বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় দলের সভাপতি শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতানেত্রীরা সম্প্রতি যারা সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ধুয়ে দিয়েছেন। কথার হুল ফুটিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া যে বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন তাতে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলেন, ‘ওনার কত বড় দুঃসাহস?’ ‘শহীদদের নিয়ে কটাক্ষ করে। বলে, এতো মানুষ মারা যায়নি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওনার (খালেদা জিয়া) পেয়ারে পাকিস্তান যা বলবে, সেটাই সত্য। ৩০ লাখ মানুষ মারা গেল, তা সত্য না।’
শিক্ষক আন্দোলনের কড়া সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সম্মানবোধ নিজেদের ওপর নির্ভর করে। শিক্ষার্থীদের ক্লাস বন্ধ করে দিয়ে সম্মান আদায় করা যায় না। যদি এতোই মর্যাদায় লাগে তাহলে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পিএসসি পরীক্ষা দিয়ে সচিব হয়ে যান। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নষ্ট করবেন না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেট্রোরেলের রুট পরিবর্তনের জন্য ছাত্রদের আন্দোলনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘পড়ার ইচ্ছা থাকলে মানুষ সুযোগ করেই নেয়। আর, যদি ইচ্ছা না থাকে, তাহলে ছুতা অনেক পাওয়া যায়। পড়ার ইচ্ছা থাকলে পড়া যায়। ট্রেনে চলতে চলতে তো মানুষ পড়ে। চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে তো রেল যায়। সেখানে তো তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হয় না। মেট্রোরেলে পড়াশোনার কোনো অসুবিধা হবে না।’
বাড়ি নির্মাণ কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার কতটুকু ক্ষতি হয় সে প্রশ্ন তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা যেখানে বসবাস করে সেখানে তো দিনরাত কনস্ট্রাকশনের কাজ হচ্ছে। সেখানে পড়ছে না?’
আন্দোলনকারীদের শঙ্কা নাকচ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির সাউন্ড সিস্টেম কন্ট্রোল করা হবে। সে জ্ঞানও তাদের নেই। সে খবরটাও তারা রাখেন না।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা বলেছেন যুক্তির নিরিখে তা হয়তো অকাট্য। কিন্তু যেভাবে বা যে ভাষায় বলেছেন তাতে সংশ্লিষ্টদের মনে আঘাত লাগতে পারে। আমাদের সহৃদয় প্রধানমন্ত্রীর কি আর এতটা কঠোর হওয়া চলে? কারো মনে আঘাত দেওয়াটা কী প্রধানমন্ত্রীর শোভা পায়? মন ভাঙ্গা আর মসজিদ ভাঙ্গা যে সমান কথা!
দুই.
বছর তিনেক আগে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘আমাদের পানিতে বিষ। বাতাসে বিষ। পলিটিশিয়ানদের মুখেও বিষ। দিন যতই যাচ্ছে, ততই আমাদের মুখের বিষ তীব্র হচ্ছে।’ (সমকাল, ৪ এপ্রিল ২০১২)। এখানেই তিনি থেমে থাকেননি। প্রখ্যাত কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেছেন, ‘শরীরের শক্তি কমতে থাকলে মুখের বিষ বাড়ে।’ সত্যিই কী তাই? আমাদের সমাজ ও রাজনীতির মানুষগুলোর কী ‘শরীরের শক্তি’ কমছে? আর তাই ‘মুখের বিষ’ বাড়ছে?
তিন.
বিখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষের একটি বইয়ের নাম ‘জার্নাল’। এই বইয়ের একটি প্রবন্ধের নাম—‘জীবনচরিত’। এতে তিনি ম্যাক্সিম গোর্কির লেখা লিও টলস্টয় জীবনচরিত সম্পর্কে সম্যক আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, এ ধরনের বই আমাদের দেশে লেখা হবে না কখনো। কারণ হিসেবে তিনি লিখেছেন, আমরা আমাদের লেখায় সাধারণত মানুষকে হয় দেবতা করে তুলি, নয়তোবা তাকে দেখাবো পুরোদস্তুর একজন শয়তান হিসেবে। গোর্কি, তার বইয়ে টলস্টয়ের যে ছবি এঁকেছেন তাতে কখনো টলস্টয়কে মনে হয় একজন সাধারণ মাপের মানুষ, কখনো মনে হয় অপকৃষ্ট। গোর্কি অবাক হয়ে যান টলস্টয়ের অনেক নিকৃষ্ট আচরণে। কিংবা অনেক আঘাতকারী মন্তব্যে। টলস্টয়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে ছেলেমানুষের মতো লুটিয়ে পড়েন গোর্কি। অথবা তার দিকে তাকিয়ে ভাবেন লোকটা হয়তো ঈশ্বর, যদিও গোর্কি ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন না। বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে এরকম করে যে লেখা যায়, আমাদের দেশে এই বোধটাই তৈরি হয়নি এখনো। কবি শঙ্খ ঘোষ তার এই জার্নাল বইটি লিখেছিলেন সম্ভবত সত্তরের দশকে। সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে তিনি হয়তো তার নিজস্ব দার্শনিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তী ৩০-৪০ বছরে আমাদের মনোজগতে ঘটে গেছে বিপুল পরিবর্তন। এখন আমরা আর কাউকে দেবতা হিসেবে ভাবতে পারি না। কিংবা কাউকে দেবতা হিসেবে মেনে নিতেও পারি না। এখন শুধু কেউ হয় অর্ধশয়তান। কিংবা কখনো পূর্ণ শয়তান। এখন আমরা আমাদের কথাবার্তা লেখায়, আলোচনা ও সমালোচনায় কাউকে অর্ধনগ্ন করি। কিংবা কাউকে করি সম্পূর্ণ নগ্ন।
দীর্ঘদিন পর্যন্ত ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাঙালি মধ্যবিত্তদের মধ্যে অন্তত একটা আগল বা রাখঢাক ছিল। সব কথা বলতে নেই, সবার সামনে বলতে নেই, সব জায়গায় বলতে নেই, বললেও লিখতে নেই এরকম কতকগুলো গণ্ডি ছিল। ফলে ভাবনার জগতে যা-ই থেকে থাক না কেন, সেটা সবসময় প্রকাশ্যে এসে পড়ত না। ব্যবহারিক সৌজন্য বজায় থাকত। গত তিন দশকে সেই ভব্যতার আড়াল একেবারে হাওয়া হয়ে গেছে। এখন আমরা যে কেউ যে কাউকে যা খুশি তাই বলছি। নম্র-ভদ্র-সভ্য শব্দ ব্যবহার ভুলে গালাগালকেই একমাত্র ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছি। এখন রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী আর শ্রমজীবী-নিরক্ষর মানুষের ভাষায় খুব একটা তফাত নেই। এক্ষেত্রে আমরা সাম্যবাদী হয়ে গেছি। খিস্তি-খেউড়-গালাগাল আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। ব্যক্তি-পরিসর আর জন-পরিসরের মধ্যে সীমারেখা ঘুচে গিয়েছে।
যেসব শব্দ ছাপার অযোগ্য বলে গণ্য হতো, সে সব আজ শরতের মেঘের মতো জননেতার মুখে, বুদ্ধিজীবীর লেখায় কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ার দেয়ালে ভেসে বেড়াচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে সংবাদ কিংবা মতামতের নিচে সাংবাদিকদের প্রতি যে কদর্যতর হুমকি দিয়ে মন্তব্য পোস্ট করা হয়, কিছুদিন আগেও যা অকল্পনীয় ছিল। এখন এসব কুকথা মানুষ লিখে আনন্দ পাচ্ছে, বলে আনন্দ পাচ্ছে, যারা পড়ে কিংবা শুনে তারাও নিশ্চয়ই আনন্দ পায়। এসবের চাহিদা বা বাজারমূল্য যদি নাই থাকবে, তাহলে সবাই এসব গালাগাল-খিস্তি-খেউড়ের প্রতি এমন উৎসাহ দেখাবে কেন?
কুকথা যদি কোনও ‘প্রোডাক্ট’ হয়, তার ক্রেতা আমরা সকলেই। আর যার কাটতি আছে, তাকে বাজার থেকে হটাবে কে? সবার উপরে বাজার সত্য এ কথা আজ রাজনীতির মঞ্চেও খাটছে।
তবে একথা ঠিক যে, খুনের রাজনীতি আমাদের রাজনৈতিক-সংস্কৃতি এবং ভাষাকে বদলে দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হয়েছেন। জিয়াউর রহমানকেও খুন করা হয়েছে। ২১ আগস্ট বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সমাবেশের উপর গ্রেনেড হামলা করে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। এই প্রতিটি হত্যাপ্রচেষ্টা বা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্ষমতালিপ্সু ষড়যন্ত্রপ্রিয় কিছু কিছু রাজনীতিক। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড আমাদের দেশে নিয়মিতই ঘটছে। যখনই যাকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয়, তখনই তাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। কখনও তা শাসক বা বিরোধী দলের মদদপুষ্ট গুণ্ডারা করেন, নেতারা করেন, আবার কখনওবা করেন আমাদের রক্ষকেরা। অনেক খবর বেরোয় না। অনেক খবর বেরিয়েও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়। আমরাও সর্বংসহা হয়ে যাচ্ছি। প্রতিবাদের ভাষা আর সত্য উচ্চারণের সাহস আমরাও হারিয়ে ফেলছি। আমাদের সামনে কেউ কাউকে গালাগাল করলেও আমরা এর প্রতিবাদ করি না। এমনকি আমাদের গালি দিলেও না শোনার ভান করি। এ যুগে আমরা তেমন সাহস দেখাই না। এ যুগের মানুষের প্রাণের মায়া বেশি। বর্তমানে কেউ যদি সত্য বলে তার পেছনেও মতলব থাকে। আর সত্য অস্বীকার করা, সত্য গোপন করা কিংবা মিথ্যা বলার পেছনে তো উদ্দেশ্য থাকেই। প্রাণের ভয় হয়তো সবসময় থাকে না; কিন্তু অনেক কিছুই হারানোর ভয় থাকে।
চার.
কথার বিষের কথা বলে আর কী হবে? আমাদের তো জীবনের সবখানেই বিষ! এক কবি দুঃখ করে বলেছেন,
‘দিব্যি বেঁচে আছি খাবারের বিষে, বিষের খাবারে
বিষ-বাষ্প নিঃশ্বাসে ভরে নিচ্ছি ফুসফুস, সরোবরে
বিষ হজম মনের একান্ত গহ্বরে…
চোখের বিষ
মনের বিষ
ধনের বিষ
ভালবাসার নামে ঈর্ষার বিষ জ্বলে আত্ম অহংকারে!’
তবে সব সময় সব বিষ কাজ করে না। বিষে ভেজাল তো আছেই, বিষ নিয়ে ভুলও হতে পারে। হয়ও। পরিশেষে এ বিষয়ে একটি পুরানা গল্প।
বিমর্ষ এক লোক একটি রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলেন, এক গ্লাস লাচ্ছি দিতে বললেন ওয়েটারকে। অন্য দিনের চেয়ে একটু তাড়াতাড়ি চলে এল লাচ্ছির গ্লাস। তিনি লাচ্ছির গ্লাস সামনে রেখে খানিক্ষণ বসে থাকলেন। খাবার আগে ভাবলেন বাইরের দুনিয়াটাকে একটু ভালো করে দেখবেন। টেবিল এ ফিরে দেখলেন তার লাচ্ছির গ্লাস অন্য আর একজনের হাতে এবং তিনি বেশ আয়েশ করে তার সেই গ্লাস থেকে লাচ্ছি খাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে তিনি চেয়ারে বসে কাঁদতে শুরু করলেন। সামনের লোকটি বিব্রত হয়ে বললেন প্লিজ কাঁদবেন না, এক গ্লাস লাচ্ছিই তো আমি আপনাকে দুই গ্লাস লাচ্ছি কিনে দিচ্ছি। শুনে তিনি বললেন আমি সেজন্য কাঁদছি না। তাহলে? জানতে চাইল ঐ লোকটি। তিনি বলতে শুরু করলেন ঘুম থেকে উঠেই বউ এর সঙ্গে বিরাট ঝগড়া হলো; বাস এ মানিব্যাগ ছিনতাই হলো; অফিসে গিয়ে দেখি চাকরি চলে গেছে; বাড়িতে এসে দেখি বউ বাপের বাড়ি চলে গেছে… এত কিছুর পর ত্যক্তবিরক্ত হয়ে রেস্টুরেন্টে এসে বিষ খাব বলে লাচ্ছির সঙ্গে বিষ মিশিয়েছি- সেটাও আপনি খেয়ে ফেললেন? আমার তো কপালটাই খারাপ!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)






