পচেফস্ট্রম টেস্টের দ্বিতীয় দিনেও ভিন্ন কিছু করে দেখাতে পারেনি বাংলাদেশ। সাদামাটা একটি দিনের মাঝামাঝিতে প্রতিপক্ষের দুটি উইকেট তুলে নিয়ে প্রথম দিনের ব্যর্থতায় খানিকটা প্রলেপ দেয়া গেছে হয়ত, তবে শেষ বিকেলে নিজেদের তিন উইকেট খুইয়ে আবারও সাদা পোশাকের কঠিন আবর্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে সফরকারীরা।
সাউথ আফ্রিকা ৩ উইকেটে ৪৯৬ রানে ইনিংস ঘোষণার পর ব্যাটিংয়ে নেমে ১২৭ রান তুললেও বাংলাদেশ হারিয়েছে লিটন দাস, ইমরুল কায়েস ও অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমকে।
উইকেট হারানোর মত টাইগারদের ইনিংসের শুরুটাও হয় তামিম ইকবালকে হারিয়ে! না, তামিম আউট হননি, ২২ রানে অপরাজিত থেকে তৃতীয় দিনের লড়াইটা চালিয়ে নিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আছেন। সঙ্গী টেস্ট স্পেশালিস্ট মুমিনুল হক ২৮ রানে। তাতেই যা খানিকটা লড়াইয়ের স্বপ্ন দেখা যাচ্ছে।
তামিমের এই থেকে যাওয়া হয়ত আরও কিছু উইকেট না হারানোর পথ হতে পারত। যদি তামিম ওপেনিংয়ে নামতে পারতেন। পারেননি সাউথ আফ্রিকা আচমকা ইনিংস ঘোষণা করে বসায়। স্বাগতিকরা যেভাবে আগাচ্ছিল, রান পাহাড়ে ওঠারই ইঙ্গিত ছিল। কিন্তু হঠাৎই আসে ডু প্লেসিসের ইনিংস ঘোষণার ডাক। তাতে বিপাকেই পড়ে সফরকারীরা।
তামিম ক্রিকেটীয় আইনের ফাঁদে আটকে যান। ওপেনিংয়ে নামতে পারেননি। প্রোটিয়ারা ইনিংস ঘোষণার আগে মাঠ ছেড়েছিলেন, ইনিংস ঘোষণার সময়ও মাঠে ছিলেন না। সেটাই কাল হয়! মাঠে না থাকার সময়টা ৪৯ মিনিট। বাংলাদেশের ইনিংস ৪৯ মিনিট না গড়ানো পর্যন্ত মাঠে নামতে পারেননি তাই। পরে নেমে শেষ বিকেলের ধাক্কা সামলালেন। সেটাই আফসোস বাড়াচ্ছে। তামিম যদি শুরুতে নামতেন। ধাক্কাটা আর কম হতে পারত বৈকি!
তামিমের অনুপস্থিত সময়েই তালগোল পাকিয়ে বসে বাংলাদেশ। উদ্বোধন করতে নেমে লিটন দাস ও ইমরুল কায়েস দ্রুত ফিরে যান। লিটন শুরুটা ভালই করেছিলেন। কিন্তু ২৫ রানের বেশি এগোতে পারেননি। চারটি চারে ২৮ বলের ইনিংস তার। মরকেলের অফস্টাম্পের অনেক বাইরের বলে খোঁচা দিয়ে আমলার তালুবন্দী উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান।
তার আগে ফিরে গেছেন আরেক ওপেনার ইমরুল কায়েসও (৭)। রাবাদার শর্ট বলে গ্লাভস ছুঁইয়ে গালিতে মার্করামকে ক্যাচ। রানখরার কালটা আরও দীর্ঘই হল ইমরুলের।
পরে খানিকটা জুটি জমানোর আভাস দিয়েছিলেন মুমিনুল ও মুশফিক। ৬ ও ১৫ রানে এলগারের সৌজন্যে স্লিপে জীবন পাওয়ার সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেননি অধিনায়ক। দুবারই বোলারটির নাম কেশভ মহারাজ। পরে উইকেট দিয়েছেন সেই বাঁহাতি স্পিনারকেই। দৃষ্টিনন্দন কিছু শটের পর ব্যাট-প্যাড ক্যাচে ফরোয়ার্ড শর্ট লেগে ধরা। নামের পাশে ৭ চার ও ১ ছয়ে ৫৭ বলে ৪৪! সঙ্গে সমাপ্তি মুমিনুলের সঙ্গে সম্ভাবনা জাগানো ৬৭ রানের জুটিটাও।
তামিম ও মুমিনুলকে শনিবার লম্বা একটা পথই পাড়ি দিতে হবে। ২৪ রানের জুটি গড়ে ঘুমাতে গেছেন তারা।
এর আগে পাঁচশ ছুঁইছুঁই প্রোটিয়া ইনিংসে অনেক পাওয়ার সঙ্গে আক্ষেপেরও কমতি ছিল না। আগেরদিনের দুই অপরাজিত ডিন এলগার ও হাশিম আমলা ২১৫তে থেমেছেন জুটি টেনে। আমলা পেয়েছেন শতক। এলগার এক রানের জন্য হাতছাড়া করেছেন দ্বিশতক।
আমলাকে (১৩৭) ফিরিয়েছেন শফিউল। ইনিংসটি ১৭ চার ও এক ছয়ে সাজানো। ক্যারিয়ারের ২৭তম শতক তার। যা দিয়ে গ্রায়েম স্মিথের সাউথ আফ্রিকান রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। ১১৭ টেস্টে ২৭টি সেঞ্চুরি করেছিলেন সাবেক অধিনায়ক স্মিথ। আমলা সেটি ছুঁয়ে ফেললেন ১০৮ টেস্টেই। ৪৫টি সেঞ্চুরি নিয়ে সাবেক অলরাউন্ডার জ্যাক ক্যালিস আছেন প্রোটিয়াদের মধ্যে সবার উপরে।
প্রথমদিনে অভিষিক্ত এইডেন মার্করামকে ৯৭ রানে ফিরিয়ে প্রোটিয়াদের আফসোসের রাস্তা গড়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। এলগারের আউট তাদের জন্য আরও বেশি আক্ষেপের। এলগার তো ফিল্ডিংয়ে এসেও সেই আক্ষেপে পুড়েছেন, মনই বসাতে পারছিলেন না। সেজন্যই কিনা মুশফিককে অল্প সময়ে দুবার জীবন দেয়ার পর ডু প্লেসিস স্লিপ থেকেই সরিয়ে নিলেন তাকে!
এলগার ফিরেছেন ১৯৯-রানে। ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরিটা হাতছাড়া। মোস্তাফিজের বলে মুমিনুলকে ক্যাচ দিয়ে। ওভারটা বাউন্সারে শুরু করেছিলেন ফিজ। দ্বিতীয় বলটি ছুড়লেন শর্ট। এলগার দোটানায় পড়া এক শট খেললেন। সেটি না হল পুল, না হল টাইমিং। বল বাতাসে উঠে যায়। মিড উইকেটে প্রস্তুতই ছিলেন মুমিনুল। তালুতে জমিয়ে খুশির উপলক্ষ এনে দেন মোস্তাফিজ ও বাংলাদেশকে।
এলগার অবশ্য একা নন, আরও ১১জন আছেন তার মত দুর্ভাগা। তাদের দিকে তাকিয়ে খানিকটা সান্ত্বনা নিলেও নিতে পারেন। তালিকায় আছে অনেক গ্রেটের নামও। পাকিস্তানি মুদাস্সর নজর ১৯৯-এ কাটা পড়া প্রথম দুর্ভাগা। ১৯৮৪ সালে ভারতের বিপক্ষে ফয়সালাবাদ টেস্টের ঘটনা সেটি।
পর্যায়ক্রমে ভারতের মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, অস্ট্রেলিয়ান ম্যাথু এলিয়ট, শ্রীলঙ্কান সনাথ জয়াসুরিয়া, আরেক অজি স্টিভ ওয়াহ, জিম্বাবুইয়ান অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, পাকিস্তানি ইউনিস খান, ইংল্যান্ডের ইয়ান বেল, লঙ্কান কুমার সাঙ্গাকারা, অজি স্টিভেন স্মিথ ও সবশেষ ভারতের লোকেশ রাহুল ১৯৯-এর দুর্ভাগ্যে ডুবেছেন।
অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার ও কুমার সাঙ্গাকারা আবার একটু বেশি দুর্ভাগা, তারা যে অপর প্রান্তের সব ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফেরায় ডাবলের দেখা পাননি, থেকে গেছেন অপরাজিত।
সান্ত্বনা পান বা না পান, এলগার তো আর ১৯৯ রানের ইনিংসটা অস্বীকার করতে পারবেন না। দুঃখভারাক্রান্ত ভাবে শেষ হওয়া ইনিংসটি ১৫ চার ও ৩ ছয়ে ৩৮৮ বলে সাজানো।
প্রোটিয়ারা ইনিংস ঘোষণা করায় ডাবল সেঞ্চুরি পাওয়া হয়নি মেহেদী হাসান মিরাজেরও। ৫৬ ওভার বল করে মাত্র ৪ মেডেনে ১৭৮ রান বিলিয়েছেন তরুণ অফস্পিনার। একটি উইকেট পাওয়া মোস্তাফিজও খরচ করেছেন ৯৮ রান, সেঞ্চুরি হাতছাড়া তারও!
সে তুলনায় শফিউল ২৫ ওভারে ৭৪ রানে এক উইকেট নিয়ে একটু কম খরুচে। তাসকিন ২৬ ওভারে ৮৮ রানে উইকেটশূন্য।








