এই লিখাটির বন্দনাপর্বে কিঞ্চিৎ ‘নিবেদন’ আছে। সেই যে মার্কিনী প্রেসিডেন্ট নিক্সন সাহেব প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেটিক পার্টির দপ্তরে গোয়েন্দাগিরি করেছিলেন বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকে, তার নাম ছিল ‘ওয়াটার গেট’ কেলেংকারি। ডেমোক্রেটিক দপ্তরের স্থান অনুযায়ী। সেই থেকে এ ধরনের যত্তো ইত্যাকার কান্ড চলে আসছে, তার পাশে এরূপ ‘ গেট’ শব্দটি যুক্ত করে দেয়া যেন মিডিয়ার রেওয়াজ-এ পরিণত হয়ে গেছে। ওয়াটার গেট কেলেংকারিতে প্রেসিডেন্ট পদটুকু ‘ত্যাগ’ করে ‘ত্যাগী প্রেসিডেন্ট’ হিসাবে ইতিহাসে বিশেষ কলংকিত ঠাঁই করে নিয়েছেন নিক্সন মিয়া। কিন্তু পৃথিবীর মায়া কাটানো মরহুম নিক্সন সাহেবকে ‘ গেট’ শব্দটি আর ছাড়ছেনা।
ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনী দপ্তর ছিলো ওয়াটারগেট হোটেলে। ওদের নির্বাচনী প্রচারণার গোপন দলিল সিঁদ কাটতে গিয়েই নিক্সনের এই হতদ্দশা, হঠাৎ পতন। তারপর থেকেই পৃথিবীর যেখানে কেলেংকারি, সেখানেই ‘ গেট’ শব্দটি কাঁঠালের আঠার মতো লেগেই আছে। যেমন ইরানগেট, কন্ট্রা গেট, কোরিয়াগেট, বিলি গেট এমনি অজস্র। ভারতের মনমোহন সরকারের প্রথম পর্বে কয়লাখনি বরাদ্দ নিয়ে কেলেংকারি, ওটার নাম কোল গেট। ভারতের কর্ণাটকের বিধানসভায় তিন বিজেপি সদস্য স্মার্ট ফোন সাথে নিয়ে বিধানসভার অধিবেশনের সময়ে পৃথিবীর আদি-রসাত্মক রগরগে ছবি দেখছিলেন, সেটা ফাঁস হয়ে গেলে একই সাথে ওদের সদস্যপদ গেলো, পাশাপাশি ঐ কেলেংকারির নাম হয়ে গেলো পর্ণোগেট।
এদিকে মার্কিনী ডাকসাইটে প্রথম মহিলা মাঝে যখন সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন বছর চারেক, তখন সরকারি ইমেল-এর বাইরেও গোপন সার্ভারে একটি ব্যক্তিগত ইমেলে নানা সরকারি যোগাযোগ করেছেন। এবার তিনি প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবার ঘোষণা দেবার সময়ে এই কেলেংকারি ফাঁস হয়ে গেলে এটারও নাম হয়ে গেলো ইমেল- গেট। যারা হিলারীকে নির্বাচনের আগেই কুপোকাৎ করতে চান, তারা মার্কিনী জিঞ্জার (আদা) এবং ওয়াটার (জল) খেয়ে লেগে গেছেন ঐ ই-মেল গেট কেলেংকারিটি নিয়ে যতটুকু সাধ্য অবিরাম চটকাতে। এই চটকানোর এক পর্যায়ে অতিসম্প্রতি গোপন মেলসমূহের কিয়দংশ ওরা ফাঁস করে দিয়েছে। তবে ফাঁসকৃত মেলসমূহের কিছু কিছু সংবেদনশীল অংশ সাদা কালি দিয়ে মুছে দেয়া হয়েছে। কিছু কিছু অতি সংবেদনশীল চিঠি নাকি ২০২৫ পর্যন্ত প্রকাশ না করলেও আইন ভাঙ্গবেনা। জানিনা ২০২৫ সন পর্যন্ত নিজে বাঁচবো কিনা। জানিনা ২০২৫ পর্যন্ত হিলা আপ্পু বাঁচবেন কিনা এবং জানিনা ঐ ২০২৫ পর্যন্ত আমাদের মহান শান্তি দরবেশ ইউনূস ভ্রাতা বেঁচে থাকবেন কিনা। তবে নিবেদন, ইউনূস-হিলারী ইমেল ঘটনার একটি নামকরণ কিন্তু চাই।
পাঠক দোষ নেবেননা। অপরাধ নেবেননা। মাফ করে দেবেন। এসব কথায় আবার আমাদের দেশের সবচেয়ে কৃতি, খ্যাতনামা, বিশ্ববিশ্রুত নোবেল পুরস্কৃত ব্যক্তিকে টেনে আনলাম কেন? সাহেবের দুনিয়াজোড়া সম্মানে অভিভূত একেবারে হাজারে হাজারে প্রশ্নবিহীন ভক্ত। অবশ্য রাজনৈতিক সুবিধার কারণে কেউ কেউ আজকাল ‘অতিভক্ত’ হিসাবে নিজেদের জাহির করে থাকেন। তবে এহেন এদের একজন, বিএনপি সরকারের দীর্ঘকালের অর্থমন্ত্রী, মরহুম ছাইফুর রহমানতো দু’চক্ষে ড. ইউনূসকে দেখতে পারতেন না। তুই- তোকারি করে বলতেন, সে আবার কে, দেশের এক ডজনেরও বেশি বাজেট তৈরি করেছি আমি, কোথাকার কোন ক্ষুদ্র ঋণওয়ালা এসে কৃতিত্বের বড়াই করছে! তবে বর্তমানে বিএনপি প্রধানা থেকে শুরু করে গুঁড়াগাড়া সবাই সুযোগ পেলেই বলে থাকেন, ক্ষমতাসীন প্রধানা মানী লোকের মান বোঝেননা, মানী লোকের মান নষ্ট করেন। এ কথায় অনেকেই সহমত পোষণ করে থাকেন। দেশের একনম্বর ইংরেজি পত্রিকাতো একবার ইতিহাস এবং বিচারবিবেচনাবোধকে একযোগে ভর্ত্তা বানিয়ে স্বাধীনতার রাজনৈতিক প্রধান নায়ক হিসাবে বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীন দেশের অর্থনৈতিক প্রধান নায়ক হিসাবে ড. ইউনূসকে পাশাপাশি সমান সাইজের ছবি ছাপিয়ে ইতিহাসের পাল্লায় বাটখাড়ার অপব্যবহার ও প্রতারণার কুটিল নজির স্থাপন করেছিলেন। তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় ড. ইউনূসকে স্থাপিত করার ওয়াশিংটনী পরিকল্পনাটি ভ্রুণ পর্যায়ে ছিল, ইংরেজি তারকা পত্রিকাটি নাকি এই প্রকল্পে যুক্ত ছিলো গোড়া থেকেই ।
এদিকে নানা কারণে যারা ড. ইউনূসকে পছন্দ করেননা, তাদের কয়েকজন ছিলেন তাঁর দীর্ঘকালের সাথী। দু’একজনতো বেজায় রকমের খাপ্পা। যদিও অনেক কর্মসাথীই তাঁকে অসম্ভব ভক্তিতে আপ্লুত রাখেন। ১৯৯৬ সনে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসা আওয়ামী প্রধানের সঙ্গেও ইউনূস সাহেবের সমীকরণ মন্দ ছিলোনা। অনেকক্ষেত্রেই ছিলো সহযোগিতামূলক। এরপরই ২০০১-২০০৬ খালেদা আমলে ক্রমে আওয়ামী মহলের সাথে রচিত সুসম্পর্ক বৃত্ত থেকে দূরে সরে ২০০৫-০৬ সনেতো আওয়ামী-বিএনপি বিরোধে ইউনূস সাহেব প্রকাশ্য সমাবেশে বিএনপি’র পক্ষাবলম্বন করেন। ২০০৭ সনের জরুরি আমলে বেরিয়ে পড়ে ষড়যন্ত্রের জারিজুরি। অর্থাৎ মার্কিনী মহাশক্তি চাইছে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন হোন ইউনূস নেতৃত্বাধীন সুশীল সমাজ। বিশাল প্রতিবেশী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নও তখন একই চাওয়ায় ঐক্যবদ্ধ ছিলো। পৃথিবীর প্রথম মহাশক্তির পাশে দেশের প্রথম ‘আলোকিত’ মিডিয়াও নিবিড় নিবিষ্ট হলো। পরিবেশ-পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য দীর্ঘ সময় ধরে ‘বিরাজনীতিকরণের’ ফাউল খেলায় ঐ পরিবারের নানা সদস্য তাদের ধূষর মগজকে ‘চান্নিপসর’ করে তুললো। প্রথম ‘আলোকিত’ টাইকুনকে সে সময় মীরপুরে ইউনূস দরবারে বারংবার হাজিরা দিতে দেখা গেলো। চ্যানেলে চ্যানেলে তার ক্ষিপ্র দীপ্র ভঙ্গিমা দেখলে ‘বিস্ময়’ শব্দটিকেও চমকিত হতে হয়। কিন্তু ইউনূস সাহেব বিনা গণনির্বাচনে রাষ্ট্রীয় পদে যেতে নারাজ। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হবেননা, এমনি পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাংক পসন্দ তালিকার আরেকজন ফখরুদ্দিন ভ্রাতাকে জাতির ত্রাতা হতে হলো। এদিকে রাজনীতি থেকে হাসিনা ও খালেদাকে যুগপৎ নির্বাসনে পাঠাবার গভীর আয়োজনে সুশীল এবং মিডিয়া টাইকুনরা মেতে উঠলো। হাসিনা-খালেদা বিহীন মাঠে রাজনীতি খেলার মহান ব্যাকুলতায় ইউনূস সাহেব মেতে উঠলেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে, ইমেল-এসএমএস যোগে জাতির সমর্থন সংগ্রহের ব্যাপক ব্যবস্থা নিলেন। মিডিয়া বিশেষজ্ঞ তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি একনিষ্ঠভাবে কাজটিতে লেগে গেলেন। রাজনীতি ও ক্ষমতার এই নিষ্ঠুর ও কঠিন খেলায় হাসিনা তীব্র যুদ্ধে নামলেন। ইউনূস সাহেবের প্রস্তাবিত রাজনৈতিক দলটির ভান্ডারী ছিলো দেশবিদেশের অনেকে, তবে দ্বিতীয় কান্ডারী হিসাবে আকাশে উদিত হলো ইংরেজি ‘তারকা’ পত্রিকার বিশিষ্ট মিডিয়া তারকা। দেশ-বিদেশ-মহাশক্তির অনেক মহাজনই এই মিডিয়া তারকাকে বারংবার শুধিয়েছিলেন নানা উপলক্ষের সুধা আয়োজনে, দু’ নেত্রীকে রাজনীতি থেকে একযোগে সরিয়ে দিলে সামাল দেয়া যাবেতো? তারকা পত্রিকার মিডিয়াতারকা সবাইকে বলেছিলেন এক নিঃশ্বাসে, নো প্রবলেম, নো প্রবলেম! বাংলাদেশের সকল মানুষ হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে, তুমুল সমর্থনে সুশীলেরা বিপুল সাফল্য অর্জন করবে! অধ্যাপক ইউনূসের মাঠ যাচাই তথ্যপ্রযুক্তির প্রাথমিক ফলাফল হলো বিকট রকমের প্রকট হতাশাভরা। গ্রেফতার হবার আগে সুযোগ পেয়ে ড. ইউনূসকে ‘সুদখোর’ বলে আখ্যা দিয়ে আওয়ামী তৃণমূলের মাধ্যমে তা দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিলেন হাসিনা। প্রেমে, যুদ্ধে, ক্ষমতার লড়াইয়ে নাকি সবই চলে। ফলাফল? ফ্লপ সিনেমার পরিচালক হিসাবে চলচ্চিত্রটি নির্মাণে ক্ষ্যামা দিলেন ইউনূস সাহেব হঠাৎ করে। বললেন, যারা যারা শলা-পরামর্শ দিয়ে তাঁকেমাঠে নামিয়েছে, তারা সব সটকে পড়েছে। আসলে এতো বিশাল গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কর্তৃত্বকে শেষ পর্যন্ত জুয়ার দানে পরিণত করতে চাননি তিনি। বুঝে নিয়েছেন, ঝুঁকি নেবার বাস্তবতা নেই। এ সময়টায় পত্রপত্রিকায় একই সুরে একই দাপটে একই ফ্যাসিবাদী নিরাবেগ ভঙ্গীতে প্রথম ‘আলোকিত’ মহাজন ও তার উচ্চ-আদালত বিশেষজ্ঞ-লিখিয়েবুঝদার অনুচরকে ‘দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরে যেতে হবে’ শিরোনামে একপ্রকার হুকুমদারী কণ্ঠে বয়ান জারি করতে দেখা গেলো। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের প্রবীণ সাম্যবাদীও একই সুরে পত্রিকায় কলাম লিখলেন কার ইশারায় কে জানে! ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনকে ছুঁয়ে তৈরি সাবজেলে পাশাপাশি বন্দী থাকলেন দু’ নেত্রী।
এ সময়কালে মূল নাটের গুরু জেনারেল মঈন আইয়ুব-জিয়া-এরশাদীয় প্রকৌশলে কোরেশী-সাঈদ খোকন প্রভৃতি জুটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় পাকাপাকি প্রবেশের পাঁয়তারা করতে দেশকে ভোজ্য তেলে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবার ‘পাম গাছ’ রোপনের হুজুগ তুললেন। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জরুরি সেনা শাসনের বিরুদ্ধে ‘হঠাৎ বিদ্রোহ’ সব হিসাব উল্টে পাল্টে দিলো। এদিকে দ্রব্যমূল্যের ঘোড়াটিও হঠাৎ পাগলামি শুরু করলো। আন্তর্জাতিক মহাজনেরা প্রমাদ গুণলো। যে সুশীলদের বাক্যনাচনে তারা মুগ্ধ ছিলো এতোকাল, সেসব বাক্য বাস্তবের শূন্যগর্ভতায় তাদের কাছে হাস্যকর হয়ে উঠলো। ওদিকে বিডিআর প্রধান খাদ্যদ্রব্যের বেনিয়ায় পরিণত হয়ে ব্যবসায়ী সমাজকে বিরূপ করে তুললো। জেনারেল জিয়ার জ্যেষ্ঠ তনয়ের বাড়াবাড়িতে সামরিক কমান্ডের অনেকেই ছিলো সংক্ষুব্ধ। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক প্রভুরা দিলো পিছুটান। তখন প্রশ্ন উঠলো তাহলে কে?
পরবর্তী রূপালী পর্দা আমাদের জানিয়ে দিলো মঈন-ফখরু গোষ্ঠীর পশ্চাদপসরণের অংক। দু’ নেত্রীর মধ্যে আপেক্ষিক গুরুত্ব পেলো হাসিনা। তিক্ত বটিকা হলেও গিলতে হলো অনেককেই। ২০০৮ এর ডিসেম্বরে নির্বাচনী বিশাল বিজয়ে ক্ষমতাসীন হলেন হাসিনা। ক্ষমতায় বসতে না বসতে বিডিআর বিদ্রোহ হাসিনা সরকারকে টলটলায়মান করে তুললেও, হাবুডুবু খেলেও ক্ষমতার তরী ভেসে রইলো। এই বিদ্রোহ কী অতিপরিকল্পিত নাকি স্বতঃস্ফূর্ত সেটা নিয়ে নানা কথা থাকলেও সেনাবাহিনীতে সৃষ্ট প্রতিক্রিয়ায় হাসিনা সরকারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়লো গোড়াতেই। তবে ক্রমে ক্রমে গুছিয়ে আনতে থাকলেন হাসিনা।
নির্বাচনী পরাজয় মেনে নিলেননা খালেদা মহল। শুরু থেকেই ছক কাটা হলো যে কোন সময় হাজার হাজার সমর্থককে ব্যাংকক কিংবা তাহরির স্কোয়ার স্টাইলে রাজপথে অবস্থান গ্রহণ করিয়ে সরকারকে টলিয়ে দেয়া। বিপরীতে সরকারও নিতে থাকলো সব রকমের প্রতিষেধক। এদিকে হাসিনা সরকারের সঙ্গে হঠাৎ ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের বেধে গেলো সংঘাত। ২০০৬ সনে নোবেল পুরস্কার পাওয়া বিশ্বব্যক্তিত্ব কার্যতঃ শেখ হাসিনা নেতৃত্বকে ভিতর থেকে এতটুকু আমলও দিতোনা। তদুপরি বিশ্বপরিসরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির, বাঙালি জাতিসত্ত্বার প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামটি ভুলেও ইউনূস সাহেব মুখে আনতেননা। এদিকে আমেরিকা-ইউরো জোট একযোগে উন্নয়নশীল দুনিয়ার উদীয়মান মুসলিম ব্যক্তিত্ব হিসাবে মহাঅনুগত ড. ইউনূসকে প্রণোদনা এবং সমর্থনের জোয়ারে ভাসিয়ে দিলো। ইউনূস হচ্ছেন হাসিনার ক্ষমতা প্রান্তরের প্রধান বিপদ এমন একটা পরিবেশ গড়ে তুলে হাসিনা বনাম ইউনূস দ্বন্দ্বকে তুঙ্গে নিয়ে যেতে ব্যতিব্যস্ত হলো অনেক স্বার্থান্বেষী মহল। হাসিনা কল্যাণকামীদের অনেকেই এই দ্বন্দ্ব- দ্বৈরথ পছন্দ করছিলেননা। দ্বন্দ্ব মেটাবার শক্তি অনেক চেষ্টা করেও এটি প্রশমনে সফল হলোনা।
পাঠক, এখানে একজন মতামতপ্রদাণকারী হিসাবে বলতে পারি, ব্যক্তিগতভাবে আমি ড. ইউনূসের অতিভক্ত নই। তবে তাঁর যতটুকু অবদান, সেটাকেও ক্ষুদ্র এবং খর্ব করার দলে নই। ক্ষুদ্র ঋণ সব দুঃখ কষ্ট মুছে দেবে যেমন ভাবিনা, ক্ষুদ্র ঋণ বিশাল ভ‚মিকা পালন করছে, ঢালাওভাবে তা মনে করিনা।ক্ষুদ্র ঋণ যতটুকু সদর্থক ভূমিকা রাখছে সেটার যথাযথ বিশ্লেষণ থাকা প্রয়োজন। ‘সুদখোর’ বলে পুরো প্রক্রিয়াটি নাকচ করাটাও পছন্দ করিনা। ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট অর্থ জমা করে আমরা সম্ভবমতো অনেকেইতো সুদ খাচ্ছি। তবে ‘সুদ’ এর পরিমাণ যেন ক্ষুদ্র ঋণ ওয়ালার যৌক্তিক হারে নেন, সেটাতো জনগণ দাবী করতেই পারে। এ সময়কালে রাষ্ট্রক্ষমতার চারপাশে অনেককেই দেখেছি হাসিনা বনাম ইউনূস দ্বন্দ্বে স্বস্তি অনুভব করছেন না। ড. ইউনূস-সম সাফল্য খুব কমজনেরই হয়। পাশ্চাত্যমহল যে কারো পেছনে এমনি এমনি সমর্থন দেয়না। সাফল্যের জ্বলজ্বলে উদাহরণেরও পাশে কিছু ব্যর্থতা থাকেই। যেমন ড. ইউনূস একটি উত্তরাধিকার ব্যবস্থাপনা টিম গঠনে সফল হননি। বরং বহুকালের দ্বিতীয় ব্যক্তিকে বিগড়ে দিয়েই বেশ বিপদে পড়ে যান। নরওয়ে টেলিভিশনে ড. ইউনূসের তহবিল স্থানান্তর নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রচারিত হয়, সেসব তথ্য যোগান দিয়েছেন ইউনূস সাহেবের নিকট পরিমন্ডলই।
হাসিনা-ইউনূস দ্বন্দ্বের সময় শেষোক্তজন এরপর যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, সেটাতেই খুঁজে পাই একজন অতিসফল ব্যক্তির চ‚ড়ান্ত নৈতিক বিপর্যয় আর অধঃপতনের। খুবই কষ্ট পেয়েছি। ১৯৭১ সনে খোদ মার্কিন মুল্লুকে বসে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে ভ‚মিকা পালনকারী ঐতিহ্য এই মেধাবী, চৌকশ, দৃপ্ত ব্যক্তিত্বের। সেই তিনি কিনা ক্লিন্টন পরিবারের নিকটজন হিসাবে ক্লিন্টন এবং হিলারীকে ব্যবহার করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার নেতৃত্বকে ভীত-সন্ত্রস্ত এবং দুর্বল করে তোলার উদ্যোগ নিতে পারেন! হিলারী তার এক অধঃস্তন সহযোগী জনৈক ব্লেক নামের হোয়াইট বেটাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে ‘ ব্লেকবোমা’ ছুঁড়ে হুমকি-ধামকি ক্যারিকেচাওে সন্ত্রাসী কায়দায় হাসিনা-নেতৃত্বকে সমঝে দেবার বুদ্ধি করেন। তখন ইউনূস-ঘনিষ্ট মহলের সে কী গোপন উল্লাস! রবীন্দ্রসরোবরে তেমন দু’একজন হাঁটার সাথীদের হাঁটার গতিই বেড়ে গেলো দুদ্দাড় দুর্দম! এর পরে কাহিনীতো আরো ভয়ংকর, আরো বিপজ্জনক।
বিশ্বব্যাংক তার জন্মের পর বৃহত্তম যে অবকাঠামোতে অতি স্বল্পসুদে ঋণ দিলো, আমাদের পদ্মাসেতু সে সৌভাগ্যে রঞ্জিত হলো। হাসিনা নেতৃত্ব যদি সেই পদ্মাসেতু নির্মাণের কৃতিভাগী হয়ে যায়, তাহলে যে ২০১৪ সনের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হাসিনাকে হারানো মুশকিল হয়ে পড়বে। অতএব হিলারীকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের পদ্মাসেতুতে অর্থবরাদ্দের পূর্বেই দুর্নীতির হাওয়াই আওয়াজ তুলে বিশ্বব্যাংক তার ঋণবরাদ্দ তুলে নিলো। বিশ্বব্যাংকের প্রধানের দায়িত্বপালনের শেষ দিনটিতে জোয়েলিক নামের এক হিলারী-অনুচর এই নোংরা কাজটি করে নিকৃষ্ট নজির স্থাপন করলো। পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত একটি প্রকল্পও কেউ দেখাতে পারবেননা। তবে দুর্নীতির মাত্রা সহনশীল পর্যায়ে রাখাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্বব্যাংক তাতে সতর্ক থাকবে অতন্দ্র প্রহরীর মতো। কিন্তু অর্থবরাদ্দ না দিয়েই তা তুলে নেবার ঘোষণা যে একটি অন্যায্য কাজ তা পরবর্তী বিশ্বব্যাংক প্রধান নিজেই স্বীকার করে নিয়েছেন। আমাদের রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব এ পর্যায়ে এসে নিজেদের অর্থেই এই বিশাল পদ্মাসেতু প্রকল্প নির্মাণের যে দৃঢ় এবং প্রত্যয়ী ঘোষণা দিলেন, সমগ্র পৃথিবীতে তা অনবদ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। মাঝখানে আমাদের মূল্যবান দু’টি বছর নষ্ট হয়ে গেলো।
হাতে কোন দালিলিক প্রমাণ নেই, কিন্তু এটা কেন যেন সকলেই জানে, ইউনূস এবং খালেদা মহল এক হয়েই পদ্মাসেতু প্রকল্পটি সাবোটাজ করতে সক্ষম হয়েছিলো। তারা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু কালের ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবেনা। এই দু’বছরে বাংলাদেশের কতটুকু ক্ষতি হয়েছে, তার একটা দালিলিক আর্থিক ও মানবিক হিসাব হতেই হবে। এ ক্ষতির জন্য দায়ী যারা, তারা যতো বড়ো নোবেল নামক পুরস্কারই লাভ করুক না কেন, ইতিহাসের এই বিচার থেকে তাদের রেহাই নেই। একজন সফল বিশ্বব্যক্তিত্বের মেরুদণ্ড যদি একটি ক্লিন্টন পরিবারের কাছে এভাবে বিগলিত হয়ে যায়, তাহলে কী মূল্য থাকে ঐ বিশাল অর্জনের! ইউনূস সাহেবের বিশাল ক্ষুদ্র ঋণ পরিমন্ডলের যে কোন গ্রামে যাবেন, দেখবেন আর্থিক অবস্থা যা-ই হোক, বাংলাদেশের তৃণমূলে কতো সহস্র দুঃস্থ ব্যক্তির মেরুদণ্ড কতটা সবল এবং সুস্থ। ওরাই বাঁচিয়ে রেখেছে আমাদের গর্ব এবং গৌরব। বাংলার ঐ সাধারণ কিষাণ সমাজই ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বর্শাফলক বাহিনী।
ফিরে আসি হিলারী ক্লিন্টনের বেআইনী গোপন ই-মেলগেট কিচ্ছাতে। এই কেলেংকারি থেকে হিলারীকে রক্ষা করতে মার্কিনী রাজনীতির উঁচু উঁচু মহলে এখন সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। তা হিলারী রক্ষা কি অক্কা পেলেন সেটা আমাদের ততোটা চিন্তার বিষয় নয়। এরই মাঝে ফাঁস হওয়া হিলারীর ই- মেলে যে ঐ মেরুদণ্ড বিগলিত নোবেল মহাপুরুষ আমাদের জনাব ইউনূস সাহেবের প্রেরিত বার্তাগুলোও প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। সেখানে আমাদের দেশের অভ্যন্তরীন প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাপারে নাক গলাবার প্রকাশ্য এবং পরিষ্কার আহ্বান জানিয়েছেন ক্ষুদ্র ঋণের মহান বিশাল নায়ক। ঠিক যেভাবে মার্কিনী সেনাদেও নানা দেশে ঢুকে পড়ার জন্য আহ্বান জানায় দুনিয়ার মার্কিনী তাঁবেদাররা। সফল কৃতি ইউনূসের প্রতি সত্যিই বিমুগ্ধ একজন হয়েও মার্কিনী শাসকমহলের কাছে এভাবে মেরুদণ্ড বিক্রয়কারী একজন হিসাবে তাঁকে ভাবতে প্রকৃতই বিব্রত ও বিড়ম্বিত বোধ করছি।
তাহলে আমরা হিলারী ক্লিন্টনের কাছে গোপনে সহায়তা চেয়ে ইমেল পাঠানোর ইউনূসীয় কেলেংকারীর কী নাম দিতে পারি? পাঠক, এক্ষেত্রে এই পুঁচকে মানুষটির প্রস্তাবনা হচ্ছে: ‘নূস-হিলা’ গেট কেলেংকারি। আশা করি আপনারা অধমের এই প্রস্তাবনাটি অনুমোদন করবেন।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







