সপ্তাহখানেক আগে মনে হচ্ছিল, নির্বাচনের ফল তো জানাই, এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতাটা বাকি। যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে করা বেশ কিছু মতামত জরিপে প্রায় প্রতিবারই জিতে যাচ্ছিলেন ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন। আমেরিকান সময় ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ৯ ও ১৯ অক্টোবর তিন-তিনটে প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কেও দর্শকদের ভোটে হিলারিই জয়ী হলেন।
শেষমেশ নানা সমালোচনায় ঘিরে থাকা তার প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারীদের অপমান করে প্রকাশিত অডিও সাক্ষাৎকার এবং তারপরই একের পর এক নারীর তার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ – সব মিলিয়ে হোয়াইট হাউজে হিলারির অবস্থানটাই যেন আরও পাকাপোক্ত হচ্ছিল।
কিন্তু এরপরই বজ্রপাতের মতো এলো হিলারির নতুন পাওয়া ইমেইল নিয়ে তদন্ত শুরুর ব্যাপারে এফবিআইয়ের ঘোষণা। গত ২৮ অক্টোবর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইয়ের পরিচালক জেমস কোমি জানান, হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ব্যক্তিগত সার্ভার ব্যবহার করে আদানপ্রদান করা আরও কিছু ইমেইলের সন্ধান পাওয়া গেছে। এই প্রেক্ষিতে এফবিআই নতুন করে তদন্ত শুরু করতে যাচ্ছে বলে মার্কিন কংগ্রেসকে এক চিঠিতে জানান তিনি।
নতুন তদন্তের ঘোষণায় বেশ বড় সমালোচনার মুখে পড়ে গেছেন হিলারি। অবশ্য সোমবার হঠাৎ আবিস্কৃত ইমেইলগুলোতে কোনো অপরাধের প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যায়নি, এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এফবিআই। প্রতিবেদনে জেমস কোমির বক্তব্য অনুযায়ী, বেশিরভাগ ইমেলই পুরনো। এফবিআই এজেন্টের একটি বিশেষ দল হিলারির সবগুলো ইমেইল তন্ন তন্ন করে খুঁজেও অপরাধের কোনো চিহ্ন খুঁজে পায়নি। তাই তার বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হচ্ছে না বলে কংগ্রেসকে দেয়া এক চিঠিতে জানান এফবিআই প্রধান।
গত জুলাইয়ে কোমি একই রকম ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও এই কেলেঙ্কারি নিয়ে কম কথা শুনতে হয়নি হিলারিকে। বারবার সেসব ইমেইল নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেই গেছেন তার নিজের ও প্রতিপক্ষ দলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা।

এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে ব্যক্তিগত ইমেইল ব্যবহার করে দাপ্তরিক কাজ চালানো এবং পরে উইকিলিকসের হাতে ফাঁস হওয়া হিলারি ক্লিনটনের ইমেইল ও নথি নিয়ে তদন্ত করে এফবিআই। অবিবেচকের মতো কাজ করলেও মামলা হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দায়ের হয়নি সে সময়।
ডেমোক্রেটিক দলের জাতীয় সম্মেলনের ঠিক আগে হওয়া সেই তদন্তে হিলারির কপালে ব্যাপক সমালোচনা জুটেছিলো। নিজ দলের প্রধান মনোনয়ন প্রতিদ্বন্দ্বী বার্নি স্যান্ডার্সসহ রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই সময়টায় সব কাটিয়ে দলের প্রার্থীতা জিতে হোয়াইট হাউজের দৌড়ে নামতে সফল হন হিলারি ক্লিনটন।
তবে ‘ইমেইল দুর্ভাগ্য’ যেন পিছুই ছাড়ছে না হিলারির। এজন্যই যেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দু’সপ্তাহেরও কম সময় বাকি থাকতে হিলারির পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা সময়কার সেই ব্যক্তিগত সার্ভারের সাড়ে ৬ লাখের মতো ইমেইল খুঁজে পাওয়া গেল। সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঘটনার তদন্তে বাজেয়াপ্ত যে ল্যাপটপ থেকে ইমেইলগুলো পাওয়া যায় সেটি হিলারিরই বহুদিনের সহযোগী হুমা আবেদিনের প্রাক্তন স্বামী অ্যানথনি ওয়েইনারের।
এফবিআই পরিচালক কোমি অবশ্য বলেছেন, এসব ইমেইলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আছে কিনা এ ব্যাপারে এফবিআই এখনো নিশ্চিত নয়। হয়তো সেখানে বেশিরভাগই আগেই পরীক্ষা করা ইমেইলের কপি। আবার চমকপ্রদ কিছুও থাকতে পারে সেখানে। গত ৩০ অক্টোবর সেগুলো বিশ্লেষণের ওয়ারেন্টও পেয়ে গেছে এফবিআই।

এবং এর ফলস্বরূপ গত বুধবার হঠাৎই এফবিআই হিলারির স্বামী সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের ক্ষমতায় থাকাকালীন কিছু গোপন নথি নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এই প্রতিবেদন যেন ট্রাম্প শিবিরের হিলারি-বিরোধী আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিলো। এমনিতেই ট্রাম্প ও তার সমর্থকরা হিলারির আগের ইমেইল কেলেঙ্কারি, উইকিলিকসের তথ্যফাঁসের পর নতুন ইমেইল তদন্ত প্রসঙ্গে কর ফাঁকি আর নারীদের অপমান করাসহ ট্রাম্পের দোষগুলো লুকিয়ে প্রতিপক্ষের কড়া সমালোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তার ওপর এবার বিল ক্লিনটনের প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন গোপন নথি ও তথ্য বেরিয়ে আসায় হিলারি ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে প্রচারণার ঝাঁঝ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন তারা।
হয়তো শুধু এফবিআইয়ের প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট হিলারিকে হারানোর জন্য যথেষ্ট নয়। তার ওপর এখন তো পরে পাওয়া ইমেইল তদন্ত করেও হিলারিকে নির্দোষ হিসেবেই জানানো হলো। তবে এই কেলেঙ্কারি যে অনেক বড় একটি প্রভাব ফেলছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এর প্রমাণ হচ্ছে প্রতি জরিপে কমতে থাকা হিলারি আর ট্রাম্পের পার্থক্য। সাম্প্রতিক মতামত জরিপে আগে হিলারির পক্ষে থাকা ভোটারদের এক-তৃতীয়াংশই বলছেন তারা হয়তো তাদের সমর্থন ফিরিয়ে নেবেন।
অনেক মতামত জরিপ বিশ্লেষকই এবারের নির্বাচনকে ‘অ-জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা’ বলে উল্লেখ
করেছেন। এদেরই একজন, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ফ্র্যাংক লান্টজ বলেন, “সবার মনোযোগ যখন ট্রাম্পের কাজকর্মের দিকে ছিল, তখন হিলারি জিতে যাচ্ছিলেন। এখন সবার দৃষ্টি হিলারির কর্মকাণ্ডের দিকে।” ফ্র্যাংক মনে করেন, এবারের নির্বাচন সেই প্রার্থীই জিতবেন যিনি জনগণের দৃষ্টি প্রতিদ্বন্দ্বীর দোষত্রুটির দিকে ধরে রাখতে পারবেন।
নির্বাচনের খুব বেশিই কম সময় বাকি। জরিপ বিশ্লেষকদের ‘অ-জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা’কে যদি আমরা মাথায় রাখি আর ফ্র্যাংক লান্টজের ভবিষ্যদ্বাণীর দিকে তাকাই, নির্বাচনের আগপর্যন্ত কিন্তু জনগণের চোখ থাকছে ট্রাম্পের প্রতিপক্ষ হিলারির ইমেইল কেলেঙ্কারির দিকেই।
অনিশ্চিত ভোটারদের সিদ্ধান্ত ক্ষণে ক্ষণে বদলাতে থাকে। তাই নির্বাচনের ফল আসার আগে হাজারটা জরিপ করেও বোধহয় বোঝার উপায় নেই আগে থেকে এগিয়ে থাকা হিলারি ক্লিনটনই জিতবেন, নাকি নিজের ইমেইল কেলেঙ্কারির সুনামি-স্রোতে ডুবে যাবেন তিনি।







