গত বেশ কয়েক বছর ধরে বেশিরভাগ টেলিভিশন চ্যানেলে একটা ট্রেন্ড চালু হয়েছে, ঈদের হাসির নাটক মানে হচ্ছে দেশের কোনো একটি বিশেষ অঞ্চলের ভাষাকে যতটা খাটো করে উপস্থাপন করা যায় ততই যেন নাটকটা ফাটাফাটি হয় আর কি! ছ্যাবলামির চূড়ান্ত পর্যায়ে নেমে নাটক তৈরি করে ঈদে প্রচার করা হচ্ছে। ভাঁড়ামিরও একটা মাপকাঠি থাকে। কিন্তু এই নাটকগুলো দেখলে মনে হয় কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই, বরিশাল, নোয়াখালী, সিলেট আর চট্টগ্রামের ভাষা ব্যবহার করলেই নাটক পার হয়ে যাবে।
বলা বাহুল্য, নাটকে আঞ্চলিক ভাষা প্রাসঙ্গিকভাবেই আসবে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন ওই ভাষাকে নির্ভর করে নাটকের উপাদান সাজানো হয় তখন সেটা বুঝতে বাকি থাকে না, ভাষাটাই প্রধান। কাহিনী বা গল্প তুচ্ছ।
কাহিনীর কোনো আগামাথা নেই, কখনো কখনো সংলাপকে খিস্তি খেউর মনে হয়। কোন অভিনেতা বরিশালের ভাষা কতটা পারফেক্টভাবে উচ্চারণ করতে পারলো, কোন অভিনেত্রী নোয়াখালী ভাষায় ঝগড়াটা ঠিকমত করতে পারলো তার মাপকাঠিতেই যেন চ্যানেলগুলো মধ্যস্বত্তভোগীদের কাছ থেকে নাটক কিনে প্রচার করছে। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের কিছু যেন করার নেই। কারণ তারা এখন ওই মধ্যস্বত্তভোগী এজেন্সির কাছেই সব কিছু বিকিয়ে দিয়েছে। এজেন্সির পছন্দই যেন এখন চ্যানেলের পছন্দ। তবে এ ব্যাপারে দু’একটি চ্যনেল এখনও চেষ্টা করে যাচ্ছে ওইসব ফাতরামি মার্কা নাটক প্রচার থেকে নিজেদের দূরে রাখতে। কিন্তু কতদিন তারা টিকে থাকতে পারবে সেটাও একটা চ্যালেঞ্জের ব্যাপার।
আমরা অবশ্যই আঞ্চলিক ভাষাকে সম্মান করি। কিন্তু যখন দেখব আমার চট্টগ্রামের ভাষাকে ছ্যাবলামির চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যখন দেখব আমার সিলেটের ভাষা এমনভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে যা দেখে অন্য অঞ্চলের মানুষের মনে একটা নেতিবাচক মূল্যায়ন ফুটে উঠবে, তখন নিশ্চয়ই নাটকটা আর আমাকে টানবে না। বরং ওই চ্যানেল বা নাটকের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষদের দিকে ট্যারা চোখেই তাকাবো। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হচ্ছে ওই ধরণের প্রায় সব নাটকের পাত্রপাত্রী একই। তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্টও কখনো কখনো অভিন্ন। সংলাপও মিলে যায়। বিজ্ঞাপনও জমজমাট পেয়ে থাকে ওইসব নাটক।
এই যদি হয় নাটকের অবস্থা তা হলে মানুষ কেন দেশীয় চ্যানেলের দিকে মুখিয়ে থাকবে? কেন তারা রিমোট কন্ট্রোলের বাটন চেপে পাশের দেশের চ্যানেলে যাবে না?
আমরা তো এখনও ভুলে যাইনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সেই সাদা-কালো যুগের ঈদের নাটকগুলো। হুমায়ুন আহমেদের নাটক, মমতাজ উদ্দিন আহমদের নাটক, আমজাদ হোসেনের নাটক, মামুনুর রশীদের নাটকগুলো এখনও আমাদের স্মৃতিতে অমলিন। ঈদের নাটক মানেই কি হাসাতে হবে?
এখনও যারা নাটককে শিল্পমান সম্পন্ন করে দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করতে চায় তাদেরকে কাঠখড় পুড়িয়ে নাটক তৈরি করতে হচ্ছে। তারপরও বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে জিম্মি হতে হয় কখনো কখনো। আর দায়বদ্ধতা সম্পন্ন গুণী নাট্যকার ও পরিচালকদের দুএকটি নাটক আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় প্রতি ঈদে।
আমাদের নাটকের দুরবস্থার কথা আলোচনা করলে অনেক বোদ্ধা নাট্য পরিচালক বলেন, ‘কিছু করার নেই। আমাদের হাত পা বাঁধা। বিজ্ঞাপনদাতা থেকে শুরু করে এজেন্সির মালিকরা আমাদের কাছে যে ধরণের ডিমান্ড করে তার কিছুটা হলেও পূরণ করতে হয়। তারপরও চেষ্টা করি নাটকের শিল্পমান ধরে রাখার। সব সময় পেরে উঠতে হয়তো পারি না।’
নাটকের হাসির বিষয়টা কেন আরোপিত মনে হয়? এর প্রধান কারণ নাটকের ফড়িয়ারা মনে করে বিশেষ এক অভিনেতা এভাবে কথা বললে দর্শক আনন্দ পাবে। বরিশালের ভাষাটা তার কন্ঠে ভালো শোনায়। বরিশালের পাশাপাশি নোয়াখালী ভাষায় ওই অভিনেত্রীর অভিব্যক্তি খুবই সাবলীল। তাকে নিলেই নাটক জমে যাবে। সে জন্য একই অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যখন ঈদের হাসির নাটকগুলোতে অভিনয় করেন তখন আরোপিত না হয়ে উপায় থাকে না।
একটি বিষয় খুব সহজে অনুমান করা যায় যে, বিশেষ কয়েকজন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়েই ঈদের হাসির নাটক তৈরি হচ্ছে। আমাদের এক সময়কার শমী-বিপাশা-আফসানা মিমি-তৌকির-মাহফুজদের এসব হাসির নাটকে দেখা যায় না।
আমাদের হাসির নাটকের এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কেউ এগিয়ে আসবে না, এটা সত্য। কারণ যারা আজকের তথাকথিত হাসির নাটকে অভিনয় করছেন তাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলা যায়, অর্থের কাছে কমবেশি সবাই জিম্মি। তারা খুবই পাকা অভিনেতা, জাত অভিনেতাও বটে। কিন্তু যারা বিজ্ঞাপন দেয় তারা তাদেরকে ভাঁড়ামি করিয়ে করিয়ে ভাঁড়ে পরিণত করে তুলছে। আর দর্শক তাদের হাতের কাছের যন্ত্রটি টিপে চলে যাচ্ছে অন্য চ্যানেলে। চ্যানেল কর্তৃপক্ষের হয়ত এতে কিছুই আসে যায় না। কারণ তারা তাদের অর্থ ঠিকই পেয়ে যাচ্ছে। দর্শক দেখল কি দেখল না সেটা বড় বিষয় না হয়ত তাদের কাছে।
এভাবে কি আমরা আমাদের শিল্পকে ঠকাচ্ছি না? ঠকাচ্ছি না আমাদের নাটকের ঐতিহ্যকে? প্রশ্নটা থাকল চ্যানেল কর্তৃপক্ষের কাছেই।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







