মতামত

গাড়িচাপার ঘটনায় এমপি পুত্র সাবাবের দাবি কতোটা যৌক্তিক?

গাড়িচাপার ঘটনায় এমপি পুত্র সাবাবের দাবি কতোটা যৌক্তিক?

বাবা একরাম চৌধুরী এমপির পাশে সাবাব চৌধুরী

এমপি পুত্র সাবাব চৌধুরী, রাজনীতিতে নাম লেখানোর আগেই সে ‘রিজভী চরিত্রের’ হয়ে গেল! যদি তার কথা ঠিক হয় যে, সাবাব নিউজিল্যান্ডে লেখা পড়া করে দেশে এসেছে বাবার রাজনীতির হাল ধরতে, তাহলে বিষয়টা এমন দাঁড়ায় যে নিউজিল্যান্ডের যে কলেজ বা ভার্সিটিতে সে পড়তো, ওই স্কুলে নিশ্চিত তার শিক্ষক ছিল কোন বাঙালি, যিনি রিজভীর আত্মীয়। না হলে এমন হতো না।

সম্ভবত ফেসবুকে দেখলাম ময়মনসিংহের সামান্য অবৈধ ব্যাটারি চালিত বাহনের ড্রাইভার তার বাহন হারিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এসএমএস দিয়েছিল সাহায্য চেয়ে। ফলাফল খুব দ্রুতই পেয়েছে। ওই এলাকার পুলিশ কর্মকর্তা অবৈধ গাড়ি খুঁজে পেতে আদাজল খেয়ে মাঠে নেমেছিল, ফাইনালি সে তা খুঁজে পেয়েই ভিডিও করে ফেসবুকে আপলোড দিয়েছে। উক্ত ভিডিও বার্তা দেখে খুব যে খুশিতে বগল বাজিয়েছি তা নয়। কারণ, শেখ হাসিনা বললেই পুলিশকে নড়েচড়ে বসতে হয়, আর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি আবেদন করলে চেয়ারে বসে ঘুমাতে হয়, বিষয়টা এখন এমনই বুঝায়।

নোয়াখালীর এমপি একরামুল চৌধুরী ধনী, ভালো, দানবীর বা কেমন লোক তা জানার জন্য অবশ্যই একরাম চৌধুরীর সামনে গিয়ে কথা বলতে হবে কিংবা এলাকায় গিয়ে খোঁজ নিতে হবে ব্যাপারটা মোটেই এমন নয়। ঢাকায় বসে কিংবা নিউইয়র্কে বসেও একরামুল হক চৌধুরীর আসনের দুই চারটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই বুঝা যাবে, উনি কেমন লোক।

প্রশ্ন-১
জনাব একরামুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকা নোয়াখালী চার আসনে তিনি এমপি। তারপরেও উনার স্ত্রীকেই কেন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিতে হলো? কিংবা উনার স্ত্রীকেই কেন উপজেলা চেয়ারম্যান হতে হলো? ওই এলাকার হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার কমিটিগুলোর সভাপতির নাম নাহয় নাই বললাম।

প্রশ্ন-২
আমরা যতোটা জানি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত বছর কোন এক সভায় বলেছিলেন, এমপিদের থাকার জন্য ন্যাম ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে যদি কোন এমপি না থাকে তাহলে যেন ফ্ল্যাট খালি করে দেয়। অন্য এমপির কথা জানি না, তবে একরামুল হক চৌধুরী উনার নামে বরাদ্দ করা ন্যাম ফ্ল্যাটে চাকর-বাকর-ড্রাইভারদের কেন থাকতে দেন? উনি যেই দলের এমপি সেই দলের প্রধান নেতার কথা তিনি কতটা মান্য করেছেন?

যাহোক, তর্কের খাতিরে ধরে নিলাম সাবাব চৌধুরী সেদিন গাড়ি চালায়নি, সেদিন সে নোয়াখালীতে হালুয়া রুটি খাচ্ছিল। তবে প্রশ্ন হচ্ছে সেই প্রমাণ বা উত্তর কেন দিতে হলো ঘটনার ৫দিন পরে? এক্ষেত্রে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন আসে, উক্ত ৫ দিনে ঢাকা থেকে মানুষ চান্দের দেশে যেতে পারে, আর নোয়াখালী কতবার আসা-যাওয়া সম্ভব?

একরাম চৌধুরী বা সাবাব চৌধুরীর চোখে যদি এই লেখা আটকায়, তাহলে বলছি ৫ দিনে সাইকেল চালিয়েও নোয়াখালী চলে যাওয়া যায়। অতএব, সাবাব সেদিন নোয়াখালী ছিল, এই ঘটনা ভিডিও-অডিও ছবি দিয়ে বিশ্বাস করানো কোনভাবেই সম্ভব নয় এই বাস্তবতায়।

মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মহাখালী ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে দুর্ঘটনাটি ঘটে
মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মহাখালী ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে দুর্ঘটনাটি ঘটে

ছেলেটা বলেই ফেললো, কী সেটা? সাবাব কে জড়িয়ে যারা বক্তব্য দিচ্ছে, নির্বাচন সামনে রেখে তাদের পরিবারকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্যই নাকি হীন চেষ্টা চালিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। আসলে চামড়ার মুখ দিয়ে বলে পলিটিক্যাল ষড়যন্ত্রের থিউরি এটা এখন এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সেকেলে ডায়ালগবাজী ছাড়া আর কিছুই না।

একটা বাস্তবতা বুঝতেই হবে, সেটা হলো আগামী নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ করা না করায় যেমন বাংলাদেশের রাজনীতি কোন জায়গায় আটকে থাকবে না, তদ্রুপ একরামুল হক চৌধুরী আওয়ামী লীগের এমপি না হতে পারলেও আওয়ামী লীগের তেমন কোন লস হবে না।

এমপি-মন্ত্রীর ছেলে-মেয়ে এবং আত্মীয় স্বজনদের দাপট নিয়ে, এরা কী করতে পারে আর না পারে এই আন্দাজ করতে চাইলে সাবাব চৌধুরীকে জানতে হবে তার দাবী মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

আইন সকলের জন্য সমান, একজন চালক যদি রাস্তায় বের হয়ে গাড়ি চালিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে আইনের চোখে অপরাধী হয়, তাহলে এমপির গাড়ির চালক হবে না কেন? আবারও তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে, গাড়িটা এমপি পুত্র চালায়নি, সেদিন চালক চালিয়েছিল, তাহলে একরামুল হক চৌধুরী একজন আইনপ্রনেতা হয়ে এখনও সেই চালককে আইনের কাছে তুলে দিচ্ছেন না কেন ?

চালক পালিয়েছে? জানতে চাই কোথায় পালিয়েছে? একজন এমপির গাড়ি চালক তো আর দূরের কেউ থাকে না, তার পরিবার এমপি সাহেবের রেঞ্জের মধ্যেই আছে। তাহলে এমপি সাহেব চালককে ধরিয়ে দেয়ার দায়িত্ব কেন নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন না? সত্যি বলতে কি, এমপি পরিবারের যা বক্তব্য পড়লাম, তার পুরোটাই ফাঁকফোকরে ভর্তি। মনে হয়েছে ক্লাস টু’য়ের বাংলা টিচারের ক্লাস নেওয়া বক্তব্যের মত।

শেষ কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ জনগণের দল, এটা কোন পারিবারিক সম্পত্তি নয়। দুর্ঘটনায় একজন লোক মারা গেছেন, এমপি সাহেবের স্ত্রীর মালিকানায় থাকা গাড়ির নিচে পড়ে। ওই গাড়ি ধাওয়া করতে যারা গিয়েছিল প্রয়োজনে তাদের পরিচয় খুঁজে বের করুক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

মূলত: তাদেরকে ওই দিন ন্যাম ভবন এলাকায় মারলো কারা? তাদের পরিচয় কী? যারা গেল সেই লোকগুলোর পরিচয় কী? এমপি সাহেবের সাথে তাদের ষড়যন্ত্রের সম্পর্ক কতটা? উক্ত ঘটনার সত্যিকারের অপরাধী গাড়ি চালককে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখী করা হোক। তারপরেও চাই, বিচারটা হোক। কারণ এই একটা বিচারে অনেক প্রভাবশালীর চালক আর পুত্রের লাগাম টানা সম্ভব হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিষয়:একরামুল করিম চৌধুরী সাবাব চৌধুরী

আরও পড়ুন

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…