একে তো সিনেমার ব্যবসায় মন্দা, ঈদ কিংবা বড় আয়োজনের ছবি ছাড়া দর্শক সিনেমা হলে যেতেই চায় না, তারউপর নতুন করে যোগ হয়েছে করোনাভাইরাস আতঙ্ক! রবিবার বাংলাদেশে করোনাভাইরাস রোগী সনাক্তের পর চারদিকে সেই আতঙ্ক আরো দ্রুত ছড়িয়েছে। জনজীবনে স্বাভাবিক গতিতে কিছুটা ছন্দপতনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে দুদিন ধরে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ঢাকাই সিনেমাতে!
করোনা আতঙ্কে দেশের প্রেক্ষাগৃহে কমতে শুরু করেছে দর্শক! অন্য যে কোনো দিনের চেয়ে সোমবার ও মঙ্গলবার রাজধানীর প্রেক্ষাগৃহগুলোতে দর্শক নেই বললেই চলে! দেশের একাধিক প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের সঙ্গে আলাপ করে এমনটাই জানা গেছে।
করোনা ভাইরাসের ভয়েই সিনেমা হলে দর্শক কমে যাচ্ছে বলে জানান প্রেক্ষাগৃহ সংশ্লিষ্টরা।
প্রদর্শক মালিক সমিতির সাবেক উপদেষ্টা মিয়াঁ আলাউদ্দিন বলেন, দিন যতই যাচ্ছে করোনা ভাইরাস নিয়ে ভয় ততই বাড়ছে। ভিড় সমাগম হলে করোনা বেশি ছড়ায়। সিনেমা হলে দর্শকদের ভিড় হয়। এই ভয়ে দর্শক আসা কমে গেছে।
দেশের আধুনিক সিনে থিয়েটার স্টার সিনেপ্লেক্সেও করোনা ভাইরাসের ভয়ে দর্শকের উপস্থিতি কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার সিনিয়র বিপণন কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে অফিসিয়াল ঘোষণার পর থেকে দর্শকের উপস্থিতি কমে গেছে। স্টার সিনেপ্লেক্সের বসুন্ধরা সিটি, ধানমন্ডি, মহাখালী সবগুলো শাখাতেই দর্শক কম হচ্ছে।
ব্রামস: দ্য বয় ২, কল অব দ্য ওয়াইল্ড, অনওয়ার্ড, বার্ডস অব প্রে’র মতো হলিউড ছবির প্রদর্শন চলছিল সিনেপ্লেক্সে। ছবিগুলোতে রবিবারের আগেও সন্তোষজনক দর্শকদের উপস্থিতি ছিল। কিন্তু ওইদিন সরকারিভাবে ঘোষণার পর থেকে দর্শক অনেক কমে গেছে।
মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সবার মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে স্টার সিনেপ্লেক্সের কর্মীদেরও মাস্ক দেয়া হয়েছে। করোনা ভাইরাস পরীক্ষার ফার্মাল ডিটেকর মেশিন আনার চেষ্টা চালাচ্ছি। আমরা দর্শকদের পরীক্ষা করেই সিনেপ্লেক্সে ঢুকাবো।
দেশের ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা সিনেমা হলেও করোনা ভাইরাসের ভয়ে দর্শক কম আসছে বলে জানালেন প্রদর্শক সমিতির সাবেক সভাপতি ইফতেখার নওশাদ। তিনি বলেন, করোনা নিয়ে মানুষ যতটা ভয় পাচ্ছে, এতোটা যদি সচেতন হতো তাহলে চিন্তার কিছু ছিল না। সাধারণ মানুষ করোনা মানেই নিশ্চিত মৃত্যু মনে করে ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে। সিনেমা হলে এই প্রভাবটা পড়তে শুরু করেছে। শুধু সিনেমা হল না, সব সেক্টরে বিশেষ করে ব্যবসায়িক সেক্টরে করোনা ভাইরাস প্রভাব ফেলছে।
রাজধানীর ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলে চলছে শাকিব খানের ছবি ‘শাহেনশাহ’। করোনার প্রভাব ভয়াবহভাবে পড়েছে উল্লেখ করে ব্যবস্থাপক শামসুদ্দিন বলেন, শাকিব খানের সিনেমা এলে কমপক্ষে চারদিন প্রতি শোতেই ভিড় থাকে। শাহেনশাহ মুক্তির দুদিন পরেই দেশে করোনা ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এতে ব্যবসায় চরমভাবে প্রভাব পড়েছে। উচ্চশ্রেণীর দর্শক সিনেমা হলে আসছে না। যে কজন আসছে বেশিরভাগই নিন্মবিত্ত দর্শক। করোনার ভয়ে হলের অবস্থা খুবই খারাপ।
রাজধানীর মানুষের কাছে করোনা আতঙ্ক বিরাজ করলেও অন্য শহরে তেমন প্রভাব পড়েনি। রংপুরের শাপলা সিনেমা হল, যশোরের মনিহার, সাতক্ষীরার সংগীতায় আলাপ করলে তারা জানায়, ঢাকার বাইরে যারা নিয়মিত সিনেমার দর্শক তারা এখনো করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সঠিকভাবে জ্ঞাত নন। নাম শুনেছে কিন্তু এর ভয়ে সিনেমা হলে আসবে না এমনটা হয়নি।
করোনা ভাইরাসের ভয়ে সিনেমা হলে তুলনামূলক দর্শক কম হচ্ছে বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন প্রযোজক পরিবেশক সমিতির সহ-সভাপতি কামাল কিবরিয়া লিপু। তিনি বলেন, পাবলিক রিলেটেড সব ব্যবসায় হুমকির মুখে আছে করোনার কারণে। রাস্তাঘাটেও মানুষ কম বের হচ্ছে। আর সিনেমা হল তো একটা পাব্লিক প্লেস। সেখানেও ইতোমধ্যে প্রভাব পড়ছে।
উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, শুক্রবার ‘শাহেনশাহ’ মুক্তির পর ভালো ওপেনিং সেল ছিল। কিন্তু রবিবার করোনা ভাইরাস রোগি সনাক্ত ঘোষণার পর তুমুলভাবে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এ কারণে, সারাদেশে রবিবার থেকে হলে দর্শক কমতে শুরু করেছে।
করোনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বিনোদনেও। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক উপস্থিতির হার কমা সহ আসন্ন ছবি মুক্তির তারিখও পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। হলিউড, বলিউডে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে ফিল্মের প্রমোশন, তারকা শিল্পীদের কনসার্ট!
১৩ মার্চ মুক্তি চূড়ান্ত থাকলেও করোনার কারণে পিছিয়ে দেয়া হয়েছে মাসুদ হাসানের বহুল প্রতীক্ষিত ছবি ‘ঊনপঞ্চাশ বাতাস’-এর মুক্তি। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, মানুষের জীবনের চেয়ে সিনেমা বড় নয়। বর্তমানে করোনা ভাইরাস সারা বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাস চিহ্নিত হয়েছে। করোনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই মুক্তি পেছানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মাসুদ হাসান বলেন, করোনা ভাইরাসের জন্য সারা বিশ্বে একই পরিস্থিতি। জেমস বন্ড সিরিজের ‘নো টাইম টু ডাই’ ছবিটিও করোনার জন্য মুক্তি পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। এপ্রিলে মুক্তির কথা থাকলেও এটি এখন প্রায় ৭ মাস পর মুক্তির নতুন তারিখ দিয়েছে। এটাতো আর এমনি এমনি না। তো আমাদের এখানেও যেহেতু করোনার জন্য বড় জমায়েতে বাধা নিষেধ আছে, তাই আমরা চাই নি এগুলোকে উৎসাহিত করতে।







