানকে। কর্মব্যস্ত স্বেচ্ছাসেবক দলের খালেদা আক্তার লাবনী, ইশরাত জাহান তৃষা, কামরুল মিথুন, হুদা আলভি, লাবিব রানা ও তারিকুল হক। আর একান্তে বিরতিহীন কন্স্যুলার সেবা দিয়ে চলেছেন কন্স্যুলেটের কর্মকর্তাবৃন্দ।
একই সময়ে হাইকমিশনার মহোদয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের দায়িত্বে নিযুক্ত প্রথম সচিব মহোদয় স্থানীয় বণিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সংগে বৈঠক করছিলেন। মিলিত হচ্ছিলেন কৃষিপণ্য উৎপাদন ও রপ্তানীসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সংগে। কথা বলেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে। উদ্দেশ্য দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ালোচনা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন। তাঁরা প্রামান্য তথ্যের আলোকে বাংলাদেশকে অযুত সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিমূখী দেশ হিসেবে উপস্থাপন করছিলেন প্রতিটি ফোরামে। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন ম্যানিটোবার সংগে বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে।
এই মেলবন্ধন হতে অনেক প্রশ্নের উত্তরই মিলেছে। জানা গেল অন্যান্য কয়েকটি প্রদেশেও এভাবে কন্স্যুলার সেবা দেয়া হয়েছে, এবং সেই সব প্রদেশেও হাইকমিশন এবং বাংলাদেশিদের ভুল বুঝাবুঝি দ্রুত কমছে, পারস্পরিক সম্মান-সৌহার্দ্য বাড়ছে। হাইকমিশনও ভবিষ্যতে সেবার গন্ডি-পরিধি বাড়াতে আগ্রহী হচ্ছে। বোঝা গেল এনজিও, কর্পোরেশন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বেলাতেই শুধু নয়, সিভিল সার্ভিসের বেলায়ও মাঠ পর্যায়ে সেবাদাতা-সেবাগ্রহিতার পারস্পরিক যোগাযোগের কোনো বিকল্প নাই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








