‘‘সাবিহা বাবুজীর কথা শুনে আনন্দে মোহিত হয়ে নিজেকে সামলাতে পারছে না। … এবার হাত ছাড়ুন, পানি খাবেন বললেন।
কায়সার হাত না ছেড়ে গালে চেপে ধরে বলল, আপনার নরম হাতের ছোঁয়ায় ও আপনার মধুর কণ্ঠের কথা শুনে এবং সর্বোপরি আপনার রূপসুধা পান করে আমার পিয়াস মিটে গেছে। সত্যি, যিনি আপনার নাম রেখেছেন তিনি ধন্য। আপনার নামের অর্থ নিশ্চয়ই জানেন?
সাবিহা আরো বেশী লজ্জা পেয়ে কথা বলতে পারল না। কেঁপে উঠে না সূচক মাথা নাড়ল। কায়সার বলল, সাবিহা অর্থ সৌন্দর্যময়ী। আল্লাহ্ পাক সত্যি সত্যি আপনাকে সৌন্দর্যের রানী করে তৈরী করছেন। আপনার নাম সার্থক।
বাবুজীর কথা শুনতে শুনতে সাবিহা ক্রমশ লজ্জা বেশী পেয়ে মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে। সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। কোন রকমে বলল, প্লীজ ছাড়ুন। বাবার নামাজ পড়া হয়তো এতক্ষণে শেষ হয়েছে, এবার এসে পড়বে। কায়সার তার দুটো হাতের তলায় চুমো খেয়ে ছেড়ে দিয়ে বলল, আল্লাহ্ তুমি আমার মনের বাসনা পূরণ করো।’’
উল্লিখিত বর্ণনাটুকু আলোচিত লেখক কাসেম বিন আবুবাকার রচিত ‘পাহাড়ি ললনা’ নামক উপন্যাসের। ভদ্রলোক এমন জাতের প্রেম-কাহিনি লিখে প্রায় তিন দশক ধরে গ্রামগঞ্জে ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি লিখেছেন অজস্র, তার পাঠকও আছে অসংখ্য। কিন্তু তাকে নিয়ে, তার লেখা বই নিয়ে গণমাধ্যমে কখনও আলোচনা হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি তিনি ব্যাপক আলোচিত হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন প্রধান আলোচ্য বিষয় কাসেম বিন আবুবাকার। আমাদের সর্বশেষ ইস্যু বা হুজুগ।
আকস্মিকই যুক্তরাজ্যের শীর্ষ সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল, মার্কিন সংবাদমাধ্যম ইয়াহু নিউজ, মধ্যপ্রাচ্যের আরব নিউজ, মালয়েশিয়ার দ্য স্টার ও মালয়মেইল, পাকিস্তানের দ্য ডন, ফ্রান্সের ফ্রান্স টুয়েন্টি ফোর ও রেডিও ফ্রান্স ইন্টারন্যাশনাল, হাঙ্গেরির হাঙ্গেরি টুডেসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ফলাও করে কাসেমকে নিয়ে প্রতিবেদন ছেপেছে। এএফপি’র বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রিন্ট ও অনলাইন মিডিয়া সে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এ খবর প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলছে তোলপাড়। নিজের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে কাসেম বিন আবুবাকার গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘মেয়েরা আমাকে নিজেদের রক্ত দিয়ে লেখা চিঠি পাঠায়। অনেকে আবার আমাকে বিয়ে করার জন্য পাগল!’ নানা কারণে কাসেম বিন আবুবাকার জনপ্রিয় হয়েছেন।
এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেক্যুলার লেখকরা এমন এক দুনিয়ার গল্প বলেছে, যেখান থেকে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রধান অংশের গ্রামীণ ও ধর্মীয় জীবনের অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছে। কাসেম এ শূন্যতার বিষয়টি অনুধাবন করে তার উপন্যাসের বাজার গড়ে তুলেছেন। এছাড়া কাসেমের এ প্রচেষ্টা থেকে নতুন প্রজন্মের অনেক বাংলাদেশি লেখক অনুপ্রাণিত হয়ে সমকালীন ‘ইসলামী উপন্যাস’ লিখে সাফল্যের পথ খুঁজে পেয়েছেন। এদের মধ্যে আবদুস সালাম মিতুল, কাউসার আহমেদ এবং আবদুল আলিমের মতো লেখক উল্লেখযোগ্য।
জবাবে কাসেম বিন আবুবাকার নিজেই বিবিসিকে বলেছেন যে, ইসলামী ভাবধারায় এই মূল্যবোধ-নির্ভর সাহিত্যই তার পাঠকপ্রিয়তার আসল রহস্য বলে মনে করেন তিনি। তবে এই মন্তব্যের সঙ্গে মোটেও একমত নন ইসলামপন্থীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় মাসিক মদিনা পত্রিকার সম্পাদক আহমদ বদরুদ্দিন খান। তিনি বলেছেন, “উনার একটা উপন্যাস ‘বোরকা পড়া সেই মেয়েটি’। মেয়েটিকে বোরকা পড়িয়েছেন পাশাপাশি মেয়েটিকে তিনি এমন প্রেমে জড়িয়েছেন তার গল্পের মাধ্যমে সেটা ইসলামে অবৈধ। প্রেম নামে যে জিনিসটাকে ইসলামী মোড়কে তুলে আনছেন সেটা আপত্তিজনক। …এই বইটি একটু পড়ে মনে হয়েছে এটি রুচিসম্মত না।’’
তার বইয়ের নামগুলোও বেশ মজার। বেশ একটা ‘ম্যাগনেটিক’ ব্যাপার আছে। যেমন-ফুটন্ত গোলাপ, বিদেশী মেম, ক্রন্দসী পিয়া, প্রেমের পরশ, বিলম্বিত বাসর, প্রেম ও স্বপ্ন, তোমার প্রত্যাশায়, পাহাড়ী ললনা, অনন্ত প্রেম, শেষ উপহার, শহরের মেয়ে, বহু রুপিনী, অমর প্রেম, আমি তোমার, ধনীর দুলালী, আধুনিকা, প্রেম বেহেস্তের ফুল, একটি ভ্রমর পাচঁটি ফুল, পল্লী বালা, অবশেষে মিলন, ভালোবাসি তোমাকেই, বালিকার অভিমান, বাসর রাত, অলোকিক প্রেম, সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে, প্রেমের ফসল ইত্যাদি।
প্রেম-রোমান্টিকতা-সুড়ুসুড়ির সঙ্গে একটু ধর্মীয় ‘আদব-লেহাজ’ ও বোলচাল মিশিয়ে তিনি এক নতুন ধরনের সাহিত্য বাজারে চালু করেছেন। যেমন: ‘শফিক বিসমিল্লাহ বলে শফিকুনের ঠোঁটে কিস করা শুরু করলো।’ ‘আপনি শরিফ ঘরের মেয়ে। আপনার জন্য আল্লাহপাক আমাকে কবুল করুন। আমিন।’ ‘রফিকুন বোরখা পরে ডেটিং-এ যায়। কারণ বোরখা ছাড়া ডেটিং নাজায়েয।’ ‘শাকিলা তার স্বামিকে বললো, বাসর রাতে কি করতে হয় আমি জানিনা। আমাকে শিখিয়ে দাও না গো।’ ‘হাততালি দেওয়া ইহুদিদের কাজ। আমরা বলবো মারহাবা, মারহাবা।’ ‘বাসর রাত আল্লাহর নিয়ামত। এই রাতে লজ্জা পেতে নেই গো আমার প্রাণ সজনি।’ ‘শেষমেষ তারা শরিয়ত মোতাবেক স্বামী স্ত্রীর মধুর মিলনে মেতে উঠলো।’ এক শ্রেণির পাঠক-পাঠিকা এই বাণী-বর্ণনা লুফেও নিয়েছে। এখানেই কাসেম সাহেবের সাফল্য।
আসলে সাহিত্যে ‘কোয়ালিটি’ ব্যাপারটা আপেক্ষিক কিন্তু ‘বিজনেস’ ব্যাপারটা ফিক্সড আর এই বিজনেসে কাসেম বিন আবুবাকার অত্যন্ত সফল। বাংলাদেশে ৬৮ হাজার গ্রামে তার সাহিত্যের এক বিশাল বাজার। এই বাজারের কাস্টমাররা ঠিক যে জিনিসটা চায় অর্থাৎ রক্ষণশীলতা নৈতিকতা ও রোমান্সের সংমিশ্রণে এক ‘হচপচ ফ্যান্টাসি’, সেই জিনিসটা তিনি যথাযথভাবে সাপ্লাই দিতে পেরেছেন। এ জন্য তাকে বিজ্ঞাপন দিতে হয়নি, মাশারাফি-সাকিবদের সঙ্গে সেলফিও তুলতে হয়নি। এখানেই কাসেম বিন আবু বাকারের বিশেষত্ব।
অবশ্য দুনিয়াজুড়ে এখন মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে এখন সাহিত্যের দুটো ধারা বিকশিত হচ্ছে। এক, ইসলামিক রোমান্স, আর দুই, ইসলামিস্ট থ্রিলার। ইসলামিক রোমান্স মূলত ইসলামিক আদব-লেহাজ ও পরিভাষা দিয়ে রোমান্টিক গল্প বলে। ইসলামিস্ট থ্রিলার অন্য জিনিস। সেখানে ইসলামী বিপ্লব থাকে, প্রেম থাকে, লেবানন-প্যালেস্টাইন-আফগানিস্তান থাকে, অনেকখানি জেমস বণ্ড স্টাইলে। কাসেম বিন আবুবাকার প্রথম ধারার প্রতিনিধি। দ্বিতীয় ধারাটি বাংলায় বিকশিত হচ্ছে, যদিও অনুবাদপ্রধান। নসীম হিজাযী নামের এক পাকিস্তানি লেখক বাংলাদেশে বিশেষ জনপ্রিয়।
আকস্মিক কাসেম বিন আবুবাকারকে আলোচনার প্রাদপ্রদীপে টেনে আনার পেছেনে বিশেষ উদ্দেশ্য রয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। একদিকে সরকারের হেফাজতমুখী যাত্রা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে কাসেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে প্রতিবেদন ‘ইসলামাইজেশনের’ পথে আমাদের দেশকে এগিয়ে নেয়ার উদ্যোগ বলেই বিশেষজ্ঞমহলের ধারণা।
তবে কাসেম বিন আবুবাকারকে বেশি আলোচনা ও মাতামাতি না করাই ভালো। জনপ্রিয় একজন হতেই পারেন। ‘নরম গরম’, ‘বেদের মেয়ে জোছনা’ ইত্যাদি সিনেমার নায়িকা অঞ্জু ঘোষ এক সময় সারাদেশে অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। আমাদের দেশে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এখনও গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু গ্রামের মানুষ ড. জাফর ইকবালকে চেনে না! তাই বলে কি জাফর ইকবালকে এখন সাঈদীর মতো হতে হবে?
ছোটবেলায় দেখেছি ফাল্গুনী ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের বই গ্রামেগঞ্জে খুব চলত। বড় হয়ে কোনো বোদ্ধার কাছে এই দুজনের নাম কখনও শুনিনি। আবার অমিয়ভূষণ মজুমদার, সতীনাথ ভাদুড়ির নাম বহু সাহিত্য বোদ্ধার মুখে শুনলেও সাধারণ পাঠকরা তাদের চেনে না।
কাশেম বিন আবুবাকারের বই বাংলাদেশের এক শ্রেণির পাঠক পড়তেই পারে। এ নিয়ে হৈচৈ করার কিছু আছে বলে মনে হয় না। যে যার ইচ্ছে, রুচি অনুযায়ী লিখবে, পড়বে। এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্রের কথাটি স্মরণ করা যেতে পারে:
‘‘মিথ্যা শুধু মানুষের বুঝিবার এবং বুঝাইবার ফলটা। সোনাকে পিতল বলিয়া বুঝানও মিথ্যা, বুঝাও মিথ্যা, তাহা জানি। কিন্তু তাহাতে সোনারই বা কি, আর পিতলেরই বা কি আসে যায়। তোমরা যাহা ইচ্ছা বুঝ না, তাহারা যা তাই ত থাকে। সোনা মনে করিয়া তাহাকে সিন্দুকে বন্ধ করিয়া রাখিলেও তাহার সত্যকার মূল্যবৃদ্ধি হয় না, আর পিতল বলিয়া টান মারিয়া বাহিরে ফেলিয়া দিলেও তাহার দাম কমে না। সেদিনও সে পিতল, আজও সে পিতলই। তোমার মিথ্যার জন্য তুমি ছাড়া আর কেহ দায়ীও হয় না, ভ্রূক্ষেপও করে না।’’
আমাদের হুজুগটা যেন শুধুই অপ্রয়োজনীয় কাজে। হাতে গোনা কয়েকজন হাওরের মানুষের সাহায্য করার লক্ষ্যে কাজ করছেন, জনমত গঠনের কাজ করছেন। রমেল হত্যার ঘটনা ক্রমশ চাপা পড়ে যাচ্ছে, বিচার চাইতে এগিয়ে এসেছেন মাত্র কয়েকজন।
এসব বিষয় আমাদের কাছে কবে মূল্য পাবে, কবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







