স্বাধীন বাংলাদেশের এক গৌরবময় দিন ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। যোদ্ধা ও বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ নামের নতুন একটি দেশের যাত্রা শুরু হয় সেই ১৯৭১ সালে। বহু মানুষের প্রাণ, সাহসীকতা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে নয় মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষে চূড়ান্ত বিজয়ের মধ্য দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবছরের বিজয় দিবস এক নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছে জাতির জন্য।
দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের নানা অবস্থার পরে বহু তাজা প্রাণের বিনিময়ে এবছর ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। বদলে যাওয়া এই পরিস্থিতিকে ‘বাংলাদেশ ২.০’ নামেও অভিহিত করা হচ্ছে। পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে দেশে গঠিত হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে আছেন দেশের একমাত্র নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস। নানা প্রতিকূল অবস্থা আর অতীতের নানা অব্যবস্থার দগদগে ঘা সামলে তিনি এগিয়ে নিচ্ছেন দেশকে।
বিজয় দিবসের এই দিনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের নানা বিষয়ে উঠে এসেছে তার বয়ানে। ‘সংস্কার’ আর ‘নির্বাচন’ নিয়ে দেশজুড়ে নানা আলোচনা যখন চলমান, তখন তার এই ভাষণ জাতির বহু প্রশ্নের জবাব দিয়েছে বলে মনে হয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে আসন্ন নির্বাচন, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, শ্বেতপত্র কমিটি,সংস্কার প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন। ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের মধ্যে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা যায় বলেছেন তিনি।

তবে তার ভাষণের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বা নতুন বিষয় হচ্ছে ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন’। ভাষণের খুব অল্প শব্দে এই কমিশনের কথা উঠে এলেও এটি তার ভাষণের একটি শক্তিশালী দিক। এই কমিশন হয়তো দেশের বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ‘পাওয়ার স্ট্রাকচার’ এ নিয়ে আসতে যাচ্ছে বড় পরিবর্তন।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন’ বিষয়ে বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথম পর্যায়ে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এরা শীঘ্রই চূড়ান্ত প্রতিবেদন পেশ করবে বলে আমি আশা করি। আমরা এই ছয় কমিশনের চেয়ারম্যানদের নিয়ে একটি ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করার দিকে অগ্রসর হচ্ছি। এর কাজ হবে রাজনৈতিক দলসহ সকল পক্ষের সঙ্গে মতামত বিনিময় করে যে সমস্ত বিষয়ে ঐকমত্য স্থাপন হবে সেগুলি চিহ্নিত করা এবং বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা।’
তারমানে ‘জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন’ হতে যাচ্ছে সংস্কারের জন্য গঠিত সব কমিশনের প্রধান টাইপ একটি কমিশন। বর্তমানে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন, দুর্নীতি দমন সংস্কার কমিশন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশন কাজ করে যাচ্ছে, এছাড়াও স্বাস্থ্যবিষয়ক সংস্কার কমিশন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন, শ্রমিক অধিকারবিষয়ক সংস্কার কমিশন এবং নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন কাজ করে গেলেও তারাও কি ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে কাজ করবে কিনা তা পরিষ্কার নয়। এই ঐকমত্য কমিশনই যেহেতু রাজনৈতিক দলসহ সকল পক্ষের সঙ্গে মতামত বিনিময় করবে, কাজেই তারা অনেকাংশে সাধারণ উপদেষ্টাদের চেয়ে শক্তিশালী বা ক্ষমতাবান হবেন নি:সন্দেহে!
ঐকমত্য কমিশনের কাঠামো বিষয়ে ড. ইউনূস বলেছেন, ‘জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব, তা বিবেচনা করে আমি এই কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করব। আমার সাথে এই কমিশনের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন অধ্যাপক আলী রিয়াজ। কমিশন প্রয়োজন মনে করলে নতুন সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে। প্রথম এই ছয়টি কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাবার পর আগামী মাসেই জাতীয় ঐকমত্য গঠন কমিশন কাজ শুরু করতে পারবে বলে আমি আশা করছি।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস নিজেই এই কমিশনের প্রধান হবেন। আর অধ্যাপক আলী রিয়াজ হতে যাচ্ছেন এই কমিশনের সহ-সভাপতি, তিনি আবার সংবিধান সংস্কার বিষয়ক কমিশনের প্রধানও। সরকারের ক্ষমতার কাঠামোতে অধ্যাপক আলী রিয়াজের অবস্থান আরো শক্তিশালী হচ্ছে বলেও মনে হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের পাশাপাশি এই ঐকমত্য কমিশন আরেকটি লেয়ারের পাওয়ার হাউস হয়ে উঠতে পারে।
নতুন এই ঐকমত্য কমিশনের কাজ কী হবে, এই বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বলেছেন, ‘এই নতুন কমিশনের প্রথম কাজ হবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য যে সমস্ত সিদ্ধান্ত জরুরি, সে সমস্ত বিষয়ে তাড়াতাড়ি ঐকমত্য সৃষ্টি করা এবং সকলের সঙ্গে আলোচনা করে কোন সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা যায়, সেই ব্যাপারে পরামর্শ চূড়ান্ত করা।’
নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রমাগত চাপ এবং রাজনৈতিক সরকার না থাকায় পুলিশ-প্রশাসনের দোদুল্যমান অবস্থার প্রেক্ষিতে দ্রুত ও উপযুক্ত সময়ে জাতীয় নির্বাচন দেবার বিষয়টিও এই কমিশনের প্রধান কাজ হিসেবে সামনে এসেছে। গঠিত ৬টি সংস্কার কমিশন ও নির্বাচন কমিনের সমন্বয়ে হয়তো এই ঐকমত্য কমিশন কাজ করবে, সাথে থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মন্ত্রণালয়। ‘সকলের সঙ্গে আলোচনা’ এবং নির্বাচনের উপযুক্ত সময় নির্ধারণের দায়িত্বও পড়তে যাচ্ছে এই নতুন কমিশনের উপরে। এটি একটি বড় দায়িত্ব!
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পরে থেকেই নানা ভোগান্তি ও বিপর্যয়কালীন অবস্থা থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। এই উপদেষ্টা ভালতো ওই উপদেষ্টা খারাপ, তাকে চাই ওকে চাই না টাইপ নানা পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রধান উপদেষ্টাকে। ঐকমত্য কমিশন গঠন করে নতুন সদস্যদের নিয়ে তার কাজে নতুন গতি আসতে পারে বলে মনে হচ্ছে। তবে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও আমলাদের সঙ্গে ‘চেইন অব কমান্ড’ সংক্রান্ত কোনো নেতিবাচক পরিস্থিতিও আসতে পারে বলে কিছুটা শঙ্কা হচ্ছে। সার্বিকভাবে আশাবাদ, এই কমিশন খুব নির্দিষ্ট কিছু কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ শুনে মনে হয়েছে, কাজেই হয়তো সফল হবে এই কমিশন।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে বারবার জাতীয় ঐক্যের কথা বলেছেন। সব মত ও সিদ্ধান্ত সবার পছন্দ কখনই হয় না, তারপরেও বৃহৎ স্বার্থে সবাইকে একটি জাতীয় স্বার্থের ঐকমত্যে আসা খুবই জরুরি। না হলে সেই ১৯৭১ সালের ত্যাগ আর ২০২৪ সালের ত্যাগ বৃথা যাবে, আর ষড়যন্ত্রকারী আর সুবিধাভোগীরা দেশের অর্থনীতি-রাজনীতি আর সার্বভৌমত্বে আঘাত হানবে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








