এশাকে নিয়ে চারদিকে শোকের আর ঘৃণার মাতম দেখে এই লেখা লিখতে বসার মূল কারণ। এবিষয়ে একটিই অনুরোধ সমাজ ও বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে, শাস্তি নয় অপরাধের মূল উৎপাটনে মনোনিবেশ করুন। শাস্তির প্রয়োজন আছে কিন্তু শাস্তি একটি সাময়িক সমাধান। অপরাধ প্রবণতা এবং অপরাধীকে কঠোর শাস্তি দেয়ার প্রবণতা দুইটাই সাংস্কৃতিক চর্চার বিষয়। এর কারণ লুকিয়ে থাকে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের মাইন্ডসেটের ভিতর। অপরাধের শাস্তি বিধানে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়, কিন্তু অপরাধ নির্মূল হয় না।
পায়ের রগ কাটা নিয়ে গুজব ছড়িয়েছিলো- ঠিক। ন্যায্যতার দাবিদার আন্দোলনকারীরা সেটাকে পুঁজি করে অন্যায্য ফায়দা উঠিয়েছে- তাও ঠিক। পরবর্তীতে মেয়েটিকে সম্মিলিতভাবে গণ অসম্মানের ব্যবস্থা করেছে, যা খুবই অনভিপ্রেত এবং অন্যায়। এনিয়ে কোন দ্বিমত নাই। আবার এশা আন্দোলনকারী মেয়েদের উপর অন্যায়ভাবে চড়াও হয়েছিলো, তাদের মারধর ও গালাগাল করে এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেছিলো। তার অন্যায় আচরণের কারণে ছাত্রীদের মনে তীব্র ক্ষোভ জমেছিলো, এটাও ঠিক। একপক্ষ এশার প্রতি অন্যায়ের বিচার চেয়ে সোচ্চার এবং আরেক পক্ষ এশার সাথে যা হয়েছে সেটা উচিত হয়েছে বলে সোচ্চার। দুই পক্ষই সমস্যাটিকে খণ্ডিতভাবে দেখছেন। কারোই সমস্যার মূলে যাওয়ার কোন আগ্রহ নেই। দুইপক্ষেরই সৎভাবে অন্যায়কে অন্যায় বলার সততার অভাব।
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতি বহুদিন ধরেই কলুষিত। একদিকে যেমন আদর্শের চর্চা নয় বরং চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ ক্ষমতা প্রদর্শনের এক সহিংস চর্চার সংস্কৃতি আত্মস্থ করেছে ক্ষমতার কাছে থাকা ছাত্ররাজনীতি। অন্যদিকে সরকারি যেকোন পদক্ষেপের অন্ধ বিরোধীতা করা আত্মস্থ করেছে ক্ষমতার বাইরে থাকা ছাত্র রাজনীতি। কোন পক্ষই নির্মোহভাবে সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে নারাজ। আর এই ভুল চর্চাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, শিক্ষক ও পৃষ্ঠপোষকেরা। ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই বহুকাল। নেই নেতৃত্বের যোগ্যতার প্রশ্ন, নেই সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার তাগিদ।
একটি সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠে জোর করে, ভয় ভীতি দেখিয়ে ছাত্রছাত্রীদের মিছিলে নেয়া বা বিরুদ্ধমত দমন করা শুধু হাস্যকর নয়, সেই সংগঠনটির জন্য লজ্জাজনকও। এটা সেই সংগঠনটির নেতৃত্বের ব্যার্থতা ও অগ্রহনযোগ্যতাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। ভয় ভীতির কারণে যারা নেতৃত্বকে সমর্থন দেয় তারা কি সেই দলের আদর্শকে ধারণ করে? কক্ষনো নয়। তা হলে এই জোর জুলুমের সংস্কৃতির দীর্ঘ মেয়াদী অর্জন কি? ছাত্র নেতৃত্বরা কি কখনো ভাবেন এটা নিয়ে?
আরো আছে লোভ। ক্ষমতার আর শর্টকাট পন্থায় অর্থ উপার্জনের, রাতারাতি ধনী বনে যাওয়ার। এটা শুধু ছাত্রলীগের সমস্যা নয়, সমস্যা ছাত্রদের কাছে শিক্ষা ও আদর্শকে গৌণ করে দিয়ে অর্থ উপার্জন ও ক্ষমতাকে মুখ্য করে তোলার রাজনীতির। আমরা নিজেরাও সৎ নই, পরবর্তী প্রজন্মেকেও সৎ হতে শেখাইনা। আজ যারা ছাত্রলীগের ছাতার নীচে জয় বাংলার ব্যবসা করছে, আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, কাল কোন কারণে জামায়াত ক্ষমতায় এলে নারায়ে তাকবিরের ব্যবসা করতে তাদের একটুও আটকাবে না। আর এই নষ্ট চক্রে পড়ে দূরে সরে যাচ্ছে, মূল জায়গা থেকে ছিটকে পড়ছে আদর্শ ও নীতিবান ছাত্রছাত্রীরা। যারা তারপরও এখনো টিকে আছে এইসব অপকর্মের দায় নিতে হচ্ছে তাদেরও। ক্ষমতার দম্ভ আর লোভ যখন আদর্শকে ছাপিয়ে যায়, আদর্শকে তখন লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা ছাড়া উপায় থাকে না। ছাত্রলীগ সেদিকেই হাঁটছে।
ছাত্রলীগ যদি এশার প্রতি অন্যায়ের প্রতিকার চায় তবে তাদের এই অন্যায়ের শুরুরও প্রতিকার চাইতে হবে। আর এশার অন্যায়ের বিরোধী যারা তাদের এশার অপরাধের পাশাপাশি এশার প্রতি অন্যায়েরও প্রতিবাদ করতে পারতে হবে। অন্যায় অন্যায়ই, অন্যায়কারী যদি আমার পরিবারের সদস্যও হয় তাতেও অপরাধ কমে যায় না। যে কোন আন্দোলন বা মতের সাথে দ্বিমত করার অধিকার যে কারো আছে। কিন্তু সে বিরোধীতা হতে হবে বুদ্ধিবৃত্তিক, সহিংস নয়। শুধু একটি সুনির্দিষ্ট ঘটনাকে বিচার না করে আমরা যদি ছাত্র রাজনীতির পুরো অবক্ষয়কে পর্যালোচনা না করি, প্রতিকারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেই তবে হলে হলে নির্যাতন এবং পাল্টা নির্যাতন চলতে থাকবে। এশা একদিনে নির্যাতনকারী হয়ে ওঠেনি, আমরাই এশাকে এমন বানিয়েছি। আবার এশাকে শাস্তি দেয়া মেয়েরাও একদিনে এই জায়গায় আসেনি, আমাদের সেখানেও দায় আছে। কয়টার বিচার করবেন আপনারা?
শোনা যাচ্ছে, এশাকে হলে ফিরিয়ে নেয়া হবে। ভালো খবর। মেয়েটা তার শিক্ষাজীবন শেষ করার সুযোগ পাক। কিন্তু এই ফিরিয়ে নেয়ার কারণে অন্য ছাত্রীদের শিক্ষাজীবন যেনো হুমকির মুখে না পড়ে সেটাও নিশ্চিত করা ছাত্রলীগ, হল প্রশাসন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব। সেই দায়িত্বটাও সবাই সঠিকভাবে পালন করবেন আশা করি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








