যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মিত্রদেশগুলো থেকে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর শুল্ক আরোপ করায় ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে দেশগুলো।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), মেক্সিকো এবং কানাডা থেকে আমদানি করা ইস্পাতের ওপর ২৫ শতাংশ এবং অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার মধ্যরাত থেকেই এ শুল্ক কার্যকর হবে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ‘গভীর হতাশা’ প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্য। ইইউ এর বাণিজ্য বিষয়ক কমিশনার ম্যালস্ট্রম বলেছেন, “বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য এ এক কালো দিন।” ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যঁ ক্লদে জাঙ্কার বলেছেন, “এ পদক্ষেপ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
ইইউ, কানাডা এবং মেক্সিকোর এই নিন্দার সাথে সামিল হয়েছেন কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকান প্রতিনিধিরাও।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে আক্রান্ত দেশগুলোর নেতারা ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইস্পাত থেকে স্লিপিং ব্যাগ, বলপয়েন্ট কলম পর্যন্ত পণ্যের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে তারা।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ এই পদক্ষেপকে ‘অবৈধ’ বলে উল্লেখ করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ফোন করে এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তিনি।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এলিসি প্যালেসে পক্ষ থেকে জানানো হয়, ম্যাক্রোঁ ট্রাম্পকে আরও জানান, এর কঠোর ও সমানুপাতিক জবাব দেবে ইইউ। ম্যাক্রোঁর সাথে ট্রাম্পের সুসম্পর্ক সুবিদিত।
ট্রাম্প অবশ্য তার এই পদক্ষেপের ব্যাখ্যায় বলেছেন, মার্কিন ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদকরা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বৈশ্বিকভাবে অত্যধিক সরবরাহ তাদের জন্য হুমকি।
কিন্তু ট্রাম্পের এই যুক্তি প্রত্যাখান করেছেন তার মিত্ররা। কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এই দাবিকে ‘অপমানকর’ অভিহিত করে বলেছেন “কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, এমনটা কল্পনাতীত।
যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমন্ত্রী লিয়াম ফক্স জানিয়েছেন, ইস্পাতের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ ‘স্পষ্টতই অযৌক্তিক’। ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ‘স্রেফ রক্ষণবাদী’ অভিহিত করে তিনি জানান, “এটা খুবই দুঃখজনক হবে যদি আমরা ইটের বদলে পাটকেল ছুঁড়ে আমাদের ঘনিষ্ঠতম মিত্রদের বিরুদ্ধে দ্বন্দ্বে জড়াই।”
মেক্সিকোও শুল্ক আরোপ করবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লুই ভিদেগারে। তবে তিনি আরও যোগ করেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মেক্সিকোর সহযোগিতার জায়গা, তা বাণিজ্য, বা অভিবাসন, বা নিরাপত্তা, বা যেকোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন- তা পরিবর্তন হবে না। আক্রমণাত্মক বিবৃতি বা এরকম অন্যায্য একতরফা পদক্ষেপের জন্যতো নয়ই। আমরা মেক্সিকোর স্বার্থ রক্ষা করবো, যা এতদিন পর্যন্ত করে এসেছি। ”
মার্কিন কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের শীর্ষ নেতারাও এই বিরোধীতায় সামিল হয়েছেন। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পল রায়ান বলছেন, আমি এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত নই। এক বিবৃতিতে এমনটি জানান মার্কিন কংগ্রেসের সবচেয়ে প্রভাবশালী এই রিপাবলিকান।
“আজকের এই পদক্ষেপ আমেরিকার মিত্রদের লক্ষ্য করে, যখন চীনের মতো অন্যান্য দেশের অন্যায্য বাণিজ্য কার্যক্রমের বিরুদ্ধে আমাদের একসাথে কাজ করা উচিত।”
হাউজ ওয়েস এন্ড মিনস কমিটির চেয়ারম্যান কেভিন ব্র্যাডি বলেছেন, এই শুল্ক ভুল লক্ষ্যকে টার্গেট করেছে। ইউরোপ, মেক্সিকো এবং কানাডা সমস্যা নয়- সমস্যা হলো চীন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ২৩ মার্চে ইস্পাত আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ এবং অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে তখন তিনি ইইউ, কানাডা, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া এবং আর্জেন্টিনাকে শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেন।
সে সময় ইইউভুক্ত দেশগুলোসহ অন্যান্য দেশের উপর শুল্ক কার্যকরের বিষয়টি এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। পরে এ সময়সীমা শেষের আগে ফের একমাসের জন্য তা বাড়ানো হয়। এ বাড়তি সময়সীমা শেষ হচ্ছে শুক্রবারই।
তবে, এই শুল্ক আরোপের অবস্থানটিকে ‘নমনীয়’ উল্লেখ করে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যেকোন সময় এই শুল্ক তুলে নেওয়া বা পরিবর্তনের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। আমরা সকল পক্ষের সাথে আলোচনায় আগ্রহী বলেও জানান তিনি।
কানাডা জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যের পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করতে পারে। যার আওতায় রয়েছে নির্দিষ্ট প্রকারের আমেরিকান ইস্পাত এবং অন্যান্য ভোগ্যপণ্য।
মেক্সিকোর অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, ইস্পাত, আপেল, পনিরের মতো পণ্যে শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
ইইউ পাল্টা পদক্ষেপমূলক শুল্ক আরোপে ১০ পৃষ্ঠার পণ্যের তালিকা দিয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাতেও তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিবে বলে ঘোষণা দিয়েছে।
২০১৭ সালে কানাডা, মেক্সিকো এবং ইইউ একত্রে ২৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার মূল্যে ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে, যা গতবছরের দেশটিতে রপ্তানি করা ৪৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের প্রায় অর্ধেক।
ইউরোপিয়ান প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, তাদের শঙ্কা বিদেশি ইস্পাতের চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রে কমে যাওয়ায় তা ইউরোপের বাজারে চলে আসবে।
এর ফলে, আমেরিকাকে মূল্যবৃদ্ধি ও চাকরি হ্রাসের মতো অর্থনৈতিক আঘাত সইতে হবে বলে অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা। এক হিসেবে চাকরি কমবে প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার।
অনিশ্চয়তার জন্য ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ইস্পাতের দাম অনেক বেড়ে গেছে। আগামী মাসের মধ্যেই ইস্পাতের দাম ১০ শতাংশ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
তবে মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী মূল্যবৃদ্ধির এই উদ্বেগকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, এর (শুল্ক আরোপ) প্রভাব খুব সামান্যই হবে।
অর্থনীতিবিদ জন অ্যান্টোনের মতে সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক প্রভাব সীমিত থাকলেও, এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনের অন্যান্য হুমকি বিষয়ে মিত্রদের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিবে।
তিনি বলেন, “শুধুমাত্র এই একটি পদক্ষেপ পরিমাণগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ না হলেও এটা একটি ভয়াবহ পূর্বাভাস।”







