ইলিশই একমাত্র মাছ—যে কিনা নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম হয়। মৌসুমে পর্যাপ্ত ইলিশ না পাওয়া গেলেও যেমন সংবাদ, আবার ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও সংবাদ। ইলিশের দাম কমলেও সংবাদ, বাড়লেও সংবাদ।
পয়লা বৈশাখে পান্তার সাখে খাওয়ার জন্য একজোড়া ইলিশ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি যেমন সংবাদ, তেমনি সন্তানের বায়না মেটাতে বাজারে ইলিশ মাছ কিনতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসা স্কুলশিক্ষকের আত্মহত্যাও সংবাদ। এত এত সংবাদের ভিড়ে যেদিন গণমাধ্যমে ইলিশ মাছের জীবনরহস্য উন্মোচনের খবর এলো, তার দুদিন পরেই ‘চাঁদপুরে সাড়ে তিন কেজি ওজনের একটি ইলিশ সাড়ে নয় হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে’ বলে সংবাদ চোখে পড়ে।
গত রোববার রাতে মেঘনা নদীতে ৩ কেজি ২০০ গ্রাম ওজনের মাছটি একজন জেলের জালে ধরা পড়ে। পরদিন সোমবার এটি চাঁদপুর সদরের মেঘনা নদীর পাশে বাংলাবাজারে এটি বিক্রি হয়। মাছ ব্যবসায়ী হানিফ মিয়া মাছটি সাড়ে নয় হাজার টাকায় বিক্রি করেন। তবে মাছটি কে কিনেছেন এবং যিনি কিনেছেন তিনি নিজে খেয়েছেন নাকি এটি আরও বেশি দামে রাজধানীর বাজারে বিক্রি হয়েছে এবং কোনো মাছরসিক কিংবা পয়সাওয়ালার পাতে উঠেছে কি না—সেই সংবাদ অবশ্য জানা যায়নি।
এই সংবাদের নিচে একজন পাঠক মন্তব্য করেছেন, ‘খেতে নাইবা পারলাম; একবার দুচোখে দেখতে পেলেও শান্তি পেতাম!’ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই সাইজের বা এর চেয়ে বড় অন্য কোনো মাছ নিয়ে এরকম সংবাদ হত না এবং এ নিয়ে পাঠকের অত আগ্রহও থাকতো না। বরং ইলিশ ছাড়া অন্য মাছ তখনই সংবাদ শিরোনাম হয় যখন অবিশ্বাস্য রকম বড় সাইজের কোনো মাছ ধরা পড়ে। যেমন এক মণ ওজনের রুই, ৬০ কেজি ওজনের পাঙ্গাস ইত্যাদি। অথবা বিরল প্রজাতির কোনো মাছ যখন জালে উঠে আসে। কিন্তু ইলিশ সারা বছরই কোনো না কোনোভাবে সংবাদ শিরোনামে থাকে। এক কেজি ওজনের একটি ইলিশের যা দাম তা দিয়ে অনায়াসে ৩-৪ কেজি বা তারও বেশি অন্য মাছ কেনা যায়। আবার ইলিশের সাইজ যদি সম্প্রদি চাঁদপুরে ধরা পড়ার মতো তিন সাড়ে তিন কেজি হয়, তাহলে তো কথাই নেই। সেই মাছ শুধু খাওয়ারই বিষয় নয়, বরং সেটি একনজর দেখারও বিষয়।
গত বছর ইলিশ মাছকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় আন্তর্জাতিক মেধা-স্বত্ব কর্তৃপক্ষ। এবার এর পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচন করলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী। ২০১৫ সাল থেকে এই জিনোম সংক্রান্ত গবেষণা শুরু করেন তারা। বলা হচ্ছে, এই সফলতা ইলিশ মাছের সংরক্ষণ, উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গত ৮ সেপ্টেম্বর সংবাদ সম্মেলনে এর বিস্তারিত তুলে ধরেন গবেষকরা।
পরিসংখ্যান বলছে, পৃথিবীর মোট ইলিশের প্রায় ৬০ ভাগ উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ সালে দেশে ইলিশ আহরণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার ৪৬৯ মেট্রিক টন।
ইলিশ আনন্দ-বেদনার স্মৃতি নেই—এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশেষ করে যাদের জন্ম নদীবিধৌত অঞ্চলে। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে উপকূলীয় অঞ্চলে। সারা বছর বড় বড় ইলিশ ধরেন যে জেলেরা, তাদের কতজন কিংবা তাদের স্ত্রী সন্তানরা জীবনে কতবার এক কেজি ওজনের একটি ইলিশের স্বাদ পেয়েছেন—তা বলা মুশকিল। কারণ বড় সাইজের ইলিশ মানে বেশি দাম। সুতরাং বড় মাছ ধরা পড়লে জেলেরা সেই মাছ নিজের বাড়িতে না নিয়ে তা বিক্রি করে সংসারের অন্যান্য চাহিদা মেটান। অনেকের দাদন নেয়া থাকে। ফলে মাছ যত বড় আর যত সুস্বাদুই হোক, তা ওই গরিব জেলের হেঁশেলে সুবাশ ছড়ায় না। তিনি হয়তো খুচরা বাজার থেকে শস্তার পাঙ্গাস, কখনো ডিম এবং কালেভদ্রে হয়তো ব্রয়লার মুরগির ঝোল দিয়েই উদরপূর্তি করেন।
ইলিশের আহরণ যে খুব কমেছে তা হয়তো নয়। কারণ কোনো বছর কম ধরা পড়লে পরের বছর আবার বেশ ভালো মাছ ধরা পড়ে। এবারের মৌসুমের শুরুতে বাজারে খুব বেশি ইলিশ চোখে না পড়লেও ইদানীং সরবরাহ বেড়েছে।
ছোটবেলায় আমি নিজেও ঝালকাঠি শহরের বাজার থেকে বড় আকারের একটি ইলিশ একশো টাকায় কিনেছি। এই কথা এখন যেমন আমার সন্তানের সাথে বললে সে এটিকে গল্প মনে করবে। তেমনি এখন যারা এক হাজার টাকায় একটি ইলিশ মাছ কেনেন, আগামী প্রজন্মের কাছে সেটিও গল্প মনে হবে।
তবে ইলিশ হলেই হয় না। এর দাম ও স্বাদ নির্ভর করে এর ওজন এবং কতদিন সে মিষ্টি পানিতে ছিল, অর্থাৎ কোন নদীতে সে ধরা পড়েছে, তার উপরে। ইলিশ মূলত সামুদ্রিক মাছ হলেও সে ডিম পাড়তে আসে মিষ্টি পানির নদীতে। অর্থাৎ সমুদ্র পার হয়ে সে দখিনের বিষখালি, সুগন্ধা, সন্ধ্যা, কচা, কীর্তনখোলা, আড়িয়াল খাঁ, পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ ওই অঞ্চলের নদীপথ পাড়ি দেয়। যে ইলিশ যত বেশি পথ পাড়ি দেয় এবং মিষ্টি পানিতে (বিশেষ করে পদ্মা-মেঘনা) অবস্থান করে, তার স্বাদ তত বেশি। সদ্য প্রয়াত সিনিয়র সাংবাদিক গোলাম সারওয়ারের জন্মস্থান বরিশালের বানারীপাড়ার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সন্ধ্যা নদীর ইলিশ নাকি সবচেয়ে বেশি সুস্বাদু—এমন কথা নাকি তিনি বলতেন। আমি সন্ধ্যাসহ ওই অঞ্চলের সব নদীর ইলিশ খেয়েছি। তাতে বরং সুগন্ধা নদীর ইলিশ তুলনামূলক বেশি সুস্বাদু মনে হয়েছে। যদিও সুগন্ধার ইলিশ খুব বড় হয় না। আবার মানুষের বেশি আগ্রহ চাঁদপুরের ইলিশের প্রতি। এর কারণ জানি না। তবে ছোটবেলায় চন্দনা নামে ছোট আকারের এক ধরনের ইলিশ আব্বা কিনে আনতেন এবং সেই মাছের প্রতি দেখেছি আমার মায়ের দুর্নিবার আকর্ষণ। চন্দনা এখন দেখা যায় না।
একসময় গড়াই, মধুমতি, চিত্রা, ধলেশ্বরী, কালিগঙ্গা, নবগঙ্গা, ভদ্রা নদীতে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়তো। কিন্তু পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় এসব নদীতে এখন আর ইলিশ আসে না। কারণ ইলিশ গভীর জলের মাছ। এছাড়া সারা দেশেই নদী দূষণ, গণহারে মা ইলিশ ধরা এবং জাটকা নিধনের কারণেও ইলিশের জোগান কমেছে বলে মনে করা হয়। ইলিশের স্বাদও কমেছে। আগে যেমন কোনো বাড়ির রান্না ঘরের কড়াইয়ে গরম তেলে ইলিশ পড়লেই একটা অদ্ভুত সুগন্ধ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তো (কাঁঠালিচাপা ফুল ফুটলে যেমন আশেপাশে খবর হয়ে যায়)—সেরকম বিস্ময়কর গন্ধ এখন আর ইলিশ থেকে ছড়ায় না। ইলিশ মাছের শরীরে এই ঐশ্বরিক সুগন্ধের কী কারণ—তা বিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইলিশ মাছ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন কৌশল’ নামে প্রকাশনায় বলা হয়েছে, ইলিশের এই সুঘ্রাণের কারণ অজানা।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নেও ইলিশের ভূমিকা আছে। ভারত থেকে যখন সে দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী , মুখ্যমন্ত্রী বা এরকম সিনিয়র রাজনীতিবিদরা আসেন—তাদের খাবারের তালিকায় ইলিশ থাকবে না তা ভাবাই যায় না। আবার শুধু এই খাবারের তালিকায়ই নয়, উপঢৌকন হিসেবেও ভারতের রাজনীতিবিদদের ইলিশ পাঠানো হয়। সম্প্রতি ভারতের একটি এয়ারলাইন্সের একজন পাইলট ঢাকা থেকে ইলিশ নিতে গিয়ে যে বিপত্তিতে পড়েছেন, তাও সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।
বছর কয়েক আগ অবধি পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশের যে উন্মাদনা ছিল, তা এখন কিছুটা কমেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যেহেতু বছরের যে সময়টায় পয়লা বৈশাখ উদযাপন হয় ওই সময়টা ইলিশের মৌসুম তো নয়ই বরং ইলিশের প্রজননকাল মানে সে সময় ইলিশ ধরাই নিষেধ—তাই প্রধানমন্ত্রী যখন একবার সংবাদ সম্মেলনে পয়লা বৈশাখে ইলিশ না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন, তারপর থেকে পান্তা-ইলিশের উন্মাদনা কিছুটা কমেছে।
ইলিশ মাছ নিয়ে সংবাদ হয়, সংবাদ বিশ্লেষণ, কবিতা, ছড়া, উপন্যাসেও ইলিশ আছে। ইলিশ নিয়ে গবেষণা, প্রবন্ধ, নিবন্ধও ভুরি ভুরি। এবং কোনো একটি ঘটনা নিয়ে মহাকাব্য লেখার জন্য যেসব উপকরণ থাকতে হয়—সম্ভবত তার সবই ইলিশের আছে। তাকে নিয়ে আনন্দ, বেদনা, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, ভালোবাসা, স্মৃতি কী নেই? সুতরাং কোনো কবি হয়তো ভবিষ্যতে ইলিশ নিয়ে মহাকাব্যও রচনা করবেন।
এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








