শাওন মাহমুদ আমার ফেসবুক বন্ধু। ফেসবুকের বাসিন্দা হবার অনেক আগে থেকেই ওর সাথে পরিচয়। সেই পরিচয়ে আমাদের নিবিড় কথোপকথন হয়েছে- মনে পড়ে না আমার। তবে পরিচয়টাই এমন সূত্রে হয়েছিল যে আমরা জানি পরস্পরকে বেশ কিছুটা। ফেসবুকের উঠোনে এখন প্রতিদিন আমাদের দেখা হয়। ওর পোস্টগুলো ভাল লাগে আমার। নিজের চাষবাস আর ধাবমান জীবনের যেসব ইমেজ সে ফেসবুকের উঠোনে পোস্ট করে- সেই সূত্রেই ওকে আমার আরও বেশি বন্ধু মনে হয় এখন। ভাল লাগে স্ট্যাটাস আকারে লেখা ওর গদ্য পড়তেও। প্রতিদিনকার দিনযাপনে আমাদের এই বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনাগুলো নিয়ে সে ভাবে এবং সেইসব ভাবনার আনন্দ আর বেদনা ‘হুম’ যোগে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে। এই শেয়ারের মধ্য দিয়েই প্রতিদিন শাওন আমার আরও বেশি বন্ধু হয়ে উঠে।
দু’দিন আগে শাওন ওর কভারে জায়গা দিয়েছিল রক্তাক্ত মৃত এক মুখকে! পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার-এর স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুর ছবি ছিল সেটি। মিতু বর্বরতম নৃশংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রকাশ্যে রাজপথে নিজের শিশু সন্তানের সামনে। ছবিটি সেদিন থেকে ঘুরছিল এর থেকে তার ওয়ালে। শাওন ওই ছবিটি কভার ইমেজ করে সেদিন। আমি ওকে ছবিটি সরিয়ে নেবার অনুরোধ করি। শাওনও ‘আচ্ছা’ বলে সঙ্গে সঙ্গে ছবিটি সরিয়ে নেয়। আমি কোনো ব্যাখ্যা দেইনি, শাওনও আমার সেই অনুরোধের কোনো ব্যাখ্যা চায়নি। বুঝতে পারি, ভারচুয়ালি হলেও আমরা সত্যি সত্যি পরস্পর বন্ধু হয়ে উঠছি- হয়ত আরও বেশি বন্ধু হয়ে উঠবো আমরা।
কেন শাওনকে এমন অনুরোধ করেছিলাম? এই হত্যাকাণ্ড কি আমাকে আহত করে নাই? নিয়মিতভাবে ঘটে চলা এইসব হত্যাকাণ্ড কি আমাকে আর ক্ষুব্ধ করে না? এই ধরনের প্রতিটি নির্মম ঘটনা ঘটার পর দেশচালক মহোদয়গণ একই রকম প্রতিক্রিয়া জানালে আমি কি আরও বেশি হতাশ বোধ করি না? সবই হয় আমার- ভীষণভাবেই হয়। তবুও সুধীন্দ্রনাথ দত্ত’র সেই উটপাখির মতন বালিতে মুখ গুজে এইসব ক্রুর ইমেজ থেকে, খবর থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চাই।
শাওনের সাথে ভারচুয়ালি ওই কনভারসেশনের পর থেকে ডায়ানা আরবাসকে (Diane Arbus) মনে পড়ছিল। আরবাস-এর সাথে আমার পরিচয় ২০১২ সালে, ঢাকা আর্ট সেন্টারে। সশরীর নয়- বইয়ের মাধ্যমে দেখা তার সাথে। কোনো একটি বইয়ে তার তোলা কিছু ফটোগ্রাফ দেখি। ওই ছবিগুলোই আরবাস-এর ব্যাপারে আমাকে আগ্রহী করে তোলে।
আরবাস মূলত পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি করতেন। পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি সাধারণত তাদের চেহারাই দেখি যাদের দেখে বেশ আনন্দ হয়, সুখের ফিলিং হয়। কিন্তু আরবাস-এর ছবির বেশিরভাগ মানুষই প্রচলিত অর্থে সুন্দর নন। হাস্যকর সাজপোশাক পরে নিরানন্দ বা ফাঁকা পরিবেশে দাঁড়িয়ে বা বসে সরাসরি দর্শকের চোখে চোখ রেখে যেন গলা খুলে কথা বলেন। আরবাস ছিলেন সুপার টুরিস্ট। ক্যামেরা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। দিনের পর দিন কাটাতেন যাদের ছবি তুলবেন তাদের সাথে। এক রকমের সম্পর্ক ও আস্থার মধ্যদিয়ে পোট্রেট তুলবার যজ্ঞ করতেন তিনি। তার চিত্রিত মানুষেরা বেশিরভাগ সমাজের নিচুতলার মানুষ, জন্মগতভাবে অস্বাভাবিক গড়নের, যৌন অপরাধ জগতের বাসিন্দা। ছবিতে দেখি, এই মানুষেরা বেদনার্ত নন- নির্বিকার এবং প্রবলভাবে স্বাধীনচেতা। নিজেদের নিয়ে মোটেই বিব্রত নন- ভীষণ সাহসী লাগে তাদের।
আজ ভোরে অপরিকল্পিতভাবেই সুসান/ সুজান সনতাগ-এর কাছে যাওয়া। ‘অন ফটোগ্রাফি’ নামে তার এক বিখ্যাত বই আছে। বাংলা ছাড়া অন্য ভাষায় আমার দখল তেমন নেই। এমনকি ছোটবেলা থেকে ইংরেজি পাঠ্য থাকলেও খুব বেশি বই আমি আয়েশ করে ইংরেজি ভাষায় পড়ার মুরোদ রাখি না। তো সুজান সনতাগ-এর বইটির একটা বাংলা অনুবাদ আছে আমার কাছে। করেছেন মাহমুদুল হোসেন। তিনিও আমার বন্ধু তালিকায় আছেন। আজ উনার অনুবাদে ‘অন ফটোগ্রাফি’র পাতা উল্টে দেখতে গিয়ে পেয়ে গেলাম ডায়ানা আরবাসকে। আরবাস-এর ফটোগ্রাফ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সুজান বলছেন, ‘… ইমেজের (চলমান এবং স্থির) মধ্যে এবং মুদ্রিত মাধ্যমে ক্রমাগত বাড়তে থাকা কিম্ভুতকিমাকার বিষয়কে হজম করার জন্যে আমাদেরকে একটা চড়া মূল্য দিতে হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এটা সত্তার মুক্তিদানের কাজটি করে না, বরং সত্তা থেকে বিয়োগ করার কাজটিই করে। ভয়ংকরের সাথে একটা কৃত্রিম পরিচিতি বিচ্ছিন্নতাকে জোরদার করে, এভাবে বাস্তব জীবনে প্রতিক্রিয়া করার ক্ষমতা হ্রাস পায়।”
পড়েই শাওনকে মৃত মিতুর ছবিটি সরিয়ে নেয়ার অনুরোধের কথা মনে পড়ল। ভেতরে লুকিয়ে থাকা কারণটা ঝট করে সামনে চলে এলো। সুজান সনতাগকেও (Susan Sontag) এই জন্যে কৃতজ্ঞতা।
চারপাশে দুঃস্বপ্নের মতো ঘটে চলা বেদনাদায়ক সব ঘটনায় আমি আরও বেশি নির্লিপ্ত হতে চাই না। এইসব ভয়ংকর অসহায় ইমেজে আমি অভ্যস্ত হতে চাই না, শাওন!
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








