বাড়িতে যখন থেকে ডিশের লাইন যুক্ত হয়েছে তখন থেকে ঈদের কোন কোন অনুষ্ঠান দেখা হবে সেটা রীতিমতো তালিকা করে রাখেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের শুভ। তবে সেই তালিকায় তাকে প্রতিটি ঈদে একটি অনুষ্ঠান অবশ্যই রাখতে হয়, সেটি হলো ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’। কারণ বাবা আর মায়ের প্রিয় অনুষ্ঠান এটি। প্রতিবার ঈদের পরদিন তাই অনুষ্ঠানটি দেখার জন্যই অধীর আগ্রহে থাকেন তারা। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।তারা মনে করেন ঈদে সবচেয়ে বড় আনন্দ ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’।
শুভর বাবা আক্কাস মিয়া চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আগে পাশের বাসায় গিয়ে টিভিতে এই অনুষ্ঠান দেখতাম। এখন তো বাড়িতেই দেখতে পারি। কৃষকদের নিয়ে এমন অনুষ্ঠান আর হয় না। তাই প্রতিবারই দেখি, ভালো লাগে।
‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ অনুষ্ঠানটি কখন হবে সেটা জানতে মঙ্গরবার সকালে চ্যানেল আই কার্যালয়ে টঙ্গী থেকে ফোন করেছিলেন সাব্বির হোসেন। চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, প্রতি বছরই অনুষ্ঠানটির জন্য অপেক্ষা করে থাকি। কৃষকদের নিয়ে অনেক আনন্দ করে, তাই দেখতেও ভালো লাগে।
বছরের পর বছর পেরিয়েও এখনো দর্শকের কাছে সমান জনপ্রিয় চ্যানেল আইতে প্রচারিত সর্বাধিক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’।
‘এত এত চ্যানেল আর অনুষ্ঠানের ভিড়ে এই অনুষ্ঠানটির এতটা জনপ্রিয় থাকার কারণ মনে হয় কৃষকদের সম্পৃক্ততা’ এমনটাই মনে করেন প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক গোলাম রহমান।
চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন, ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ জনপ্রিয়তার কারণ একাধিক। প্রথমত, এই ধরনের অনুষ্ঠান আর কোনো টেলিভিশনে হয়না। দুই, আমাদের দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী কৃষক, দেশের বেশিরভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে কৃষিকাজে জড়িত। কিন্তু তাদের জন্য আমাদের গণমাধ্যমে নির্দিষ্ট কোনো অনুষ্ঠান নেই। আবার এই অনুষ্ঠানের কনটেন্টগুলোও এমন যে সেখানে সবাই অংশগ্রহণ করে থাকে। আবার খেলাগুলো হয় সবই গ্রামভিত্তিক। গ্রামের মানুষগুলো তাই খুব সহজে অংশ গ্রহণ করতে পারে। কৃষকরাও নিজেদের মতো করে অনুষ্ঠানটাতে অংশগ্রহণ করে।’
একই কথা বলছিলেন ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ অনুষ্ঠানটির পরিকল্পক, পরিচালক ও উপস্থাপক শাইখ সিরাজ।
অনুষ্ঠানটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘দুটো বিষয়, আমাদের সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির অনুসর্গগুলো গ্রামকেন্দ্রিক। “কৃষি থেকে কৃষ্টি” বলে একটা কথা আছে। আমাদের সংস্কৃতি কৃষিকেন্দ্রিক এবং সেই অংশটাই অনেক বড়। দেশের ১১-১২ কোটি মানুষ গ্রামে বাস করে। কিন্তু তাদের নিয়ে খুব বেশি একটা কাজ হয় না। দেশে যে ২৬-২৭টা চ্যানেল রয়েছে, সবগুলোর কন্টেন্ট শহরকেন্দ্রিক। টিভির মানুষ-ছবি সবই শহরকেন্দ্রিক। ফলে এই ধরণের অংশগ্রহণে দুদিক থেকে তারা খুশি হয়। এক. তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে, দুই. তারা তাদের মতো করেই অনুষ্ঠানে অংশ নেয়, হাসে, কাঁদে। ’
শাইখ সিরাজের সেই বক্তব্যের প্রমাণ মেলে এবারের ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ আয়োজনের স্থানে। এবারের ‘কৃষকের ঈদ আনন্দ’ অনুষ্ঠানটি ধারণ করা হয় মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার দক্ষিণ হলদিয়ায় পদ্মার পাড়ে। যেখান থেকে দেখা যায় নির্মাণ হচ্ছে গর্বের পদ্মাসেতু। যেখান থেকে দেখা যায় বাংলাদেশের গর্বের এই ঐতিহাসিক নির্মাণযজ্ঞ। নিজের দেশে, নিজের ঘরে, নিজের এলাকায় এমন আয়োজন, তাই স্বভাবতই অনুষ্ঠানটির প্রতি সবাই আত্মিক টান অনুভব করেন।
অধ্যাপক গোলাম রহমানের ব্যাখ্যা করা জনপ্রিয়তার পেছনের কারণগুলো ছিলো এবারের কৃষকের ঈদ আনন্দতেও। এবারের আয়োজনেও ছিলো নানান গ্রামীন খেলা। পদ্মা নদীর উপরের দুজন প্রতিদ্বন্দ্বীর বালিশ লড়াই হোক অথবা পেটে দড়ি বেঁধে চারজন পুরুষের চতুর্মুখী টান সবগুলোই মনে করিয়ে দেয় কৃষকদের অংশগ্রহণের কথা। মোড়গ লড়াই বা বস্তা দৌড়ে শিশু কিশোরদের অংশগ্রহণ এমনকি বৌ সাজানোতে কৃষাণীদের অংশগ্রহণ আরো বেশি প্রাণবন্ত করে তোলে এবারের অনুষ্ঠানটিকে।
চ্যানেল আইতে ঈদের পরদিন প্রচারিত এই অনুষ্ঠানটা যেমন গ্রামের মানুষগুলোর কাছে প্রিয় ঠিক একইভাবে প্রিয় শহরের মানুষগুলোর কাছেও। সেটার ব্যাখ্যা দেন গোলাম রহমান।
তিনি বলেন, যেহেতু মানুষের অংশগ্রহণ বেশি এবং মানুষ সবসময় মানুষের অংশগ্রহণ পছন্দ করে। জীবনের কাছাকাছি থাকা বিষয়গুলো মানুষ পছন্দ করে। তাই সবার কাছেই অনুষ্ঠানটা সমান জনপ্রিয়। কিছুটা হলেও অংশগ্রহণ করতে পারে বলেই এই অনুষ্ঠানটা টানে সবাইকে।
শাইখ সিরাজও বলছিলেন সেই কথাই, “গ্রামের মানুষ যেমন শহরকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান দেখে, শহরের মানুষও সব অনুষ্ঠান দেখেন শহরকেন্দ্রিক। তারা যা দেখে সবই শহরের আয়োজন, যা শোনে সব শহরকেন্দ্রিক। তাই এই গ্রামীণ অনুষ্ঠানের পরিবেশটা তাদেরও খুব টানে।”







