আগে সংবাদ সম্মেলনের সময় যে ধরনের কথা বলতেন, আর এখন যেসব কথা বলেন তাতে বিস্তর পার্থক্য। এই সময়ের নাজমুল হাসান পাপনের কথা শুনলে মনে হয় ‘পোড় খাওয়া’ এক ক্রিকেট বিশ্লেষক তিনি! বেশ বোঝা যায় ক্রিকেট জ্ঞানে নিজেকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছেন। শনিবারের সংবাদ সম্মেলনই তার সবশেষ উদাহরণ।
বাংলাদেশ দলের কোন খেলোয়াড়ের কোথায় শক্তি, কোথায় দুর্বলতা তা যেন নাজমুল হাসানের মুখস্থ। সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে দেরি আছে কিন্তু সভাপতির উত্তর দিতে দেরি নেই। নাসিরের মতো খেলোয়াড়কে নিয়ে এখন আর ‘নেতিবাচক’ কথা বলেন না। বরং যথাযথ সম্মান দিয়ে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন, ‘কার পরিবর্তে তাকে খেলানো হবে? দলের অবস্থা এমন যে নাসিরের মতো পারফর্মারকে বাদ দিতে হচ্ছে!’
রাজনীতিবিদ হিসেবে নাজমুল হাসানকে নিয়ে খুব একটা প্রশ্ন কখনো ওঠেনি। কিন্তু ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হিসেবে নানা কারণে বারবার তিনি আলোচিত। কেউ কেউ সমালোচনা করতেও ছাড়েন না। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই বাংলাদেশের ক্রিকেট আজকের অবস্থানে আসার পেছনে তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ভূমিকা রেখেছে। তার মধ্যে অন্যতম চণ্ডিকা হাথুরুসিংহেকে কোচ করে আনা। এবং তাকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেয়া। দুই স্তরের নির্বাচক কমিটি নিয়ে কম কথা হয়নি। নাজমুল হাসান কারো কথা শোনেননি। কোচের পরামর্শ মেনে ওই কমিটিতে মত দিয়েছেন। সেই মতের প্রভাব কী হবে সে কথা এখনি বলা যাচ্ছে না। তবে স্বীকার করতেই হবে, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি পর্যন্ত দুই স্তরের কমিটি দলের খারাপ খেলার কারণ হয়নি।
‘ইংল্যান্ডে আমরা কত বছর খেলছি না। আমার জানা মতে প্রায় দশ বছরের মতো হয়ে গেছে আমরা সেখানে গিয়ে খেলিনি। মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় লাগবে। অনুশীলন ম্যাচে যে ধরনের মাঠ থাকে, আসল ম্যাচে তার সঙ্গে মিল পাওয়া কঠিন। জানি না কী ধরনের উইকেট হবে। তবে ছেলেরা আগে গেছে। প্রস্তুতি ম্যাচও খেলছে। আশা করি মানিয়ে নিবে।’ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি নিয়ে বলছিলেন নাজমুল।
‘ক্রিকেটটা হচ্ছে টিম গেম। আগে ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ ম্যাচ বের করে নিত। একটা দুইটা ভালো খেলোয়াড় থাকলে হয়ে যেত। এখন কিন্তু খেলাটা বদলে গেছে। এখন সবদিকে সবার ভালো করতে হয়।’ এই যুগের ক্রিকেট নিয়ে নিজের ধারণা দেন বোর্ড সভাপতি।
বাংলাদেশ দলের শক্তি কোথায় সে কথাও জানিয়ে দেন তিনি, ‘আমরা আগে একটা-দুটো খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে থাকতাম। এখন অনেকের স্কিল বেড়েছে। কয়েকজনের ওপর আর নির্ভর করতে হয় না।’
‘আপনারা চিন্তা করে দেখেন সাকিবের চেয়ে ভালো খেলোয়াড় বাংলাদেশে নাই। কিন্তু সাকিবের খেলা এখন চোখেই পড়ে না। তার মানে অন্যরা অনেক ভালো করছে। সাকিব যদি তার আসল ফর্মে ফেরত আসে, তাহলে যেকোনো কিছু ঘটতে পারে,’ বিশ্লেষকের মতো বলতে থাকেন নাজমুল।
দলের কোন পজিশনে কয়জন পাইপলাইনে আছে সে বিষয়েও ওয়াকিবহাল তিনি, ‘রিয়াদের মতো খেলোয়াড়কে এখন ভালো খেলে জায়গা ধরে রাখতে হচ্ছে। তার জায়গায় কমপক্ষে চারজন অপেক্ষায় আছে।’
বাংলাদেশ দল কেন শক্তিশালী হয়েছে তারও ব্যাখ্যা দেন নাজমুল, ‘সাব্বির আসায় শক্তি বেড়েছে। তারপর মোসাদ্দেক। আমি তো মনে করি বাংলাদেশে যে কজন জেনুইন ব্যাটসম্যান আছে, মোসাদ্দেক তাদের একজন। যে পজিশনে, যে সময় খেলতে নামুক ভয় পায় না।’
‘যদি বলেন আমরা কীভাবে এত ম্যাচ জিতলাম, তাহলে বলবো পুরো খেলাটা ঘুরিয়ে দিয়েছে মোস্তাফিজ। বাংলাদেশের খেলার ধরণটা পাল্টে দিয়েছে সে। অনেক নতুন ছেলেকে আমরা পরীক্ষা করেছি। আগেও জিতেছি। কিন্তু ও আসার পরে স্পিন নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি।’
শুধু ক্রিকেটের মৌলিক জ্ঞানই নয়। ক্রিকেট কূটনীতিতেও তিনি পরিপক্ব। তাসকিন, সানির বোলিং অ্যাকশনে ত্রুটি ধরার পর চারদিকে যখন আইসিসির মুণ্ডপাত চলে, নাজমুল তখন নিজেকে ঠাণ্ডা রাখেন। ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের সঙ্গে যখন ঝামেলা তৈরি হয়, তখনও নাজমুল ‘পাস মার্ক’ নিয়ে বেরিয়ে যান। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কৌশলী অবস্থান নেন। তারপর আইসিসির লভ্যাংশ বিষয়ক নীতিতেও ‘বাংলাদেশের লাভ’কে তিনি প্রাধান্য দেন। ভারতকে উপেক্ষা করে জানিয়ে দেন, যে নীতিতে বাংলাদেশের বেশি আয় হবে, তিনি সেদিকেই থাকবেন। বাংলাদেশের আয় ঠিক রেখে ভারত নতুন কোনও পথ বের করলে তাতে বিসিবির সমস্যা নেই। এই অবস্থানের মধ্যে দিয়ে তিনি আসলে লাঠি অক্ষত রেখে সাপ মেরেছেন!








