প্রবাস সংবাদ

করোনাভাইরাস: দেশে দেশে প্রবাসীদের নতুন অভিজ্ঞতা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইটালি, সুইজারল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স ও চীন প্রবাসীদের কথা।

বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে রাস্তাঘাটে কম যানবাহন ও জনজীবন স্তব্ধ. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বিভিন্ন দেশের রাস্তাঘাটে জনজীবন ও যানবাহন কমে গেছে, শহরগুলো নির্জন ও শান্ত।. Channel i News – চ্যানেল আই নিউজ

বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯’র মহামারিতে প্রাণ যাচ্ছে হাজার হাজার মানুষের। চীন থেকে শুরু করে পুরো ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া সর্বত্র প্রতিদিন শত শত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে। উন্নত বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থাও ব্যর্থ এই মৃত্যুর মিছিল থামাতে। বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ রয়েছেন এইসব দেশে। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখন অবরুদ্ধ সময় কাটাচ্ছেন সেইসব দেশে। আমরা প্রবাসে বসবাসরত এই বাংলাদেশিদের কাছ থেকে আমরা জানতে চেয়েছি তাদের সেদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি। যেহেতু পরিসংখ্যান প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে সেহেতু আমরা কেবল সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা সব দেশের বর্তমান পরিস্থিতি তাদের নিজেদের ভাষ্যে তুলে ধরেছি।

সুইজারল্যান্ড থেকে ব্লগার ও লেখক অমি রহমান পিয়াল, ইটালি থেকে কবি মজনু শাহ, কানাডা থেকে নারী আন্দোলন কর্মী রুবিনা চৌধুরী, ফ্রান্স থেকে লেখক সাগর কান্তি দেব, আমেরিকা থেকে ব্লগার ও গবেষক সাব্বির হোসাইন, অস্ট্রেলিয়া থেকে লেখক ও শিল্পী লুসিফার লুসি, ফিনল্যান্ড থেকে মানবাধিকার কর্মী সাধনা মহল ও চীন থেকে শিক্ষার্থী ওবায়দুর চৌধুরী অজয় জানাচ্ছেন সেসব দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি।

সুইজারল্যান্ড থেকে অমি রহমান পিয়ালস্মার্টফোন হাতে একজন যুবক, কালো পোশাক ও সানগ্লাসে, শহরের বাইরে বসে।. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
এমনিতে সুইসরা শুচিবায়গ্রস্থ জাতি হিসেবে কুখ্যাত। তারা ঘরবাড়ি অপরিষ্কার রাখে না, কোথাও এক ফোটা ময়লা তারা সহ্য করে না। তাদের এই খুতখুতে স্বভাবটা কিংবদন্তীর পর্যায়ে গেলেও করোনা মহামারিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ দেশগুলার একটি সুইজারল্যান্ড। এখন পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্য হচ্ছে ২৩ হাজার ২৮০ জন আক্রান্ত এবং মারা গেছেন ৮৯৫ জন। প্রতি মুহূর্তে সংখ্যাটা বাড়ছে।

গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সুইজারল্যান্ডে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ক্যান্টন টিসিনোতে, ইতালির লাগোয়া সীমান্তে। প্রাথমিকভাবে ইতালি ফেরতদের মাধ্যমেই বেশীরভাগ সংক্রমণ ঘটেছে। এর বাইরে টুরিস্ট এবং বিদেশ ফেরত সুইসরাও করোনা ক্যারিয়ার হিসেবে লিপিবদ্ধ। প্রথম রোগীটি শনাক্ত হওয়ার তিনদিনের মাথায় সুইস সরকার বড় বড় সব আয়োজন বাতিল করে দেয়, ১ হাজার জনের উপস্থিতি হয় এমন সব ইভেন্ট পরিত্যক্ত হয়। মার্চের শুরুতেই তারা সোশ্যাল ডিস্টেন্সিংয়ের বিধি জারি করে। সেলফ কোয়ারেন্টাইন কিভাবে করতে হবে তার নির্দেশনাসহ লকডাউনে চলে যায় গোটা দেশ।

সর্দিকাশিজ্বর নিয়ে কোনো ডাক্তারখানায় যাওয়া নিষিদ্ধ। ফোন করে এপোয়েন্টমেন্ট নিতে হচ্ছে। উল্লিখিত উপসর্গ থাকলে তাকে বাসাতেই থাকতে হবে। অবস্থা বেশী খারাপ হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসাসেবার সবটুকু থাকার পরও বাস্তবতা হচ্ছে সুইসরা মরছে, তারপরও তারা লড়ছে।

ইটালি থেকে মজনু শাহPortrait of a man with short black hair and a neutral expression. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
ইটালিতে এখন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৩৯ হাজার ৪২২ জন এবং মারা গেছে ১৭ হাজার ৬৬৯ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ২৬ হাজার ৪৯১ জন। খুব মুমূর্ষু অবস্থায় আছে ৪ হাজার। এদের নিয়ে শঙ্কায় আছে এখানকার প্রশাসন। গতকাল থেকে আক্রান্তের সংখ্যা একটু কমেছে, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহই বলা চলে। মহামারীর কেন্দ্রগুলো এখন উত্তরের শহরগুলো থেকে দক্ষিণের দিকে যাচ্ছে, যেখানে হাসপাতালের অবকাঠামো উত্তরের মতো ভালো নয়। সরকার ৩ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউনের যে সময়সীমা আছে, সেটা বাড়িয়ে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত করেছে।

খারাপ সময় যাচ্ছে। আমরা যে শহরে থাকি, তার কাছাকাছি এলাকায় করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছে ব্যাপকভাবে। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। অনেক কিছুই বন্ধ। কারখানা খোলা থাকায় এর মধ্যেই কাজে যেতে হচ্ছে।

ফ্রান্স থেকে সাগর কান্তি দেবআধুনিক পোশাক পরা ব্যক্তি গাছে ঘেরা পার্কে দাঁড়িয়ে. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ
ফ্রান্সে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ১২ হাজার ৯৫০ এবং মোট প্রাণহানি ঘটেছে ১০ হাজার ৮৬৯ জনের। একেবারে শুরুতে প্রথমত সরকারের ভুলের কারণেই আজকের এই পরিস্থিতি, এই ধরণের একটা ব্যাপারকে একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে ইলেকশন চালিয়ে যাওয়া। ইলেকশনের আগের দিন সকল ধরণের আপডেট বন্ধ রেখে ইলেকশন উপযুক্ততা তৈরি করে ইলেকশনের পরে পরেই ঘোষণা এলো প্রায় সব কিছু বন্ধের। বন্ধের তালিকায় নেই, সুপার শপ, তাবাক (সিগারেট কেনার দোকান) (এই দেশে আলাদা করে সন্ধে ৭/৮ টা অবদি তাবাক খোলা থাকে, লিগ্যালি একমাত্র সেখান থেকেই সিগারেট কেনা যায়), ফার্মেসী, মাংসের দোকান, হোটেল (যার ইচ্ছা সে খোলা রাখতে পারবে)! এবং আরো কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের দোকান।

প্রথমত কারফিউ জারির পরে পরে ৩৫ ইউরো ফাইন ধার্য করে দেখা গেলো প্রথম দিনেই প্রায় ৮০০ মানুষকে ফাইন করতে হয়েছে শুধু প্যারিস আর নিকটবর্তী এলাকায়, এই এলাকাকে এখানে ইলদ্যু ফ্রান্স বলে। পরে সেই ফাইন বেড়ে ১৩৫ থেকে ২০০ পর্যন্ত গেছে এখন। কেউ একই অপরাধ দুইবার করলে ফাইন ৩৭৫০ ইউরো অবধি যেতে পারে সেই সাথে ৬ মাসের জেল। কিছুটা কন্ট্রোল এতে হয়েছে। তবে চাইলেই আসলে যে কেউ বাইরে যেতে পারে। এদের অয়েব থেকে একটা ফরম নামাতে হয় এর পরে সেই ফরম নিজেই ফিলাপ করে কাজে যাচ্ছি, খাবার কিনতে, হসপিটালে, মেডিসিন কিনতে, এমন কয়েকটা অপশন চয়েজ করতে হয়। সেই সাথে সময় দিয়ে দিতে হয় এই সময় থেকে এই সময় আমি বাইরে থাকবো বলে। যথাযত কারণ না দেখালে বা এই ফরম না থাকলে ফাইন হয়।

Paris Eiffel Tower with tourists wearing masks during COVID-19 pandemic. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ

সুপারমল গুলোতে খাবার সংকট এখনো দেখা দেয়নি তবে চাইলেই গিয়ে ঢুকে যাওয়া যায় না। লাইন থাকে বা এরা কন্ট্রোল করে কম কম মানুষ ঢোকাচ্ছে। এখানের অনেকগুলো স্টেডিয়ামকে সাময়িক হাসপাতালে রূপান্তর করা হবে। আর ল্যা দিফন্স নামের একটা বিশাল খোলা মার্কেট এর বাইরের জায়গাও চলে যেতে পারে সাময়িক হাসপাতালের জন্য। অনেক জিম সেন্টারও।

নতুন করে গত ২৮ তারিখে আরো ১৫ দিনেরজন্য সবকিছু বন্ধের ঘোষণা এসেছে। অনেক এলাকায় বিশেষ কারফিউ আর অনেক এলাকায় কিছু পার্ক একেবারে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্যারিসের পাশের এয়ার পোর্টের মাঝে অরলী বন্ধ করে দিয়েছে একেবারে, অন্যটা এখনো চালু তবে ঢিমেতালে।
এরা প্রতিদিন মাত্র একবার আপডেট দেয় সন্ধ্যে ৭ টায়। ইউকের মত করে এখানেও চাইলেও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া যাবে না।  বাংগালী অধ্যুষিত এলাকায় বা বাঙ্গালিদের মাঝে বেশ অনেকেই অসুস্থ হয়েছেন। এখনও কারো মারা যাবার খবর শুনিনি।

অনেকেই কাজে যেতে বাধ্য যেমন যারা বিন কালেক্ট করে, যারা সুপারশপে জব করে, যেইসব হোটেল এখনো বন্ধ করেনি। স্থানীয় মানুষের মাঝে ভীতির পরিমাণ আসলে কম, এক হতে পারে এমন কিছু জীবনে দেখেনি, আরেক হতে পারে এরা আসলেই ভয় পায় কম!

সাব্বির হোসাইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৩১ হাজার ৯৩৫ জন। ফলে দেশটিতে এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৯২৭। অপরদিকে দেশটিতে নতুন করে ১ হাজার ৯৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ এখন পর্যন্ত দেশটিতে মোট প্রাণহানির সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৯৭।

দেশটিতে ২২ হাজার ৮৯১ জন ইতোমধ্যেই চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। তবে ৯ হাজার ২৭৯ জনের অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক। আক্রান্ত ও মৃতের হার স্টেটগুলোর মধ্যে নিউইর্য়কে সবচেয়ে বেশি – প্রায় ৪৫%।

এরমধ্যে নিউইর্য়ক সিটির অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। শুধুমাত্র নিউইর্য়ক সিটিতে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৬৮ হাজার ও মৃতের সংখ্যা নয়শো’র উপরে। নিউইর্য়ক সিটির হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা পর্যন্ত নেই। জরুরি সেবার জন্য আমেরিকান নৌবাহিনীর হসপিটাল জাহাজ ইউ.এস.এন.এন কমফোর্ট আনা হয়েছে; এক হাজার শয্যা বিশিষ্ট এই হাসপাতালে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত নয় এমন রোগীদের সেবা দেয়া হবে, যাতে নিউইর্য়ক সিটির হাসপাতালগুলো করোনা আক্রান্তদের সেবা দিতে পারে।

আতংকের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে নিউইর্য়কের সিটির জনজীবনে। করোনার এপিডেমিক প্রতিরোধে লকডাউন ও স্টে এট হোম আদেশের কারণে সদা জাগ্রত ও কোলাহলের এই শহর পরিণত হয়েছে নিস্তব্ধ  ভয়াল মৃত্যুপুরিতে। সবার এখন একটাই প্রতীক্ষা – কবে শেষ হবে ভয়াবহ এই মহামারী দুর্যোগ!

লুসিফার লুসি অস্ট্রেলিয়ার থেকে
অস্ট্রেলিয়ায় এখন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৬ হাজার ১০৪ জন। এবং মারা গেছে ৫১ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২ হাজার ৪৮৭ জন। খুব মুমূর্ষু অবস্থায় আছে ৮১ জন।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন প্রত্যেকদিন জনগনের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিচ্ছেন। দেশের এই রকম পরিস্থিতিতে মানুষ যেন বিপন্ন বোধ না করে সে উদ্দেশ্যে সরকার সব সময় সচেস্ট থাকছে। সেন্ট্রাল লিংক থেকে সাপোর্ট বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে যারা চাকুরি হারিয়েছেন এই পরিস্থিতিতে তাদের সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টরা যারা স্কলারশিপে এসেছে তাদের বৃত্তি বাড়ানো হয়েছে।

প্রবাসীদের মধ্যে যারা এখানকার সিটিজেন তাদের সুবিধা আর সব সিটিজেনের মতই। কেবল যারা নাগরিক নন তাদের হয়ত কিছুটা অসুবিধা হতে পারে কাজ বন্ধ হয়ে যাবার ফলে। তবে সেসব ক্ষেত্রেও কিছু কিছু মানুষ তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছে।

সিডনি অপেরা হাউস ও হারবারের সুন্দর দৃশ্য, আকাশে মেঘের ছায়া. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ আজকে পর্যন্ত টোটাল করোনা টেস্ট হয়েছে প্রায় চার লাখ। পৃথিবীতে সবচাইতে বেশি টেস্ট হয়েছে অস্ট্রেলিয়াতে।

প্রবাসীদের নতুন অভিজ্ঞতা নিয়ে ছবি, বাংলাদেশি যুবক. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ ওবায়দুর চৌধুরী অজয় চীন থেকে
‘‌‌করোনা’ শব্দটি আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। খুব নিবিড় সম্পর্ক এই শব্দটির সাথে। শব্দটি যদিও অস্বস্তিকর এবং ভয়ঙ্কর, তবু চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অবস্থানের কারণে প্রতি মুহূর্তে এটি শুনতেই হচ্ছে। এখন যদিও এটি বিশ্বময় জাল ছড়িয়ে দিয়েছে। গত তিন মাস ধরে আমিসহ চীনের সকল মানুষের জীবনের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে দিয়েছে মারণব্যাধি এই ভাইরাসটি।

চীনে এখন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৮১ হাজার ৮৬৫ জন। এবং মারা গেছে ৩ হাজার ৩৩৫ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৭ হাজার ৩৭০ জন। খুব মুমূর্ষু অবস্থায় আছে ১৭৬ জন।

করোনা নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা মিশ্র। শুরুটা হয়েছিলে জানুয়ারির মাঝামাঝিতে। যদিও ডিসেম্বরে উহান শহরে এর বিস্তার শুরু। কিন্তু চীনে গণমানুষের মাঝে করোনা নিয়ে জাগরণ শুরু হয় জানুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহ থেকে। বসন্ত উৎসবের আয়োজন চলছিলো পুরো চীনজুড়ে। হঠাৎ করে সেই আমেজ তৈরী হলো শঙ্কায়। বিদেশী হিসেবে তাদের বসন্ত উদযাপন নিয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ ছিলো। পরে আমার সেই আগ্রহ পরিণত হলো সর্তকতা নির্দেশনাবলীর মনোযোগে। রীতিমত বদলে গেলো জীবনধারা। শহরের চারপাশে মাস্ক পরা মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেল। আমিও সামিল হই সেই দলে। সাবওয়ে ট্রেনে দূরত্ব বজায় রেখে সবাই বসছে, সবাই কেমন খুব বেশি সচেতন হয়ে ওঠে। পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছে কী এক সন্দেহ নিয়ে! মানুষের নির্মল হাসি উধাও হয়ে গেলো। ধীরে ধীরে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে শুধু সর্তকতা আর মৃত্যু সংবাদ।

শীতের সময় খালি শহর রাস্তা, গাছগুলো ঝরা পাতা দিয়ে ভরা. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ হুবেই প্রদেশের উহান শহর যেনো মৃত্যুপুরিতে পরিণত হয়েছিল, বেইজিং থেকে আমরা প্রতিদিন এমন ভয়াবহ সংবাদ পাচ্ছি। লকডাউন শব্দে চীনের বহু শহর বন্দী হয়ে গেলো। আমার সঙ্গে পড়তে আসা বহু বিদেশী বন্ধুরা চীন ত্যাগ করলেন। যদিও গত মঙ্গলবার উহান থেকে লকডাউন প্রত্যাহার করা হয়েছে।

যারা ফ্রেবুয়ারির পর চীনে এসেছে তাদেরকে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে দেখেছি। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী শিক্ষার্থী কেউ শহরের বাইরে যেতে পারেনি। আর যারা গিয়েছে তারা আসার অনুমতি পায়নি। দুই মাস ধরে এসব বিষয় দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। তবে একটা বিষয় দেখেছি, লোকজনকে যে কোনো পরিস্থিতিতে ঘরে রাখতে চীন সরকার বদ্ধপরিকর ছিলো। আর এটা যে কতোটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে চীনকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, এটা বুঝতে পেরেছি।

সাধনা মহল ফিনল্যান্ড থেকে
ফিনল্যান্ডে সাধারণ হাসপাতালগুলোতে করোনার কোনো চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না, বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

ফিনল্যান্ডে এখন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৪৮৭ জন। এবং মারা গেছে ৪০ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩০০ জন। খুব মুমূর্ষু অবস্থায় আছে ৮২ জন।

এখানে অনেকেই বাড়ির নীচে কিছুটা সময় গিয়ে হাঁটাহাঁটি করে। বাচ্চারা  অনলাইনে লেখাপড়া করছে। দুই একটি ক্লাস তারা অনলাইনে করে, বাকি বিষয়গুলো শিক্ষকরা মুঠোফোনে ম্যাসেজে জানিয়ে দেয়। সে অনুপাতেই তারা লেখাপড়া করে। সব স্কুল কলেজই বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার।

কর্মজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষরা ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ এ অফিসের কাজ শেষ করছেন। বিভিন্ন মিটিং থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়গুলোও তারা অনলাইনে সেরে নিচ্ছেন।

Open highway with blue sky and scattered clouds in a rural area. Channel i News - চ্যানেল আই নিউজ এখানে কেউ প্যানিক না, ফিনল্যান্ডে জনসংখ্যা কম, দোকানপাট কম। তাই বলে কেউ বেশি বেশি খাবার মজুত করে রাখছে তা নয়। স্বাভাবিক ভাবেই তারা দৈনন্দিন কেনাকাটা করছে। তবে এখানকার মানুষ বুঝতে পেরেছে যে এই বৈশ্বিক মহামারিতে তাদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। এবং তারা সেটাই করছে।

রুবিনা চৌধুরী কানাডা থেকে
এখন পর্যন্ত কানাডাতে এখন পর্যন্ত করোনায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১৯ হাজার ৪৩৮ জন এবং মারা গেছেন ৪৩৫ জন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৪ হাজার ৬৫৩ জন। খুব মুমূর্ষু অবস্থায় আছে ৫১৮ জন। দেশের নতুন তৈরি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মধ্য বয়সী বেশিমাত্রায় আক্রান্ত হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখানো মোট আক্রান্তদের মধ্যে, ২০-২৯ বয়স্ক ১২%, ৩০ থেকে ৩৯ বয়স্ক ১৭%, ৫০-৫৯ বয়স্ক ২০%, ৬০-৬৯ বয়স্ক ১৬%, ৭০-৭৯ বয়স্ক ৯%, ৮০-উর্ধ্বে বয়স্ক ৫%।

জনগণের সুবিধার্থে চালু হয়েছে ফোন এবং অনলাইন এসেসমেন্ট প্রক্রিয়া। পাবলিক হেল্থের নম্বরে ফোন করলে কর্তব্যরত নার্সের সাথে শারীরিক অবস্থা নিয়ে আলাপ করা যায়, নিশ্চিত হওয়া কেউ আক্রান্ত কিনা, পরবর্তী দায়িত্ব সম্পর্কে নার্স জানিয়ে দেয়। অনলাইন এসেসমেন্টে জানা যায় কোন উপসর্গগুলো করোনাভাইরাসের আর সেগুলো সাধারণ ফ্লু থেকে কি করে আলাদাভাবে শনাক্ত করা যাবে। কারণ, শীতপ্রধান দেশ হিসাবে কানাডায় এখন বসন্ত এবং ফ্লু কাল। এখনো বাইরে যথেষ্ট ঠাণ্ডার প্রকোপ।

করোনার সর্বশেষ বিশ্বচিত্রটি এখানেই শেষ নয়। আমরা আরও বিস্তারিত জানার জন্য সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছি আরও অনেকের সঙ্গে। অন্যান্য দেশগুলো থেকে বিস্তারিত পেলেই পাঠকদের কাছে তুলে ধরবো বলে আশা করছি।

অস্ট্রেলিয়ার ছবি: রানাম রায়হান

বিষয়:করোনা করোনাভাইরাস বিশ্বে করোনা পরিস্থিতি

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…