দিনাজপুরের বিরল উপজেলার প্রত্যন্ত ইভিরামপুর গ্রাম থেকে বইমেলায় এসেছেন আজাহার আলী। তিনি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। এই নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বইমেলা দেখছেন তিনি। তার বইমেলায় আসার পেছনে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নেই। কোনো বই তিনি কিনবেন না। বই পড়ার অভ্যাসও নেই। খবরাখবর রাখার জন্য এলাকার চায়ের দোকানে বসেন। সেখানে মুখে মুখে নানা তথ্য এসে যায়। চায়ের দোকান এখন তথ্যের কেন্দ্র। চায়ের দোকানে টেলিভিশন থাকে। সেখানে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান, নাটক, সিনেমা চলে। খবরও চলে। তবে খবরগুলো বেশি আসে মোবাইলে। সেখান থেকে মানুষের মুখে মুখে। এসব খবর থেকে কেউ বঞ্চিত হয় না। আগে যারা টিভি, রেডিও, পত্রিকার স্পর্শে থাকতো তারাই কেবল দিন দুনিয়ার খবর রাখতো। এখন সবার কাছেই খবর চলে যায়। খবর এখন মোবাইল থেকে মুখে মুখে ছড়ায়। আজাহার আলীর পড়াশোনার অভ্যাস না থাকলেও জ্ঞানের প্রতি বিপুল আগ্রহ। তিনি তার গভীর দৃষ্টি খুলে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেন। কান খুলে চেষ্টা করেন সবকিছু শুনতে।
গতকাল বইমেলায় তার সঙ্গে দেখা। তার কথা শুনে যা বুঝলাম, দশ বছর আগে একবার তিনি বইমেলায় এসেছিলেন। সেবার তার বিশ্বাস জন্মে, পৃথিবীতে অনেক কিছুর মেলা হলেও জ্ঞানের মেলা তিনি খুঁজে পাননি। এইটি সত্যিকারের জ্ঞানের মেলা। এইখানে প্রতিটি মানুষ জ্ঞানের সাগরে ডুব দিতে এসেছেন।
আজাহার আলী খুব কম কথা বলেন। শোনেন বেশি। তার কথা পাশ থেকে একজন শুনছিলেন। তিনি বললেন, এই যে পোলাপান দেখতেছেন, আজব পোশাক পইরা, রং লাগাইয়া ঘুরতাছে, পাগলামি করতাছে, এইটা কি আপনার কাছে জ্ঞানশিক্ষা মনে হয়? আজাহার আলী বললেন, জ্বি, এইটাই জ্ঞানশিক্ষার ধরন। যার যার স্বাধীনতায় সামনে এগিয়ে যাওয়াই জ্ঞান শিক্ষার ফল। আজাহার আলীর ভাষা ও বাক্য প্রয়োগ ভিন্ন। আমি তার কথা শুনে এটিই বুঝলাম।
দেখলাম চুপ করে বইমেলায় ঘুরে বেড়ানোটাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। এই নিশ্চুপ অবস্থার ভেতর দিয়ে তিনি তার প্রাণকে উন্মুক্ত করে রেখেছেন। জ্ঞান তার ভেতরে চলে যাচ্ছে। জ্ঞানের মেলায় এসে তার অর্জনটি সঠিক হবে। কারণ, তিনি বইমেলার সবকিছুর মধ্যেই জ্ঞান আর শিক্ষার সন্ধান পাচ্ছেন।
বেনাপোল থেকে মাসুদুর রহমান মিলন এসেছেন বইমেলায়। স্বপরিবারে। তিনি প্রতিবছর বইমেলায় আসেন। চারদিকে ঘোরেন। পছন্দের বইপত্র সংগ্রহ করেন। এবার এসে তিনি পুরোপুরি ঘুরেছেন মেলা। কিনতে আসবেন কয়েকদিন পর। বললেন, আমার স্ত্রী সন্তানদের বইমেলা দেখাতে নিয়ে আসলাম। বইমেলাটা সবার দেখা দরকার। এটিই আমাদের উন্নতি বিবেচনার প্রধান কেন্দ্র। বইমেলা ছাড়া অন্য কোনো জায়গা থেকে আমাদের জাতিসত্তার বর্তমান অবস্থাটি বিবেচনা করা যাবে না। বললাম, কী দেখে আপনি এই বিবেচনাটি করবেন? বললেন, ভীড় দেখে। মানুষের আনন্দ দেখে। উচ্ছ্বাস দেখে।
মাসুদুর রহমান মিলন যশোরের শার্শা উপজেলার বেনাপোলের ইউপি চেয়ারম্যান ছিলেন একসময়। জীবনে অনেক রকমের সাফল্য ব্যর্থতা আছে। একসময় মাদক ও চোরাকারবারি দমন করতে কাজ করেছেন। এলাকার। মানুষের নানাবিধ উপকার করছেন। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের উপকার করার কোনো পথ নেই, তার জ্ঞানচক্ষু খুলে দেয়া ছাড়া। নগদ অর্থ ও অন্যান্য উপকার আজকের দিনে বিপথে যায়। তাই তিনি এলাকায় একটি বিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন। তারপরও তিনি পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারেননি। এখন তার বড় ইচ্ছে, এলাকায় একটি পাঠাগার গড়ে তোলা। বলছেন, প্রতিটি দিন এই স্বপ্নকে এগিয়ে নেয়াই প্রধানতম কাজ।
(চলবে)







