রাশিয়ার জনগণের ভেতরে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করার ক্ষমতা মিইয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
রাশিয়ার বিরোধী দলীয় নেতা বরিস নেমৎসভ হত্যাকাণ্ডের দু’বছর পূর্তিতে রাজধানী মস্কোতে ভ্লাদিমির পুতিনের বিরুদ্ধে রোববার বিক্ষোভ করে হাজার হাজার সমর্থক। এটি ছিল গত এক বছরে দেশটিতে বিরোধী দলের সমর্থনে করা সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ মিছিল। বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের অনেকেই একমত।
২০১৫ সালে ক্রেমলিনের বাইরে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন নেমৎসভ। রাশিয়ার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা ও সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী নেমৎসভ দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘোর সমালোচক ছিলেন।
নেমৎসভের স্মরণে আয়োজিত এই মিছিলই সম্ভবত বর্তমানে দেশটিতে বিরোধী দলের একমাত্র নিয়মিত প্রতিবাদ কর্মসূচি। মস্কোর কেন্দ্রে রোববার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টায় প্রায় ১৫ হাজার ২শ’ জন জমা হয় এই কর্মসূচির জন্য। যদিও টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, মাত্র পাঁচ হাজারের মতো মানুষ মিছিলে অংশ নিয়েছিল বলে দাবি করেছে পুলিশ।
সংখ্যাটি গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। গত বছর, অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ২৪ হাজারের মতো মানুষ এসেছিল প্রতিবাদ মিছিলের জন্য। আর ২০১৫ সালে নেমৎসভের মৃত্যুর পর সংখ্যাটি ৫০ থেকে ৭০ হাজার ছিল বলে জানায় রাশিয়া বিষয়ক আন্তর্জাতিক নিউজ পোর্টাল ‘রাশিয়া বিয়ন্ড দ্য হেডলাইনস’ (আরবিটিএইচ)।
শুধু বিরোধী দল নয়, নেমেৎসভের মৃত্যুর পর এই মিছিল ছাড়া গত দু’বছর ধরে কোনো পক্ষ থেকেই কোনো বিষয়ে আর বড় করে কোনো মিছিল বা বিক্ষোভ কর্মসূচি হচ্ছে না। পাঁচ বছর আগেও রাশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে যে সক্রিয়, তীব্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু ছিল, অদূর ভবিষ্যতে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাবে না বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
আরবিটিএইচ-এর বিশ্লেষণ অনুসারে, যে ক্রুদ্ধ জনগোষ্ঠী ২০১১ ও ২০১২ সালে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার দাবিতে বলোটনায়া স্কয়ার এবং সাখারভ প্রসপেক্টে জড়ো হয়েছিল, তারা রাজপথ ছেড়ে চলে গেছে। শিগগিরই তারা আর ফিরবে বলেও মনে করা হচ্ছে না। নেমেৎসভ মিছিল এর একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা দিলেও এতে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে আসাটা একটাই সংকেত দেয়: রাশিয়ায় প্রতিবাদ মুখরতা নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন।

এর কারণ হিসেবে রাশিয়ার জনগণের মানসিকতার পরিবর্তনকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিক্ষোভকারীরা নিজেরাই বলছেন, মানুষের মাঝে এখন প্রতিবাদের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশা বাসা বেঁধেছে।
২০১১ সালের স্টেট ডুমা নির্বাচনগুলোর পর অসংখ্য মানুষ ওই নির্বাচন নিরপেক্ষ নয় দাবি করে এর বিরুদ্ধে পথে নামে। তাদেরই একজন দিমিত্রি স্তেফানভ। তার ভাষায়, ‘ওই সময় মানুষেরা ক্ষিপ্ত ছিল কারণ তাদের মনে হয়েছিল তাদের রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। তারা গরীব ছিল না, তাদের যথেষ্ট খাবার ছিল। কিন্তু তাদের মনে হয়েছিল নিজ দেশের সরকার বেছে নেয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।’

ওই নির্বাচনের পরই ২০১২ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পরই একটু একটু করে হালকা হতে শুরু করে বিক্ষোভকারীদের ভীড়। তখনও এ নিয়ে আন্তর্জাতিক মাধ্যমে লেখালেখি হয়েছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ২০১২ সালে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গত বছরও বিবিসি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সমালোচক ও প্রতিবাদকারীদের জন্য রাশিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলাও খুব কষ্টকর হয়ে উঠেছে।
দিমিত্রির মতে, প্রথমদিকে রুশ জনগণের চিন্তাধারা ছিল: গণতান্ত্রিক অধিকার ধীরে ধীরে খর্ব হলেও এখনো আছে। আর সেই চিন্তা এখন ইউটার্ন নিয়ে ঘুরে হয়ে গেছে: রাজনৈতিক অধিকার বলে এখন আর কোনো কিছু নেই। নেমেৎসভের মৃত্যুর পর এই চিন্তাটা বিশ্বাস হয়ে গেঁথে গেছে তাদের অনেকেরই মনে।

বিক্ষোভের প্রথম সময়ে নেতৃত্ব দানকারীরাও কোন কৌশল অনুসরণ করা হবে, এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না। এটাও এক পর্যায়ে প্রতিবাদ-স্পৃহা কমে যাওয়ার একটা কারণ বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মানুষের মাঝে হতাশা ভর করার কারণে এখন আর কেউ নিয়মিত প্রেসিডেন্ট পুতিনবিরোধী কোনো প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশই নিতে চান না। কারণ তাদের মনে এই চিন্তাটা ঢুকে গেছে: প্রতিবাদ করলেও এখন আর কিছু আসে যায় না।







