কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় ‘অপারেশন স্টর্ম-২৬’এ নিহত জঙ্গি আব্দুল হাকিম ওরফে নাইমের লাশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তার স্বজনেরা। প্রাথমিক ভাবে জঙ্গি হাকিমকে কুয়াকাটার বাসিন্দ বলে ধারণা করা হলেও পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে তিনি টাঙ্গইলের বাসিন্দা। পরিচয় প্রকাশের পর থেকেই হাকিমের গ্রামের বাড়ি- গোপালপুর উপজেলার গোলাবাড়ি গ্রামের বাড়িতে ভিড় করছে উৎসুক জনতা থেকে শুরু করে তদন্তকারী সংস্থার কর্তব্যরত কর্মকর্তা এবং আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। আক্ষেপ-ঘৃণা-লজ্জ্বা ঢাকতে হাকিতের স্বজনেরা বলছেন-‘এমন খারাপ লোকের লাশ যমুনায় ভাসাইয়া দেন’।
চ্যানেল আই অনলাইনের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে জঙ্গি হাকিম ওরফে নাইমের জঙ্গি হয়ে ওঠা থেকে শুরু করে জীবনের নানা অজানা তথ্য:
জঙ্গি পূর্ব জীবন: গোপালপুর থানা পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ও প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানা তথ্য মতে- গোলাবাড়ি গ্রামের দরিদ্র কৃষক নুরুল ইসলামের ঘরে জন্ম হাকিমের। সঠিক জন্ম তারিখ জানা না থাকলেও আনুমানিক বয়স ৩৪-৩৫। জন্মের কিছুকাল পরে বাবার মৃত্যু জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় হাকিমের। স্থাবর সম্পতি না থাকায় তার মা তাকে নিয়ে নানার বাড়ি জামালপুর জেলার সদর উপজেলার ঘোড়াধাপ গ্রামে গিয়ে ওঠেন।
সেখানেই তার বেড়ে ওঠা এবং আরবি শিক্ষায় উচ্চ শিক্ষা লাভ করেন। এসময় এলাকার মানুষের কাছে হাকিম মৌলভী নামে পরিচিতিও লাভ করেন তিনি। ২০০৪-৫ সালের দিকে টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চাপাইত গ্রামের মৃত আব্দুল হামিদ মাস্টারের মেয়ে সখিনা বেগমকে বিয়ে করেন। বিবাহিত জীবনে রাজিয়া (১০) তাসলিমা (৭) ও সাইফুল্লাহ (৪) নামের তিন সন্তান রয়েছে তার।
জঙ্গি জীবন: নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রতিবেশী চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান: নানার বাড়ি চলে যাওয়ার পর হাকিমের সাথে বাবার বাড়ির লোকজনের তেমন যাতায়াত না ছিলনা। তবে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে তাদের গ্রামের বাড়িতে খবর আসতো। সেই সূত্র থেকেই প্রতিবেশীরা নিশ্চিত করেন-ছাত্র জীবনে হাকিম দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের ধর্মভিত্তিক অন্যতম শরীক দলের ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
পরে ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে জামালপুরের অধিবাসী জেএমবি প্রধান শায়খ আব্দুর রহমানের সাথে সখ্যতা থেকে সেই বিশ্বাসের অনুসারী ছিলেন বলে শুনতেন তারা। পরে ২০০৬ সালের ২মার্চ শায়খ আব্দুর রহমান ও ৬ মার্চ সিদ্দিকুল ইসলাম র্যাবের অভিযানে গ্রেফতার হলে গা-ঢাকা দেন হাকিম। দীর্ঘদিন তার আর কোন খবরও জানতো না প্রতিবেশীরা। 
গ্রামে ফেরা: আব্দুল হাকিমের চাচী রাবেয়া বেগম বলেন, ২০০৯- ২০১০ সালে হঠাৎ একদিন গ্রামের বাড়িতে বৌ-বাচ্চা নিয়ে হাজির হয় হাকিম। লিবিয়া( বিদেশ) যাবে বলে বৌ-বাচ্চা এখানে রেখে যাবে। তার নিজের কোন জায়গা না থাকায় আমাদের অংশেই জোর করে ১৩-১৪ হাতের দু’চালা একটি টিনের ঘর তুলে ছয় মাসের মতো অবস্থান করে লিবিয়া চলে যায়। অবশ্য, এক থেকে দেড় বছর পর দেশে ফিরে আসে।
তিনি আরো বলেন, এই সময়ে তার স্ত্রী সখিনা ও মেয়েরা কিছু সময়ের জন্য এ বাড়িতে অবস্থান করলেও তারা কারো সাথে মেলা মেশা করো না। প্রচণ্ড রকমের রক্ষণশীল হওয়ায় তার মুখটি পর্যন্ত দেখতে পারেননি কেউ। তিনি আরো বলেন, দু’চালা এই ঘরের ভিতর হাঁড়ি-পাতিল ও একটি স্টিলের ট্রাঙ্ক ছাড়া আর কিছুই নেই। এতোদিন ওই ঘর তালা বদ্ধ ছিলো। গতকাল পুলিশ এসে ওই ঘর থেকে একটি ডায়েরী ও কিছু কাগজপত্রসহ আমার স্বামীকে থানায় নিয়ে গেছে।
গ্রাম থেকে বিতাড়িত: হাকিমের এক দূর সম্পর্কের চাচা রহমান বলেন, ২০১১-১২ সালের দিকে লিবিয়া থেকে গ্রামে ফিরে আসে হাকিম। তখন জানায় সে গ্রামেই স্থায়ী হবে। আমাদের এ পাড়ায় শিক্ষিত কোন লোক না থাকায় তার স্থায়ী হওয়ার কথাতে অনেকই খুশিই হয়েছিলো। গ্রামে ফিরে এসেই গ্রামের মানুষকে একত্রিত করে টিনের ছাপড়ার একটি মক্তব খুলে। সেখানে যমুনার চরে বাড়ি শাখারিয়া মাদ্রাসার এক ছাত্রকে দিয়ে শিশুদের ধর্মীয় শিক্ষা দিতেন। পাশাপাশি ওই মক্তবে গ্রামের মানুষদের ধর্মীয় বয়ান দিতেন।
ধর্ম বিষয়ে এক নাগাড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতে পারতেন। কোন ওয়াজ মাহফিলে ওয়াজ করাকে অপছন্দ করতেন। তবে বিভিন্ন মসজিদে খুৎবা পাঠসহ এলাকার একাধিক মাদ্রাসায় সারারাত করে বয়ান দিয়ে মানুষকে ধর্মের কথা বলতেন। তার অধিকাংশ কথাই উগ্র ধর্মীয় মতবাদের ছিলো। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক সকল কিছুতেই ফতোয়া দিতে শুরু করে সে। একটা সময় তার কার্যক্রম আমাদের সন্দেহ হলে তাকে ২০১৩ সালের শেষ দিকে গ্রাম থেকে বিতাড়িত করা হয়। সে উগ্র ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী ছিলো এমনটাই নিশ্চিত করেছেন নিকট আত্মীয় ও অন্যান্য প্রতিবেশীরা। ওই মক্তবটি এখন বন্ধ রয়েছে। বাড়ির মালিক চাকলাদার তাতে গরুর গোয়াল ঘর হিসেবে ব্যবহার করছেন।
গোপন জীবনে: জঙ্গি হাকিম কল্যাণপুরে নিহত হবার পর তার প্রাথমিক পরিচয়ে কুয়াকাটার বাসিন্দা বলে জানা যায়। পরে গত বৃহস্পতিবার তার আসল পরিচয় নিশ্চিত হলে বেরিয়ে আসে গোপন জীবনের কথা। ২০০৬ সালে শায়খ আব্দুর রহমান ও বাংলা ভাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে অনেকের সাথে সেও গা-ঢাকা দেয়। এক পর্যায়ে স্থায়ী হয় কুয়াকাটায়। 
সেখানে ২০০৬/২০০৭ সালের দিকে সাগরনীড় হাউজিং নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ নেন। সে সময় কুয়াকাটার ঠিকানা ব্যবহার করে ভোটার হন তিনি। পরিচয়পত্রে লেখা আছে, নাম আবু হাকিম নাইম, পিতা: নুরুল ইসলাম, মাতা: মোসা. হালিমা, গ্রাম: কুয়াকাটা।
২০০৭ সাল পর্যন্ত একটি বাড়িতে ভাড়া থাকেন পরে সাগরনীড় হাউজিং প্রকল্পের অফিসে থাকতেন । পরে ২০০৮-০৯ সালের দিকে কুয়াকাটা থেকে চলে আসেন শ্বশুর বাড়ি। তারপর কিছুদিন ঢাকা অবস্থান করার পর গ্রামের বাড়ি গোপালপুরে ছয় মাস অবস্থান করে স্ত্রী সন্তান রেখে চলে যান লিবিয়াতে। পরবর্তী ২০১৩ সালের দিকে নিজ গ্রাম থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর তিনি একেবারেই লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যান। এদিকে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন রক্ষণশীল পরিবার হওয়ায় মধুপুরের চাপাইত এলাকার মানুষ তাদের সম্পর্কে অনেকটাই অজানা।
পুলিশের কথা: গোপালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল জলিল, নাইমের থাকার ঘরের একটি ট্রাঙ্ক থেকে একটি পুরাতন অ্যালবাম উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে হাকিম ও তার স্ত্রী সখিনা খাতুনের একটি ছবি ও ভোটার আইডি কার্ড পাওয়া গেছে। এ ছাড়া লিবিয়া থেকে তার স্ত্রীর নামে হাকিমের টাকা পাঠানোর একটি রশিদও পাওয়া গেছে। এ সময় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নাইমের চাচা সুরুজ্জামানকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া তার এলাকায় থাকাকালীন সময়ের কার্যক্রম ও স্থানীয় সঙ্গীদের ব্যাপারে নজরদারি চলছে। অন্যদিকে মধুপুর থানার অফিসার ইনচার্জ সফিকুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার মধুপুরের চাপাইত থেকে হাকিমের স্ত্রীর বড় ভাই আব্দুর রহমানকে আটক করা হয়। তাকে হাকিমের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের কথা: হাকিমের ফুফু হনুফা ও ভাগিনি রোজিনা বলেন, “হাকিম মৌলভি যখন দূরে ছিলো তখন তারে নিয়া আমরা গর্ব করছি। আমাদের বংশের সেই একমাত্র বিদ্বান লোক ছিলো। কিন্তু দেড়-দুই বছর গ্রামে থাকার সময়ে গ্রামের মানুষ একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলো। কোরবানী,পর্দা,নামাজ,মিসকিন খাওয়ানো, মৃত ব্যক্তি নিয়ে এমনসব কথা বলতো যা আমরা’ত দূরের কথা মসজিদের হুজুর’ও অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিলো। হাকিমের এমনিতে সবই ভাল ছিলো শুধু ধর্মে ব্যাপারে এতো বেশি বাড়াবাড়ি করছে যে, ফকির মিসকিন মরলেও মানুষে কান্দে কিন্তু ওর জন্য কেউ চোখের পানিও ফালায় নাই। লাশ গ্রহণ করার প্রশ্নই উঠেনা। এমন খারাপ লোকের লাশ যমুনায় ভাসাইয়া দেন। যাতে অন্যরা দেখে শিক্ষা পায়।”







