নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা ফ্লাইট বিএস-২১১ বিধ্বস্তের পর থেকে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কেন বিধ্বস্ত হলো উড়োজাহাজটি। সামাজিক মাধ্যম এবং গণমাধ্যমে এই দুর্ঘটনার জন্য এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের যোগাযোগ ত্রুটি, উড়োজাহাজ ত্রুটি, পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের মানসিক অবস্থা এসব নানা কারণকে অনুমানের ভিত্তিতে দায়ী করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনাস্থল, ধ্বংসাবশেষ, ডেটা রেকর্ডার, উড়োজাহাজ ও পাইলটের অবস্থার মতো সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো স্তরে-স্তরে বিশ্লেষণের আগে দুর্ঘটনার কারণ বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসার সময় নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশের এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন টিমের একজন সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। তবে ফ্লাইট-২১১ এর পাইলট আবিদ সুলতান ত্রিভুবনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিমানবন্দরে অবতরণের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পাইলট ছিলেন বলেই মনে করেন জ্যেষ্ঠ এই বৈমানিক।
তাই আপাতত তিনি গুরুত্ব দিতে চান আবিদ সুলতানের শারীরিক-মানসিক অবস্থা, ইউটিউবে প্রচারিত বিএস-২১১ এবং বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথনকে। পাহাড়ী ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের ১২ মার্চ দুপুরের আবহাওয়া, উড়োজাহাজটির সক্ষমতাও খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই ক্যাপ্টেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: দুই দিকে পাহাড় বেষ্টিত ঝুঁকিপূর্ণ ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে দক্ষ ও অভিজ্ঞ পাইলটদেরই উড়োজাহাজ অবতরণের জন্য যোগ্য বলে আমরা বিবেচনা করি। সে হিসেবে আবিদ সুলতান অভিজ্ঞ পাইলট ছিলেন। তবে তার শারীরিক-মানসিক অবস্থা কেমন ছিলো এটা জানা জরুরি। সিভিল এভিয়েশন রুল অনুযায়ী তিনি সাম্প্রতিক সময়ে কত ঘণ্টা উড়োজাহাজ চালিয়েছেন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেয়েছিলেন কিনা এসব বিষয় দেখতে হবে। কারণ বিএস-২১১ এবং ত্রিভুবন কন্ট্রোল টাওয়ারের মধ্যে কথোপকথনে যখন টাওয়ার থেকে বলা হয়েছিলো “রানওয়ে টু-জিরো ক্লিয়ার্ড, উইথ ২৭০ ডিগ্রি, সিক্স নর্থ”। জবাবে ২১১ এর পাইলট বলেছিলেন,“২৬০ কপিড”।

তবে দুর্ঘটনার জন্য পাইলটের শারীরিক-মানসিক অবস্থাকে এখনই কারণ হিসেবে ধরে নেয়ার অবকাশ নেই জানিয়ে তিনি বলেন তদন্তনাধীন বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক হবে না। একই সঙ্গে ত্রিভুবনের ভৌগলিক অবস্থান, আবহাওয়া এবং এই আবহাওয়ায় কন্ট্রোল টাওয়ারের যোগাযোগ ত্রুটির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।
ত্রিভুবন বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ অবতরণের ঝুঁকি তুলে ধরে তিনি বলেন: ত্রিভুবন এয়ারপোর্টের রানওয়ের দু’টি মাথা, একদিকে হচ্ছে জিরো-টু উল্টো দিকে টু-জিরো। নেপালের এয়ারপোর্টে অবতরণ করতে গিয়ে দেখেছি এর দু’দিকেই পাহাড়। ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ২ হাজার ফুট ওপর থেকে সহজে ল্যান্ড করা যায়। কিন্তু নেপালের এই বিমানবন্দরটা ভৌগলিক ভাবেই এমন যে সেখানে ঢাকার তুলনায় প্রায় ৪ গুণ ওপর থেকে খাড়া অবতরণ করতে হয়। এরকম অবস্থান এবং এর সঙ্গে যদি মেঘ-কুয়াশার আবরণ থাকে তাহলে পাইলটকে এয়ারপোর্টের কন্ট্রোল টাওয়ারের ওপর ভরসা করতে হয়।
তবে ত্রিভুবনের কন্ট্রোল টাওয়ারের সঙ্গে যোগাযোগেও ছিলো বিপত্তি। আপাতত ইউটিউবে প্রকাশিত ভয়েস ক্লিপের সূত্রে তিনি বলেন: টাওয়ার থেকে পাইলটকে জিরো-টু ডিরেকশনে ক্লিয়ার করা হয়। এরপর আবার টাওয়ার থেকে বলা হয় এদিক দিয়ে অবতরণ না করতে! বলা হয় রানওয়ে টু-জিরো দিয়ে ল্যান্ড করতে। এটা থেকে বুঝতে পারছি যে উড়োজাহাজটি ল্যান্ড করতে না পেরে ঘুরিয়ে উল্টো দিক দিয়ে আবার অবতরণের জন্য আসতে বাধ্য হয়। তারপরে যে কী হয়েছে সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে না।
ভরসা ব্ল্যাকবক্স
কী হয়েছিলো সেটা জানতে ককপিটের কথোকথন শোনা দরকার বলে মনে করেন এই বৈমানিক। তিনি বলেন: বিএস-২১১ এর ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা হয়েছে শুনেছি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিএস-২১১ এর ককপিটে পাইলট এবং কো-পাইলটদের কথোপকথন সম্পর্কে জানতে হলে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর) শুনতে হবে। তখন উড়োজাহাজটির অবস্থা কেমন ছিলো সেটার তথ্য পাওয়া যাবে ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারে (এফডিআর)।
এই কর্মকর্তার মতে, শুধু এসব বিষয় নয় উড়োজাহাজটির রক্ষণাবেক্ষণ, ক্রু সহ প্রত্যেকটি বিষয় একটি-একটি করে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্তে আসা উচিৎ। তিনি বলেন,“কোন ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের দোষারোপের জন্য নয় বরং ভবিষ্যতে এরকম মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যেনো আর না ঘটে সেজন্যই পরিপূর্ণ তদন্ত দরকার।”








