কিছুদিন পরপরই মৃত্যুর গভীর বিষাদ, বিভীষিকা নেমে আসে দেশটিতে। যেখানে প্রতিক্ষণ মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়েই চলতে হয় নাগরিকদের। তালেবান আর ইসলামিক স্টেট-আইএস জঙ্গি গোষ্ঠীর প্রতিনিয়ত হামলাই সেখানকার স্বাভাবিক ঘটনা!
এমন নিয়তিই যেন মেনে নিয়েছেন আফগানিস্তানের অধিবাসীরা। তাতে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজনদের ভোগান্তি (!) কিছুটা হলেও কমেছে। এখন তারা পকেটে রাখছেন নিজেদের পরিচয়, বৃত্তান্ত। আত্মঘাতী বিস্ফোরণ, হামলায় করুণ মৃত্যু হলেও যেন লাশটি অত্যন্ত শনাক্ত করা যায়। লাশের খোঁজে যেন হয়রানী পোহাতে না হয় পরিবার-পরিজনদের। এটাই এখন অনেক আফগানের জীবনের শেষ চাওয়া হয়ে উঠেছে।
বলতে গেলে ইরাক-সিরিয়ায় পরাজিত আইএস এখন অনেক বেশি সক্রিয় আফগানিস্তানে। এছাড়াও আগে থেকে থাকা তালেবানসহ নানান নামে জঙ্গি গোষ্ঠিগুলো তো রয়েছেই। যাদের হামলায় নতুন বছরের পুরো মাস শেষ হওয়ার আগেই দেশটিতে নিহত হয়েছে ১ হাজারেরও বেশি মানুষ।
পকেটে পরিচয়পত্র রাখা নিয়ে এই প্রতিবেদনটি আল জাজিরায় প্রকাশ করেছে সোমবার। ঠিক এইদিনেই আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে সেখানে। কাবুলের মিলিটারি একাডেমিতে চালানো এই হামলায় দুই সেনা সদস্য নিহত হয়। আহত হয়েছে আরো ১০ জন।
নিরাপত্তাহীনতা-অনিশ্চয়তায় থাকা অন্যান্য আফগানদের মতোই মুজিবুল্লাহ দাসতিয়ারও (২৮) চরম হতাশ। বিশেষ করে রাজধানী কাবুলে শনিবারের ভয়াবহ-রক্তাক্ত হামলার পর তিনি যেন আশার সব আলো হারিয়ে ফেলেছেন। তালেবানের দায় স্বীকার করা সেই হামলায় শতাধিক ব্যক্তি নিহত হয়। আহত হয় ২৩৫ জন।

সরকারি কর্মচারী মুজিবুল্লাহ তার পকেটে সবসময় একটি টুকরো কাগজ রাখেন। যেখানে তার ফোন নম্বর, রক্তের গ্রুপ এবং কর্মস্থলের ঠিকানা লেখা রয়েছে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আমি যদি আহত হই বা মারা যাই, ডাক্তাররা অন্তত আমার সম্পর্কে সব তথ্য পাবে।
“শনিবারের সেই হামলার পর অনেকেই নিখোঁজ ছিলেন। স্বজনেরা তাদের খুঁজছিলেন। আমার এক বন্ধুও নিখোঁজ ছিল এবং সে কোন হাসপাতালে রয়েছে বা আদৌ বেঁচে আছে কিনা জানতে সামাজিক মাধ্যমের সাহায্য নেই।”
শহরে বিরাজমান তীব্র নিরাপত্তাহীনতার কারণে মুজিবুল্লাহ সবসময়ই বাবা-মার সাথে যোগাযোগ রাখেন। তার বাবা-মা দেশের বাইরে থাকেন। “কোথায় আছেন, কেমন আছেন, এখনও যে বেঁচে আছেন” তাই উদ্বিগ্ন পরিবারকে জানাতে হয়।
“কিন্তু আমি জন্মের পর থেকেই এই যুদ্ধ দেখে আসছি। তাই আমার মনে হয় আমি সবকিছুর জন্যই প্রস্তুত। এভাবেই আমি নিজেকে শক্ত করেছি।”
শনিবারের হামলার পর থেকেই শহর জুড়ে সাইরেনের শব্দ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ফজিলা শাহেদি (২০) রাজধানীতেই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।
তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের শব্দ শুনলেই আতঙ্কিত হই। সেই রক্তাক্ত বিস্ফোরণের কথা মনে পড়ে।

শাদেহিও তার সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসহ কাগজের টুকরা নিজের কাছে রাখেন। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, আমি একটি কাগজ আমার ব্যাগে এবং অারেকটি আমার জ্যাকেটের পকেটে রাখি। যদি হামলার কারণে একটি কাগজ নষ্ট হয়ে যায় তাহলে অত্যন্ত আরেকটি ঠিক থাকবে।
শাহেদি বলেন, কেউ জানে না আমি কি আগামীকালকের কোনো আত্মঘাতী হামলায় মারা যাবো কিনা, কমপক্ষে এই নোট থেকে আমার পরিবার, বন্ধুরা আমার মরদেহটি পাবে।
“রুম থেকে বের হয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, আমি ফিরে আসবো, না আসবো না? আমার বয়স খুব কম, আমি এখনই মরতে চাই না।”
কাবুলের আরেক অধিবাসী নাম প্রকাশ না করে বলেন, তিনিও কাগজ-কলম রাখেন। ২৫ বছর বয়সী এই তরুণ আল জাজিরাকে বলেন, আমি অসুস্থবোধ করলেই, তা ডায়েরিতে লিখে রাখি।
“কাবুলের বর্তমান অবস্থা দেখে মনেহয়, বাঁচবো কিনা। গতকাল রাতে একদমই ঘুমাতে পারিনি। তাই ভেবেছি, আমার ডায়েরির প্রথম পাতায় একটি নোট লিখে রাখবো। অনুরোধ করবো, যেন আমার মৃত্যুর পর ডায়েরিটা যিনি পাবেন, তিনি যেন লেখাগুলো না পড়েন।”
মৃত্যুর পর তার মরদেহ যেন কাবুল মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দিয়ে দেওয়া হয় তাও পরিবারকে জানিয়ে রেখেছেন তিনি।
প্রায় ৫০ লাখ মানুষের বসবাস কাবুলে। শনিবারের আত্মঘাতী হামলায় কেঁপে উঠেছিল শহরটির কেন্দ্রস্থল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভবন, স্কুল, সরকারি অফিস ও হাসপাতালের পাশেই চালানো হয় হামলাটি। বিস্ফোরক ভর্তি একটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে জঙ্গিরা।
শনিবারের ওই হামলা যেন জাগিয়ে তোলে গত বছরের ৩১ তারিখের ভয়াবহ হামলার স্মৃতি। শনিবারের হামলাস্থলের এক কিলোমিটারের মধ্যেই সেই হামলাটিও চালানো হয়েছিল। কাবুলের কূটনৈতিক এলাকায় ট্রাক বোমা দিয়ে চালানো সেই হামলায় কমপক্ষে দেড়শো মানুষ নিহত হয়। যা এখন পর্যন্ত রাজধানীতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। সেই হামলার দায় আজ পর্যন্তও কেউ স্বীকার করেনি।
সাবেক এক গোয়েন্দা এবং সামরিক কর্মকর্তা কোহিস্তানি বলেন, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেই ত্রুটি রয়েছে। সব সময়ই একটি অভ্যন্তরিণ লিঙ্ক থাকে যা সন্ত্রাসীদের এই হামলার পরিকল্পনায় সাহায্য করে।
“প্রতিবার হামলায় তারা ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। যেমন এবারে তারা একটি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করেছে। যা একেবারেই অপ্রত্যাশিত।”
দেশজুড়ে এই হামলাগুলো পুলিশসহ নিরাপত্তা বাহিনীকেও ছাড় দেয় না। কোহিস্তানি বলেন, বর্তমান হুমকি তাদের সক্ষমতার ঊর্ধ্বে।

“প্রায় প্রতিদিনই পুলিশকে হত্যা করা হচ্ছে। যে পুলিশ সদস্যদের খুব কম বেতন দেয়া হয়। তাদের পরিবারকেও বলার মতো কোনো নিরাপত্তা দেওয়া হয় না। ক্রমবর্ধমান হামলা ও সন্ত্রাসকে মোকাবিলার জন্য তাদের সক্ষমতাও প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ানো হয়নি।”
এরই মধ্যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে চাপের মুখে রয়েছে প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির সরকার। কিন্তু তালেবান ও আইএস হামলা কমছে না।
সোমবারের হামলা ছাড়া গত সাতদিনেই আফগানিস্তান জুড়ে কমপক্ষে ২০০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। কড়া নিরাপত্তা বেষ্টিত ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের ২১ জানুয়ারির হামলায় ২০ জনেরও বেশি নিহত হয়। তালেবান সেই হামলার দায় স্বীকার করে।
জানুয়ারির ২৪ তারিখে কথিত আইএস জালালাবাদ শহরের সেভ দ্য চিলড্রেনের অফিসে কমপক্ষে ৩ জনকে হত্যা করে।
স্থানীয় গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, জানুয়ারি, ২০১৮ তেই কমপক্ষে ১ হাজার আফগান নিহত হয়।
দাসতিয়ার বলেন, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল এবং কূটনৈতিক এলাকাতেও যখন হামলা হয়, তা আমাদেরই খুব অরক্ষিত করে দেয়। এমনকি আমাদের বাড়িতেও আমরা নিরাপদবোধ করি না। অবশ্যই আমাদের যথাযথ নিরাপত্তা নেই। এতে তালেবান ও আইএস-এর জন্য হামলা চালানো খুব সহজ করে দিয়েছে।
আফগান গোয়েন্দা কর্মকর্তারা হামলার জন্য প্রায়ই তালেবান সংশ্লিষ্ট হাক্কানি নেটওয়ার্ককে দায়ী করে। এই গোষ্ঠি পাকিস্তানের ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই) এর সহায়তায় পরিচালিত হয় বলে তাদের বিশ্বাস।
জানুয়ারির শুরুতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানকে সহায়তা বন্ধের নির্দেশ দেন। পাকিস্তান মিথ্যাচার করছে এবং আফগানিস্তানে সন্ত্রাস নির্মূলে সহায়তা করছে না বলে অভিযোগ তুলেন তিনি। পাকিস্তান বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে।
কোহিস্তানি বলেন, পাকিস্তান যদি এই সন্ত্রাসীদের সমর্থন করা বন্ধ না করে, তবে আফগানিস্তানে এমন হামলা থামবে না। যথাযথ কৌশল অবলম্বন এবং সন্ত্রাসকে সম্পূণ নির্মুলে পাকিস্তানের সাথে আমাদের ভালো সম্পর্কও নিশ্চিত করতে হবে।








