দেশে যখনই কোনো বড় দুর্ঘটনা ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়া হয় এবং এর মধ্যে কোনো কোনোটি ‘উচ্চপদস্থ কমিটি’। কখনো বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিও হয়। কিন্তু সেইসব তদন্ত কমিটির রিপোর্ট পরবর্তীকালে আলোর মুখ দেখে না। অনেক সময় সেই রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেয়া হলেও গণমাধ্যমকে জানানো হয় না। অনেক সময় তদন্ত হয় এবং এ জাতীয় ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য রিপোর্টে কিছু সুপারিশও থাকে। কিন্তু সঙ্গত কারণেই সেসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না, বা করা হয় না।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি বড় তদন্ত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৭ সালে ছাত্র-শিক্ষক নির্যাতনের ঘটনায়। নবম সংসদের শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ওই তদন্ত করে এবং তারা একটি বড় তদন্ত রিপোর্ট সংসদে পেশ করে যেখানে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ এবং তৎকালীন সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদকে দায়ী করে তাদের বিচারের সুপারিশ করা হয়। সেই সাথে ওই সময়ে ওই স্থানে দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদেরও অনেকের নাম উল্লেখ করে প্রচলিত আইনে বিচারের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সেইসব সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।
সবশেষ পুরান ঢাকার চকবাজারে যে ভয়াবহ আগুনে প্রায় ৮০ জনের বেশি (বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য) মানুষের প্রাণহানি হলো, সেই ঘটনায়ও তদন্ত কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু তারা কবে রিপোর্ট দেবে এবং দিলেও সেটি দেশের মানুষ জানবে কি না এবং রিপোর্টে দেয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১০ সালের ৩ জুন এই পুরান ঢাকার নিমতলীতে কেমিক্যালের গোডাউনে লাগা আগুনে ১২৪ জনের মৃত্যুর পরে যে তদন্ত কমিটি হয়েছিল, তাদের সুপারিশগুলো যে বাস্তবায়িত হয়নি, তার প্রমাণ বুধবার মধ্যরাতে চকবাজারের আগুন। কারণ নিমতলীর আগুনের ঘটনায় তদন্ত রিপোর্টে আবাসিক এলাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছিল। সেই সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। হলে ৯ বছরের মাথায় গিয়ে এরকম আরেকটি ট্র্যাজেডি দেখতে হতো না দেশবাসীকে। যদিও ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকন বেশ সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন, তারা অনেক চেষ্টা করেও কেমিক্যালের গোডাউন সরাতে পারেননি। এই স্বীকারোক্তির মধ্যে তার অসহায়ত্ব যেমন আছে, তেমনি আছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সাহসিকতার অভাব।
তাছাড়া কেমিক্যাল গোডাউনের মালিকরাই যদি এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকেন বা তারা যদি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হন সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে যায় কিংবা তাদের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা মেয়রের পক্ষেও অসম্ভব। এখন প্রশ্ন উঠেছে,তাহলে এই ব্যর্থতা ও মৃত্যুর দায় নিয়ে মেয়র মহোদয় পদত্যাগ করবেন কি না? আবার তিনি পদত্যাগ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? কারণ এরপরে যিনি বা যারা মেয়র হবেন, তারাই বা কী করতে পারবেন? পুরান ঢাকার ব্যবসায়ীদের ক্ষমতা সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে, তারা জানেন এই প্রশ্ন কতটা সঙ্গত।

সম্প্রতি চট্টগ্রামের চাক্তাই এলাকায় ভেড়ামার্কেটের বস্তিতে লাগা আগুনে ৯ জনের প্রাণহানি হয় এবং প্রায় দুইশো ঘর পুড়ে যায়। রাজধানী ও চট্টগ্রামের বস্তিগুলোয় আগুন লাগা নিয়মিত ঘটনা। এসব ঘটনার পরও তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত কমিটি করা হয়। কিন্তু এ যাবত কতটি কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে এবং হলেও তার সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কেননা বস্তিতে আগুন কেন লাগে, কারা লাগায় এবং তাদের কী স্বার্থ, তা এখন আর কারো কাছে অস্পষ্ট নয়। বস্তিতে যারা থাকেন, তারাও জানেন সহসা এরকম কোনো এক আগুনে তার নিজের কিংবা স্বজনের মৃত্যু অনিবার্য। সেই অনিবার্যতা সঙ্গে নিয়েই তারা বস্তিতে থাকেন। কিন্তু আমাদের উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটিসমূহ শুধু তদন্তই করে। যেমন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার ৭ বছরেও তদন্ত শেষ হয় না। যেমন তদন্ত শেষ হয় না বা রিপোর্ট জানা যায় না অথবা সুপারিশ বাস্তবায়িত হয় না প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা এবং নৌ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির।
লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ (প্রথম আলো: ৩১ জুলাই, ২০১৮) মনে করেন, ‘৯৯ ভাগ তদন্ত কমিটি গঠিত হয় ক্ষুব্ধ জনগণকে শান্ত করতে বা সান্ত্বনা দিতে। বাঙালি ৫০ বছর আগে যতটা বেকুব ছিল, আজ আর তা নেই। সে সবই বোঝে, কিন্তু তার করার কিছু নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের চাঞ্চল্যকর রিজার্ভ পাচার নিয়ে সরকার সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। যথাসময়ে তিনি প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। বোধগম্য কারণে তার সেই রিপোর্ট আজও প্রকাশ করা হয়নি। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করলে বাংলাদেশ ব্যাংক যতটা বিব্রত হতো, সেটি গোপনে তালা মেরে রাখায় সরকার অনেক বেশি সন্দেহভাজনে পরিণত হয়েছে। প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে।’
সুতরাং চকবাজারের এই ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি হলো, তাদের প্রতিবেদনেও পুরান ঢাকার মতো এই ঘিঞ্জি আর সরু রাস্তার এলাকা থেকে কেমিক্যালের গোডাউন সরিয়ে ফেলার সুনির্দিষ্ট সুপারিশ থাকবে। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে, যতক্ষণ না রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে, আরও স্পষ্ট করে বললে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা ও দিকনির্দেশনা না আসে। কারণ আমাদের অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, খুব সামান্য বিষয়েও খোদ প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। ফলে মাঝে মধ্যে আমাদের মনে এ প্রশ্নও উঁকি দেয় যে, যদি সবকিছু প্রধানমন্ত্রীকেই করতে হয় বা সব বিষয়ে তারই হস্তক্ষেপ লাগে, তাহলে অন্য সব মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলো রেখে লাভ কী?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








