সহকর্মী কাইয়ুম তুহিন তার ফেসবুক ওয়ালে একটা আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। ‘স্বপ্নের যৌথপরিবার ও আমি’ শিরোনামে ওই স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, তার দ্বিতীয় সন্তান জন্মের পরেই একটা জটিল সমস্যায় আক্রান্ত হয় এবং যার একমাত্র চিকিৎসা অস্ত্রোপচার।
আমাদের মতো মধ্যবিত্ত বা তারও চেয়ে আরেকটু নিচে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের লোকেদের ঘাড়ে যখন কোনো অপারেশনের বোঝা চেপে বসে, সেই পরিস্থিতি সামাল দেয়া যে কঠিন, তা যারা এই বাস্তবতার ভেতর দিয়ে কখনো যাননি, তাদের পক্ষে উপলব্ধি করা আদৌ সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় সন্তান জন্মের সময় স্বভাবতই হাসপাতালে অনেক পয়সা খরচ হয়েছে এবং এরপরে পকেট মোটামুটি শূন্যও থাকার কথা। এরকম রূঢ় বাস্তবতায় নবজাতকের অপারেশনের জন্য যদি আরও হাজার পঞ্চাশেক টাকার ফেড়ে পড়তে হয়, তখন উপায় ধারকর্জ কিংবা জমি বিক্রি (যদি জমি থাকে)।
কাইয়ুম তুহিন লিখেছেন, এই কঠিন বাস্তবতায় তিনি যখন চিন্তিত, সন্তানের শরীর নিয়ে উদ্বিগ্ন…তখন তার পাশে দাঁড়িয়েছে যৌথ পরিবার।
‘হঠাৎ করেই কেন যেন নিজেকে বড় একা একা লাগতে শুরু করলো। আর এই একা থাকাটা আমাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছিলো। যাদের সাথে চলি তারা সবাই চাকরি করে। তাই বারবার নিজের সমস্যাগুলো শেয়ার করে তাদের বাড়তি ঝামেলায় ফেলতে মন চাচ্ছিলো না। সাথে অপারেশনের খরচের টাকার দুশ্চিন্তা। আমরা চার ভাই ও চার বোন। আর আমার বাবা-মায়ের নাতি-নাতনি ২২ জন। ২২ নম্বর জায়গাটা পূরণ করেছে আমার ছেলে। সব মিলিয়ে একটা বিশাল পরিবার। সন্তানের অসুস্থতার কথা শুনে ছুটে আসেন সবাই। আমার ছেলেকে ঘিরে বসে আছে গোটা তিরিশেক মানুষ। বউয়ের কাছে জানতে চাইলাম খাবারের ব্যবস্থা কী হবে। বড় আপা বললো, এই চিন্তা তোমাকে করতে হবে না। সব ব্যবস্থা করেই এসেছি। একে একে সবাই তাদের সামর্থ্য মতো আমার হাতে টাকা দিতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখি আমার শূন্য হাত পূর্ণতা পেলো অন্তত লাখ টাকায়। সবার একই বক্তব্য, মাস হলো না বউ এর সিজার গেলো, কোরবানি গেলো, তোর হাততো শূন্য। তাই হাতে যা ছিলো নিয়ে আসলাম। আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছি একেকটি মানুষের দিকে। সারা রাত কেটে গেলো গল্প-আড্ডা আর সন্তানের দোয়া কামনায়।’
তুহিন লিখেছেন, ‘একটা সময় বড় পরিবার নিয়ে মা-বাবাকে কত কিছুই না বলতাম। এর জন্য আজ স্যরি বলছি বাবা-মা। সত্যিই একটা স্বপ্নের মতো পরিবার তোমরা উপহার দিয়ে গেলে।’
কাইয়ুম তুহিনের এই স্বপ্নের যৌথ পরিবার আমাদের সবারই ছিল। কিন্তু আমাদের নাগরিকবোধ, আত্মকেন্দ্রিকতা, স্বার্থপরতা, তথাকথিত আধুনিকতা ইত্যাদি নানাবিধ কারণ ভেঙে দিয়েছে সেই যৌথখামার। এখন চাচা ফুপু দূরে থাক, বাবা মাও একা থাকেন। কালেভদ্রে চাচা চাচিদের সঙ্গে দেখা হয়। আমার আপন ছোট বোন ঢাকায় থাকে। ওদের বাসা থেকে আমার বাসার দূরত্ব ৫ কিলোমিটারের বেশি নয়। কিন্তু ওর সাথে আমার সবশেষ দেখা হয়েছে তাও প্রায় ছয় মাস।
এটা তো ঢাকার চিত্র। গ্রামের অবস্থাও কি খুব ভালো? খোঁজ নিয়ে দেখবেন, আপনার শৈশবে যেভাবে আপনার আত্মীয়-স্বজন একসাথে থাকতেন, তারা এখন মোটামুটি সবাই আলাদা। কেউই কারো সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবন শেয়ার করতে চায় না।
ঘরের যে সন্তান ভালো চাকরি করে, সে চায় না তার ছোট ভাই যে কিনা বেকার অথবা তুলনামূলক কম আয় করে, তার সাথে তার খুব ভালো সম্পর্ক থাকুক। কারণ ভালো সম্পর্ক থাকা মানেই বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়াতে হবে। গাঁটের পয়সা খরচ করতে হবে। তার চেয়ে ভালো একা একা থাকা।
কিন্তু এই একা একা থাকা, নিজের মতো করে ভালো থাকার চূড়ান্ত পরিণতি আসলে নিঃসঙ্গতা। মানুষ খুব সুখে-শান্তিতে থাকলেও একটা বিপন্ন বিস্ময় তার অন্তর্গত রক্তের ভেতরে খেলা করে। একটা সময় গিয়ে তার মনে হয়, আহা মানুষইতো সব। সে তখন সঙ্গ চায়। কিন্তু একাকী জীবনে অভ্যস্ত, যারা নিজের মতো করে ভালো থাকতে চায়, তারা জীবনের কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুঃসময়ে সঙ্গ দেয়ার মতো কাউকে হয়তো পায় না। কিন্তু যৌথ পরিবার মানুষকে একা হতে দেয় না। তাকে ভরসা জোগায়। যার পকেটে এক হাজার টাকাও নেই, তারও পকেট পূর্ণ হয়ে উঠতে পারে লাখ টাকায়।
মোটরসাইকেলের বায়না মেটাতে না পারায় সন্তানের দেয়া আগুনে বাবার মৃত্যু কিংবা বকুনি খেয়ে মাকে মেরে ফেলার মতো নৃশংসতার এই অস্থির সময়ে আমরা মনে করতে পারি, শৈশবে আমরা দেখেছি সংসারে কোনো সমস্যা তৈরি হলে বৃহৎ পরিবারের অভিভাবক হিসেবে দাদা সবাইকে নিয়ে বসতেন। তিনি যা বলতেন তার উপরে কথা বলার দুঃসাহস কারো ছিল না। দাদার গলা খাকানিতেই বাপ চাচাদের পেটের ভাত হজম হয়ে যেত। কিন্তু এখন পরিবারে মুরুব্বি কোথায়? মুরুব্বি হয়ে গেলে তার স্থান বৃদ্ধনিবাস।
সন্তানেরা নিজেদের মতো করে ভালো থাকে।
ভোগবাদী মানসিকতা শিথিল করে দিচ্ছে সম্পর্কের বন্ধন। সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর নির্ভরশীল সম্পর্কগুলোও হয়ে উঠছে অপরিচিত। সবচেয়ে কাছের মানুষ বাবা মাকে খুন হতে হচ্ছে প্রিয় সন্তানের আগুনে, ছুরিতে। যে সন্তানকে পৃথিবীতে আনতে বাবা মা জীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন।
নাগরিক জীবন আমাদের একা একা ভালো থাকতে শিখিয়েছে। কিন্তু তার বিনিময়ে আমাদের সে দিয়েছে যান্ত্রিকতা, ব্যস্ততা, ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটে ছুটে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক ইত্যাদি ইত্যাদি। ‘এই বেশ ভালো আছি’ স্বান্তনায় আমরা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে শুনি, পাশের ফ্ল্যাটের একজন অসুস্থ। অ্যাম্বুলেন্স খবর দেয়া হয়েছে। কিন্তু দরজা খুলে তার বাসায় যাওয়ার সময় আমার নেই। কারণ কাল মর্নিং অফিস। একটু আগেভাগে ঘুমাতে হবে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








