“ট্রাক ট্রাক ট্রাক
শুয়োরমুখো ট্রাক,
ট্রাকের মুখে আগুন দিতে মতিউরকে ডাক।”
মতিউর, আসাদ কিংবা রুস্তম। তারুণ্যের প্রতীক। জাগরণের প্রতীক। বিপ্লবের প্রতীক। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানকে তাঁরা বাঙালি জাতীর স্বাধিকার আদায়ের জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন। তাদের চেতনাকে ধারণ করেই পরবর্তী সময়ে এদেশের মুক্তিকামী তরুণরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য বিপ্লব করেছে। মুক্তিকামী জনগণের পক্ষে জাতির মুক্তিসনদ খ্যাত ৬ দফা এবং পরবর্তী সময় ছাত্র সমাজের দেয়া ১১ দফা কর্মসূচির প্রেক্ষাপটে সংঘটিত হয়েছিল এ অভ্যুত্থান। ১৯৬৯ সালের এই গণঅভ্যুত্থানের আজ তার ঊনপঞ্চাশতম বার্ষিকী।
১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি সরকারবিরোধী আন্দোলনে ২২ দফা দাবি নিয়ে রাজপথে নামে সংগ্রামী ছাত্র-জনতা। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা আসাদুজ্জামান। রাজপথে পড়ে থাকা আসাদের রক্তমাখা শার্ট সেদিন গণজাগরণের ডাক দেয়, রূপ নেয় গণঅভ্যুত্থানের। আসাদের মৃত্যুর পর কবি শামসুর রাহমান লিখেছেন-
“আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা, কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।”

এই প্রাণের পতাকাকে হৃদয়ে ধারণ করে ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমে আন্দোলনের প্রেরণা পায়। এর চারদিন পর ২৪ জানুয়ারি আন্দোলন চলাকালে ঢাকার সচিবালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় নবকুমার ইন্সটিটিউটের নবম শ্রেণির ছাত্র মতিউর রহমানসহ আরও অনেকে। মতিউরের মৃত্যুর পর এই আন্দোলন পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সংগ্রামী জনতা সেদিন সচিবালয়ের আগুন লাগিয়ে দেয়। বিক্ষুব্ধ জনগণ আইয়ুব সরকারের বিভিন্ন আমলা-মন্ত্রীদের বাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেয়। এসময় শহরের নিয়ন্ত্রণভার সেনাবাহিনীর ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। পরদিন সেনাবাহিনী ও ইপিআর ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বেপরোয়া গুলি চালায়। এসময় ঢাকার নাখালপাড়ায় আনোয়ারা বেগম নামের এক নারী বাচ্চাকে দুধ খওয়ানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ফলে আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণের পরে দেশের মুক্তিকামী জনগণের মধ্যে শ্রেণিচেতনার উন্মেষ ঘটে এবং পূর্ববাংলার জনসাধারণের মধ্যে আলাদা রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্খা বৃদ্ধি পায়। উন্মেষ ঘটে বাঙালি জাতীয়তাবাদের। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ২১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ১৯৫৮ সালের সামরিক সরকার তা বাতিল করে। এই অভ্যুত্থানের পর ২১ শে ফেব্রুয়ারি আবারো ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের দাবির মুখে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
৬৯এর গণঅভ্যুত্থানে এদেশের তরুণ সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই অভ্যুত্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব। ৭০এর নির্বাচন, ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বাঙালি জাতির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেরণা আসে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান থেকে। বাঙালি ও বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দিনটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হয়ে থাকবে আজীবন।








