সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে ২১ রানের জয় দিয়ে নিজেদের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে বাংলাদেশ। ওভালের ম্যাচটি বিশ্বমঞ্চে টাইগারদের ৩৩তম লড়াই ছিল। পথে ১৯ হার, ২ পরিত্যক্ত ম্যাচের পিঠে অর্জনে এলো ১২তম জয়।
ইংল্যান্ড আসরে ১৯৯৯ বিশ্বকাপে স্কটল্যান্ডকে দিয়ে শুরু হয়েছিল জয়যাত্রা। সাউথ আফ্রিকাকে দিয়ে সেই ইংল্যান্ডেই পূর্ণ হল এক ডজন জয়। দেখে নেয়া যাক সোনায় মোড়ানো সেই ১২ জয়ের গল্প।
১. প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড (২৪মে, ১৯৯৯)
বাংলাদেশ-১৮৫/৯, স্কটল্যান্ড-১৬৩/১০
(বাংলাদেশ ২২ রানে জয়ী)
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম জয়টি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। নিজেদের প্রথম আসরে খেলতে যেয়ে। ইংল্যান্ডে আসর ছিল, এডিনবার্গে সেদিন শুরুতে ব্যাট করে ১৮৫ তোলে টাইগাররা। মিনহাজুল আবেদিন ১১৬ বলে ৬৮ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে দলকে পথে রাখেন, যাতে ছিল ৬টি চারের মার। নাঈমুর রহমান করেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৬ রান। পরে স্কটিশদের দেড়শর ওপারে গুটিয়ে দিয়ে জয় তুলে নেয় আমিনুল ইসলাম বুলবুলের দল। হাসিবুল হোসেন, মঞ্জুরুল ইসলাম ও খালেদ মাহমুদ নেন দুটি করে উইকেট। ম্যাচসেরা অপরাজিত ফিফটি করা মিনহাজুল।
২. প্রতিপক্ষ পাকিস্তান (৩১মে, ১৯৯৯)
বাংলাদেশ-২২৩/৯, পাকিস্তান ১৬১/১০
(বাংলাদেশ ৬২ রানে জয়ী)
প্রথম জয়ের সাতদিনের মাথায় আসে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়। বিশ্বমঞ্চে ঐতিহাসিক সেই জয়ে টেস্ট মর্যাদার দাবি জানিয়ে আসে লাল-সবুজরা। শুরুতে ব্যাট করে শাহরিয়ার হোসেন ৩৯, আকরাম খান ৪২, খালেদ মাহমুদের ২৭ ও আরও চারজনের দশ পেরোনো ছোট ছোট সংগ্রহে দুইশ পেরিয়ে যায় টাইগাররা। জবাব দিতে নামা পাকিস্তান ৪৪.৩ ওভার পর্যন্ত খেললেও কেবল টেনেটুনে দেড়শ পার করতে পারে। খালেদ মাহমুদ ১০ ওভারে ২ মেডেনে ৩১ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন। শফিউদ্দিন, নাঈমুর, মিনহাজুল ও নিয়ামুর রহমান একটি করে উইকেট নেন। খালেদ মাহমুদ সুজন সেই ইতিহাস গড়া ম্যাচের সেরা হন।
৩. প্রতিপক্ষ ভারত (১৭মার্চ, ২০০৭)
ভারত-১৯১/১০, বাংলাদেশ-১৯২/৫
(বাংলাদেশ ৫ উইকেটে জয়ী)
ভুলে যাওয়ার মতো ছিল আগের আসর, ২০০৩ বিশ্বকাপ। কোনো জয় নেই। পরের বিশ্বকাপে শুরুটা হয় এশিয়ার আরেক দৈত্য ভারত বধের মধ্য দিয়ে। পোর্ট অব স্পেনে শুরুতে ব্যাট করা রাহুল দ্রাবিড়ের দলকে দুইশর আগে গুটিয়ে দেয় টাইগার বোলাররা। ঝড় তোলেন তখনকার তরুণ পেসার মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। ৯.৩ ওভারে ২ মেডেনে ৩৮ রানে নেন ৪ উইকেট। ৩টি করে উইকেট নেন আব্দুর রাজ্জাক ও মোহাম্মদ রফিক। জবাব দিতে নেমে আগারকার-জহির খানদের উপর তাণ্ডব চালান আরেক তরুণ তামিম ইকবাল। ৭ চার ও ২ ছক্কায় ৫৩ বলে ৫১ রানে শুরুটা করে যান। যেটা শেষ করে আসেন আরও দুই তরুণ সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিম। সাকিব ৫৩ রানে ফিরলেও অপরাজিত ৫৬তে ম্যাচ জয়ে নোঙর করিয়েই মাঠ ছাড়েন মুশি। ৯ বল আর ৫ উইকেট হাতে রেখেই জেতে হাবিবুল বাশারের বাংলাদেশ। বলে ঝড় তোলা মাশরাফী ম্যাচসেরা।
৪. প্রতিপক্ষ বারমুডা (২৫মার্চ, ২০০৭)
বারমুডা- ৯৪/৯, বাংলাদেশ-৯৬/৩
(বাংলাদেশ ৭ উইকেটে জয়ী)
ওভার কমে ২১এ আসা ম্যাচে একশর আগেই বারমুডাকে আটকে ফেলে টাইগাররা। রাজ্জাক ৩টি, মাশরাফী-সাকিব ২টি করে উইকেট নেন। সৈয়দ রাসেল ও রফিক একটি করে উইকেট নিয়ে তাদের যোগ্য সঙ্গ দেন। জবাব দিতে নেমে ২১ বল আর ৭ উইকেট অক্ষত রেখে বৃষ্টি আইনে জয় তুলে ফেরে বাংলাদেশ। সাকিব ২৬ ও আশরাফুল ২৯ রানে অপরাজিত থেকে পোর্ট অব স্পেনে জয় তুলে নেন। ম্যাচ সেরা হন ২ চারে ৩২ বলে ২৯ করা আশরাফুল।
৫. প্রতিপক্ষ সাউথ আফ্রিকা (৭এপ্রিল, ২০০৭)
বাংলাদেশ-২৫১/৮, সাউথ আফ্রিকা-১৮৪/১০
(বাংলাদেশ ৬৭ রানে জয়ী)
এবারের ইতিহাস প্রভিডেন্সে, সুপার এইটের লড়াই গ্রায়েম স্মিথের আফ্রিকার বিপক্ষে। শুরুতে ব্যাট করে তামিম ৩৮, আফতাব ৩৫, মাশরাফী ২৫ ও মোহাম্মদ আশরাফুলের ৮৭ রানে আড়াইশ পেরোনো সংগ্রহ গড়ে বাংলাদেশ। ১২ চারে ৮৩ বলে ৮৭ রানের ঝলমলে ইনিংস উপহার দের আশরাফুল। জবাব দিতে নামা প্রোটিয়াদের দুইশর আগেই গুটিয়ে দেন সাকিব-রাজ্জাকরা। রাসেল ও সাকিব নেন ২টি করে উইকেট, ৩ উইকেট যায় ধারাবাহিক রাজ্জাকের দখলে। ম্যাচ বদলে দেয়া ফিফটির জন্য ম্যাচসেরা আশরাফুল।
৬. প্রতিপক্ষ আয়ারল্যান্ড (২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১১)
বাংলাদেশ-২০৫/১০, আয়ারল্যান্ড-১৭৮/১০
(বাংলাদেশ ২৭ রানে জয়ী)
ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ, ভারত ও শ্রীলঙ্কার সাথে যৌথ আয়োজক বাংলাদেশ। প্রত্যাশার চাপও প্রবল। ভারতের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করার পর মিরপুরে আয়াল্যান্ডকে হারিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় সাকিব আল হাসানের দল। শুরুতে ব্যাট করে দুইশ পার করে টাইগাররা। তামিম ৪৪, মুশফিক ৩৬, রাকিবুল ৩৮ ও নাঈমের ২৯ রানে চ্যালেঞ্জিং সংগ্রহ পায়। জবাব দিতে নামা আইরিশদের পাঁচ ওভার আগেই দুইশর নিচে গুটিয়ে দেন শফিউল-সাকিবরা। পেসার শফিউল ইসলাম ৮ ওভারে এক মেডেনে মাত্র ২১ রানে ৪ উইকেট নেন। ২টি করে উইকেট নেন সাকিব ও আশরাফুল। ম্যাচসেরার পুরস্কার ওঠে ৭ চারে ৪৩ বলে ৪৪ করা তামিমের হাতে।
৭. প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড (১১মার্চ, ২০১১)
ইংল্যান্ড-২২৫/১০, বাংলাদেশ-২২৭/৮
(বাংলাদেশ ২ উইকেটে জয়ী)
চট্টগ্রামে সেদিন আরেক দৈত্য বধের ইতিহাস লেখা হয়। বাংলাদেশ প্রথমবার হারায় ইংল্যান্ডকে। শুরুতে ব্যাট করা ইংলিশরা সোয়া দুইশ রান তোলে। নাঈম, রাজ্জাক ও সাকিব ২টি করে উইকেট নিয়ে তাদের বেধে ফেলেন। শফিউল-রুবেল-রিয়াদ একটি করে উইকেট নিয়ে যোগ্য সঙ্গ দেন। জবাব দিতে নেমে ৬ বল আর ২ উইকেট অক্ষত রেখে জয়ে নোঙর ফেলে স্বাগতিকরা। তামিম ৩৮, সাকিব ৩২ ও ইমরুল ৬০ রান করে পথে রাখেন দলকে। তারপরও ১৬৯ রানে অষ্টম উইকেট পড়ে গেলে শঙ্কা জেগেছিল। সেখান থেকে মাহমুদউল্লাহ ও শফিউল অবিচ্ছিন্ন ৫৮ রানের জুটিতে ম্যাচ বের করে আনেন। মাহমুদউল্লাহ ২১ ও শফিউল ২৪ বলে ২৪ রানে অপরাজিত থাকেন। ম্যাচসেরা ইমরুল ৫ চারে ১০০ বলে খেলেন ৬০ রানের ইনিংস।
৮. প্রতিপক্ষ নেদারল্যান্ডস (১৪ মার্চ, ২০১১)
নেদারল্যান্ডস ১৬০/১০, বাংলাদেশ-১৬৬/৪
(বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী)
চট্টগ্রামেই আসে ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ আসরের তৃতীয় জয়টি। রাজ্জাকের ৩ উইকেট, সাকিব-রুবেল-সোহরাওয়ার্দীর একটি করে উইকেটে দেড়শর পরপরই অলআউট হয়ে যায় ডাচরা। জবাব দিতে নেমে ৬ উইকেট আর ৫২ বল অক্ষত রেখেই জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। অপরাজিত ফিফটি করে আবারও ম্যাচসেরা ইমরুল কায়েস। তার ৭৩ রানের ইনিংস ৬ চারে ১১৩ বলে সাজানো। এছাড়া জুনায়েদ সিদ্দিকী ৩৫ ও শাহরিয়ার নাফিস ৩৭ রানের অবদান রাখেন।
৯. প্রতিপক্ষ আফগানিস্তান (১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫)
বাংলাদেশ-২৬৭/১০, আফগানিস্তান-১৬২/১০
(বাংলাদেশ ১০৫ রানে জয়ী)
টাইগারদের সেরা সাফল্যের বিশ্বকাপ। সেবার অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড আসরে কোয়ার্টার ফাইনালে খেলে বাংলাদেশ। আসে তিন জয়। যার প্রথমটি ক্যানবেরায়। শুরুতে ব্যাট করে প্রায় সবার অবদানে আড়াইশ পেরোনো সংগ্রহ পায় বাংলাদেশ। এনামুল ২৯, তামিম ১৯, সৌম্য ২৮, মাহমুদউল্লাহ ২৩ রানের অবদান রাখেন। বড় অবদান ফিফটি করা সাকিব ও মুশফিকের। ৬ চার ও এক ছক্কায় ৫১ বলে ৬৩ করে ফেরেন সাকিব। মুশফিক সমান চার-ছক্কায় ৫৬ বলে ৭১ করেন। জবাব দিতে নামা আফগানদের গুড়িয়ে দিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন অধিনায়ক মাশরাফী। সাকিব আল হাসান নেন ২ উইকেট। ম্যাচসেরা দুর্দান্ত ফিফটি করা মুশফিক।
১০. প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড (৫ মার্চ, ২০১৫)
স্কটল্যান্ড-৩১৮/৮
বাংলাদেশ-৩২২/৪
(বাংলাদেশ ৬ উইকেটে জয়ী)
নেলসনে সেদিন টাইগারদের কাঁপিয়ে দিয়েছিল স্কটিশরা। ৩১৯ রানের লক্ষ্য। তাসকিন ৩ ও নাসিরের ২ উইকেটের পরও বড় লক্ষ্য গড়ে তারা। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেরা রানতাড়ার দিনে ১১ বল আর ৬ উইকেট অক্ষত রাখে আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ। ভিত গড়ে দিয়ে যান ১০০ বলে ৯৫ করা তামিম। মাহমুদউল্লাহ ৬২, মুশফিক ৬০ রানে দলকে পথে রাখেন। পরে অবিচ্ছিন্ন ৬৬ রানের জুটিতে ম্যাচ শেষ করে আসেন সাকিব ও সাব্বির। সাকিব ৪১ বলে ৫২ আর সাব্বির ৪০ বলে ৪২ রানে অপরাজিত থাকেন। এই ম্যাচে বাংলাদেশের কেউ ম্যাচসেরা হননি। স্কটিশদের কাইল কোয়েটজার ১৫৬ রানের ইনিংস খেলেছিলেন, ১৭ চার ও ৪ ছক্কায় ১৩৪ বলের সেই ইনিংসটি ম্যাচসেরা হয়।
১১. প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড (৯ মার্চ, ২০১৫)
বাংলাদেশ-২৭৫/৭, ইংল্যান্ড-২৬০/১০
(বাংলাদেশ ১৫ রানে জয়ী)
অ্যাডিলেডে আরেকটি ঐতিহাসিক ক্ষণ। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে যাত্রা। ৮ রানের মধ্যে তামিম-ইমরুলকে হারানোর পর সৌম্য (৪০) ও মাহমুদউল্লাহর ৮৬ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু। পরে মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহর ১৪১ রানের প্রতিরোধ, যেটা তখনকার দেশি রেকর্ড বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ জুটির। মুশফিক ৮ চার ও এক ছক্কায় ৭৭ বলে ৮৯ রানে ফেরেন। তবে মাহমুদউল্লাহ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরি তুলেই থামেন। ৭ চার ও ২ ছক্কায় ১৩৮ বলে ১০৩ রানের ইনিংস খেলে রানআউট হয়ে ফেরেন। ইংলিশরা জবাব দিতে নামলে শুরুতে প্রতিরোধ গড়লেও সময়ের সাথে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় বাংলাদেশ। ২টি করে উইকেট নেন তাসকিন ও মাশরাফী। বলে আসল ঝড়টা তোলেন রুবেল হোসেন, এ পেসার ৫৩ রানে ৪ উইকেট নেন। ম্যাচসেরা হন শতক করা মাহমুদউল্লাহ।
১২. প্রতিপক্ষ সাউথ আফ্রিকা (২ জুন, ২০১৯)
বাংলাদেশ-৩৩০/৬, সাউথ আফ্রিকা-৩০৯/৮
(বাংলাদেশ ২১ রানে জয়ী)
ওভালে নিজেদের ওয়ানডে ইতিহাস ও বিশ্বকাপের সেরা সংগ্রহের রেকর্ড গড়ে বড় চ্যালেঞ্জই ছুঁড়ে দেয় বাংলাদেশ। সৌম্য সরকারের ৩০ বলে ৪২ রানের ঝড়ো মঞ্চে সাকিব ও মুশফিক ১৪২ রানের নতুন বিশ্বকাপ রেকর্ড জুটি আনেন টাইগারদের জন্য। ৮ চার ও এক ছক্কায় ৮৪ বলে ৭৫ রানে ফেরেন সাকিব। মুশফিকের ৮০ বলে ৭৮ রানের ইনিংস, ৮ চারে। পরে মিঠুন ২১ ও মোসাদ্দেক ২৬ রানের ছোট ইনিংস দিয়ে গেলেও ৩৩ বলে ৪৬ রানের অপরাজিত ক্যামিও দেন মাহমুদউল্লাহ। জবাব দিতে নেমে সাউথ আফ্রিকা মূহমূহ হুঙ্কার ছুঁড়েছে। কিন্তু ম্যাচ বগলদাবা করে মাঠে ছাড়ে টাইগাররাই। ৩ উইকেট নিয়ে সেরা মোস্তাফিজ, ২ উইকেট সাউফউদ্দিনের। আর ম্যাচসেরা সাকিবের বোলিং ফিগার- ১০ ওভারে ৫০ রানে এক উইকেট, সঙ্গে ঝলমলে ফিফটি।








