এভারেস্টে কে প্রথম উঠেছিল সে প্রশ্নের উত্তর বোধ হয় আমরা অনেকে সহজেই দিতে পারবো। কিন্তু তৃতীয় কে, সেটা চট করে বলতে পারা লোকের সংখ্যা কিন্তু নেহায়েতই হাতে গোনা। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর মুহূর্তেই পাবার উপায় কি? উপায় আপনার হাতের মুঠোয়, যদি সেখানে একটি স্মার্ট ফোন বা ফিচার ফোন থাকে। হ্যাঁ, ইন্টারনেট এখন জ্ঞান বা শিক্ষা অর্জনের সবচেয়ে সহজ এবং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কারণ, পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখন ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত। বাংলাদেশেও এখন ইন্টারনেটের দ্রুত বিস্তার হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ছাড়িয়েছে। অনেক স্কুল-কলেজেই প্রচলিত হয়েছে কম্পিউটার শিক্ষা এবং কম্পিউটারের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা। আর এর ফলে দেশের বহু শিশু-কিশোরের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে এক নতুন দিগন্ত। শুধু তাই নয়, ইন্টারনেটের প্রচলন শুধুমাত্র শিক্ষা গ্রহণকে ত্বরাণ্বিতই করছে না, বরং বিশ্বমানের মৌলিক শিক্ষা উপাদানও আয়ত্ত করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের প্রচার ও প্রসার গত কয়েক বছরে বেড়েছে কয়েকগুণ। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কৃতিত্বের পাশাপাশি অবদান রয়েছে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোসহ বেসরকারি খাতের বিভিন্ন উদ্যোগের। তবে, বাকি বিশ্বের তুলনায় এখনও আমরা বেশ খানিকটা পিছিয়ে। আর এজন্য শিশু-কিশোর পর্যায়ে ইন্টারনেটের প্রচলনকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কারণ, এই শিশুরাই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি উন্নয়নের পুরোধা হয়ে দাঁড়াবে।
শুধু কম্পিউটারের মাধ্যমেই নয়, সহজলভ্যতার কারণে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বড়রাও ইন্টারনেট ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে। এখনকার শিশু-কিশোরদের শিক্ষাগ্রহণসহ সময় কাটানোরও একটি বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে ইন্টারনেট। ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে রয়েছে তাদের দৃপ্ত পদচারণা। আর এখানেই রয়েছে বেশ কিছু লক্ষণীয় বিষয়।
খুব বেশি না হলেও মাঝে মাঝেই উঠে আসে ইন্টারনেটে হয়রানির কিছু গল্প। আর এই হয়রানির শিকার বেশিরভাগ সময়ই হয় শিশু-কিশোররা। হয়তো বাংলাদেশে এই ধরণের ঘটনার দৌরাত্ম্য খুব বেশি নয় কারণ ইন্টারনেট এখনও পুরোপুরি সাবর্জনীন হয়ে ওঠেনি; তবে বিশ্বব্যাপী এই হয়রানি বা ‘সাইবার বুলিইং’ নিয়ে চলছে উত্তাল আলোচনা। বাংলাদেশে এই সাইবার বুলিইং- এর ব্যাপারটি হয়তো এখনও প্রকট হয়ে দাঁড়ায়নি তবে তা হওয়ার আগেই আমাদের এই সমস্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত।
ইন্টারনেটে হয়রানির গল্পগুলো না উঠে আসার পেছনে আরো কিছু কারণও রয়েছে। প্রথম কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে হয়রানির শিকার কিশোরেরা হয়তো বুঝে উঠতেই পারেনি যে তাদের সাথে যা হচ্ছে তা আসলে হয়রানি। দ্বিতীয় আরেকটি কারণ হতে পারে যে তারা ভয়ে, দ্বিধায় কিংবা লজ্জায় বলতে পারে না তাদের অসুবিধার কথা। এতে বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়া কী হবে, অন্যান্য মানুষ কটু কথা বলবে, বন্ধুরা তাদের দুর্বল মনে করবে কিংবা হয়তো তারা আর কখনও ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারবে না। এ সমস্যায় শিশু কিশোরদের মন বিষিয়ে উঠতে পারে। অথচ এই সমস্যার খুব সহজ সমাধান রয়েছে। আর এ সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে বড়দের; বিশেষ করে অভিভাবকদের এবং শিক্ষকদের।
প্রাথমিকভাবে অনেকে বলে বসতে পারেন, এত ছোট বয়সে ইন্টারনেট ব্যবহার করার প্রয়োজনই বা কি? ইন্টারনেট ব্যবহার অবশ্যই প্রয়োজন। কারণ তো আগেই উল্লেখ করেছি। এখনকার ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু-কিশোরেরাই ভবিষ্যতের প্রযুক্তি উন্নয়নের পুরোধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই প্রযুক্তি থেকে তাদের দুরে সরিয়ে রাখাটা কোনভাবেই সমাধান নয়। বরং কোন জিনিসটি ঠিক এবং কোন জিনিসটি ভুল তা শিক্ষা দেওয়াটাই সঠিক সমাধান।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে, এখানে শিক্ষকদের ভূমিকা কী? স্কুলে থাকলে তো শিক্ষকদের নজরদারিতেই শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়। আর বিনা নজরদারিতে তাদের ইন্টারনেট ব্যবহার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় তাদের নিজেদের বাসাতে। শুধু একজন শিক্ষকই নয় এবং অভিভাবক হিসেবেও বলতে পারি, এই ধারণা পুরোপুরি না হলেও আংশিক সত্য। যদি ব্যাপারটি তা হয়েও থাকে, তাহলে এই ব্যাপারটিতে একজন শিক্ষকের অনেক ভূমিকা রয়েছে। কারণ বাসায় বসে হয়রানির শিকার হলেও এর প্রভাব শ্রেণিকক্ষেও পড়বে।
একজন শিক্ষক তার শিক্ষার্থীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখতে পারে। যদি শিক্ষক নিজে সাইবার বুলিইং- এর ব্যাপারে সচেতন থাকেন এবং সমস্যা হওয়ার সাথে সাথে সমাধানের উপলক্ষ হয়ে উঠতে পারেন, তাহলে শিক্ষার্থীরা একটি বিশ্বাসের জায়গা থেকে সকল সংকোচ ভেঙে শিক্ষকদের সহায়তা গ্রহণ করতে চাইবে।
ফেসবুকসহ যোগাযোগের অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতজন কিংবা অনেক সময় অপিরিচিতজনরা নানাবিধ ঠাট্টা-মশকরা করে থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা হয়রানির পর্যায়ে পড়ে যায়। অনেক সময় না বুঝেও শিশু-কিশোররা অপরিচিতজনকে গোপন অনেক তথ্য দিয়ে দেয়। অনেকে অশালীন প্রস্তাবের সম্মুখীন হয়। আর সামাজিক কারণে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা এসব ব্যাপার দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয় এবং মানসিকভাবে আঘাত পায়। মাঝে মাঝে এই হয়রানি এমন প্রকট আকার ধারণ করতে পারে যা বিশেষভাবে অপ্রীতিকর এবং অবাঞ্ছিত ঘটনার জন্ম দিতে পারে। এই ধারণাগুলো যদি একজন শিক্ষক বুঝতে পারেন তাহলে তিনি এই সমস্যাগুলোর সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন।
স্কুল এবং স্কুল কর্তৃপক্ষও এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসতে পারেন। কারণ শুধুমাত্র শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, শিশু- কিশোরদের মানসিক বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তাদের স্কুল। প্রতি দিন সবচেয়ে বেশি সময় তারা কাটায় তাদের সহপাঠী এবং শিক্ষকদের সান্নিধ্যে। স্কুল তাদের শেখাতে পারে ভালো-মন্দের পার্থক্য, ইন্টারনেটে ব্যবহারের সময় কি কি করণীয়, বর্জনীয় এবং কেমন করে তারা আদর্শ ডিজিটাল নাগরিক হতে পারে। স্কুলগুলো এই ব্যাপারে কিছু বিশেষ নিয়ম-নীতি তৈরি করতে পারে কারণ ডিজিটাল মাধ্যমে স্কুল বা বাসার মধ্যে কোন পার্থক্য থাকে না।
কোন সমস্যা সমাধানের প্রথম ধাপ হচ্ছে সমস্যাটি স্বীকার করা। সাইবার হয়রানির ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। আর এজন্য শিক্ষকদেরকেও পরিচিত হতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর সাথে। পরিচিত হতে হবে মাধ্যমগুলোর সকল ব্যবহারপন্থার সাথে, বুঝতে হবে যে সেখানে কি ধরনের ভাষা ব্যবহৃত হয় এবং জানতে হবে হয়রানির বিভিন্ন উপায়গুলো। তাহলেই একমাত্র এ সমস্যা সমাধানে শিক্ষকদের ভূমিকা রাখা সম্ভব।
এই ধাপটির ফলে শিক্ষকদের সাথে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ আরও সহজ হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। আর তার পরবর্তী ধাপ হলো সরাসরি শিক্ষার্থীদের সাথে যোগাযোগ করা। তাদেরকে বোঝানো যে, যেকোন বিপদ-আপদে তাদের সহায়তার জন্য শিক্ষকরা রয়েছেন। তাদেরকে আরও বোঝানো উচিত যে হয়রানির শিকার হওয়াটা লজ্জার কোন বিষয় না বরং এই সমস্যার সমাধান হওয়া বেশি জরুরি। শিক্ষকদেরও বুঝতে হবে যে হয়রানির স্বীকার শিশু- কিশোররা এমনিতেই মানসিক সংকোচে থাকে। এজন্য তাদের সাথে কঠোর নয় বরং কোমলতার সাথে আচরণ করতে হবে। একমাত্র তখনই শিক্ষার্থীরা নিঃসংকোচে এগিয়ে আসবে যখন তারা জানবে যে তারা তাদের অসুবিধার জন্য শাস্তি পাবে না বরং তাদের সমস্যার সমাধানে সাহায্য করা হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে হয়রানির স্বীকার হওয়াতে কোনভাবেই তাদের কোন দোষ নেই।
অভিভাবকদেরও স্কুলগুলোর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করতে হবে। স্কুলের আয়োজনে এ সংক্রান্ত কর্মশালা বা মতবিনিময় আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে। প্রতি দুই বা তিন মাসে এরকম একটি আলোচনার আয়োজন করা যেতেই পারে। অনেক অভিভাকরা এখনও ইন্টারনেটের জগতের সাথে পরিচিত না। তাদের এসব ব্যাপারে জানতে হবে। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানই এরকম উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসছে।
এই সমস্যাটি কোনভাবেই ছোট নয়। তাই সমাধানে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকেই। অভিভাবক হিসেবে আমরা আমাদের সন্তানদের কোথাও একা বের হতে বা যেতে দেই না। তাদের বেড়ে ওঠার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের সব সমস্যার সমাধানে আমরা তাদের পাশে থাকি। তাহলে ইন্টারনেটের জগতে কেন তারা একা থাকবে?
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








