শুরুটা হয়েছিল বিচ্ছেদ হওয়া স্বামী-স্ত্রীর দুই শিশু সন্তান কার কাছে থাকবে– বাবার কাছে, নাকি মায়ের কাছে– আদালতে এর সুরাহা চেয়ে। শিশু দুটির মা চান সন্তানরা তার কাছে থাকুক। কিন্তু তাদের বাবার চাওয়া নিজের কাছেই থাকবে তারা। তবে শিশুরা চায় বাবা-মা দুজনকে নিয়েই থাকতে।
দুই শিশু ধ্রুব ও লুব্ধ’র এমন আকুল আবেদন এরইমধ্যে ছুঁয়ে গেছে বিচারক, আইনজীবীসহ মানুষের হৃদয়। সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারক বলছেন, শিশু দুটি আদালতে তাদের যে অনুভূতি প্রকাশ করেছে সেটা এই সমাজের প্রতি একটা বার্তা।
এই বলেই থেমে থাকেননি হাইকোর্টের বিচারক। আরেক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘আপনারা উচ্চ শিক্ষিত মানুষ। সবাই কিন্তু আপনাদের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে। আপনাদের এই বিষয়টি বুঝতে হবে। আপনাদের একটি সিদ্ধান্ত সমাজের প্রতি উদাহরণ হয়ে থাকবে।’
গত ২৫ জুন চ্যানেল আই অনলাইন দুই শিশুর কান্নায় ভিজল বিচারক,আইনজীবীর চোখ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল; তা পড়ে অসংখ্য পাঠকের অশ্রুসজল প্রতিক্রিয়া এসেছিল ফেসবুক পেজে। বিশেষ করে ১২ বছরের ধ্রুব’র আদালতে বলা সেই কথাগুলো– ‘বাবা তুমি এসো, তুমি আম্মুকে স্যরি বলো। আমরা তোমাকে ও আম্মুকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাই’– অশ্রুসিক্ত করেছিল সবাইকে।
মামলার শুনানিতে যেসব তথ্য উঠে এসেছে তা হলো; দুই শিশুর ব্যাংকার বাবা আর শিক্ষক মা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া না হওয়ায় এক পর্যায়ে বিচ্ছেদের পথে যান তারা। তবে দুই শিশুকে তাদের বাবা নিজের কাছেই রেখে দেন।
আমরা জানি, সংসারে মনোমালিন্য খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। প্রতিটি সংসারেই তা হয়। এজন্য সংসার থেমে থাকে না। এগিয়ে যায় তার নিজস্ব নিয়মেই। তবে সেখানে সবাইকে ছাড় দিতে হয়। যে ছাড় সন্তানদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করে। মোট কথা ছাড়ের মানসিকতা না থাকলে কোনো সংসার নির্বিঘ্নে চলতে পারে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সম্প্রতি প্রকাশিত ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ’ (এমএসভিএসবি) প্রতিবেদন বলছে, দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেড়েছে। এর বাইরে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনসহ দেশের বিভিন্ন সিটি করপোরেশগুলোর পরিসংখ্যানও বলছে একই কথা। যার পেছনের মূল কারণ বলা হচ্ছে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনের ঘাটতি।
এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, শহুরে সমাজে দিন দিন পারিবারিক বন্ধন অনেকটাই কমে যাচ্ছে। যার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে বিবাহ বিচ্ছেদের মতো দুঃখজনক পরিণতিতে। তবে সেখানেই তা থেমে থাকছে না; ওই বিচ্ছেদের প্রভাব পড়ছে ধ্রুব ও লুব্ধ’র মতো শিশুদের জীবনে। যে জীবন পিতার স্নেহ, মায়ের ভালোবাসা থেকে প্রতিনিয়তই বঞ্ছিত হয়। সার্বিকভাবে যার প্রভাব পড়ে সমাজেরও প্রতিটি ক্ষেত্রে।
তাই আমরা মনে করি, সন্তান, সংসার, সমাজ এবং সর্বোপরি নিজেদের প্রয়োজনে কিছুটা হলেও ছাড় দেয়ার মনোভাব সবার মধ্যেই থাকতে হবে। না হলে এই শিশুদের মর্মস্পর্শী বার্তা আদালতের চার দেয়ালের মধ্যেই প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। তাই কি আমরা চাই?








