সংসদে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ইন্টারনেটের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ঘোষণা আসার পর প্রযুক্তিখাত সংশ্লিষ্টরা ভ্যাট তুলে নেয়ার আহ্বান জানাতে শুরু করে। বিশেষ করে মোবাইল ফোন অপারেটর, ইন্টারনেট সরবরাহকারী এবং প্রযুক্তিখাতের নেতৃস্থানীয়রা বলেছিলেন এই ভ্যাটের কারণে গ্রাহক পর্যায়ে ইন্টারনেটের দাম কমানো যাবে না। তাই বাজেট পাসের আগে ইন্টারনেটের দাম কমানোর দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা বাস্তবায়নে ডাক,টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার গেলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে। অর্থমন্ত্রী সাড়া দিলেন, ২৮ জুন সংসদে বাজেট পাস হলো, ইন্টারনেটের ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে নামিয়ে ৫ শতাংশ করা হলো। কিন্তু গ্রাহক পর্যায়ে প্রায় দুর্মূল্যের ইন্টারনেট থেকে গেলো অধরাই। গ্রাহক পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড এবং মোবাইল ইন্টারনেটের দাম বাজেট পাসের আগে যা ছিলো এখনো থেকে গেছে তাই। অর্থাৎ ইন্টারনেটের দাম কমেনি।
ভ্যাট ১০ শতাংশ কমানো হলেও ইন্টারনেটের দাম না কমানোর পক্ষে এখন ইন্টারনেট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান (আইএসপি) এবং মোবাইল অপারেটররা নিজেদের মতো সাফাই গাইছে। আইএসপি এবং মোবাইল অপারেটররা বলছে তারা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ইন্টারনেট ও সংশ্লিষ্ট সেবা ক্রয়ের বিনিময়ে যে ভ্যাট দিচ্ছে, সেখানে আগে রেয়াত নেয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ নামিয়ে আনায় তাদের আর এ সুবিধা থাকছে না। তাই এখনি ইন্টারনেটের দাম কমাতে পারছে না তারা।
বিটিআরসির সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮ কোটি ৭০ লাখ। তাদের মধ্যে আইএসপি থেকে ইন্টারনেট সেবা নিচ্ছে মাত্র ৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ। আর ৮২ শতাংশ অর্থাৎ সিংহভাগই মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করছে।
কিন্তু বাস্তবতা বলছে বাজেট পাসের পর মোবাইল ইন্টারনেটের দাম এখনো এক টাকাও কমেনি।
এই না কমার কারণ তুলে ধরে অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) মহাসচিব টিআইএম নুরুল কবীর চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: যেহেতু বিভিন্ন ধাপে ইন্টারনেটের সার্ভিসগুলো যায়। বিভিন্ন ধাপে ভ্যাট যুক্ত হয়। এখন এসব ধাপে রিবেট বা রেয়াত না পাওয়ায় আমাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এব্যাপারে আমরা মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বেসিস-এর সঙ্গে আলোচনা করেছি। এনবিআর এখন নতুন ভাবে এসআরও জারি করলে এই সমস্যা সমাধান হবে আশা করি। সমাধানের আগ পর্যন্ত আমরা আগের অবস্থাতেই থাকছি।
তবে বাজেট প্রস্তাবনার পর পরই নানা সভা-সেমিনার করে আইএসপি, মোবাইল অপারেটররা ১৫ শতাংশ ভ্যাট তুলে নেয়ার কথা বললেও এই রেয়াত সুবিধা থাকা না থাকার বিষয়টি নিয়ে টু শব্দও করেনি।
বাজেট পাসের আগে ভ্যাট কমানোর দাবির সঙ্গে এই রেয়াতের বিষয়ে আইএসপিগুলো এবং অ্যামটব কিছু বলেনি জানিয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: বাজেট প্রস্তাবনায় ইন্টারনেটে ভ্যাট ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাবের পর আমরা তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারসহ অর্থমন্ত্রী, এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে মিটিং করলাম। 
দুঃখজনক যে, এই মিটিং এর এক-দুইদিন আগে ভ্যাট কমানোর দাবি জানাতে অ্যামটব, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) সহ যে সংবাদ সম্মেলন করেছিলাম সেখানে কিন্তু তারা এব্যাপারে কিছু বলে নাই। আমরা বেসিস, শুধু ভ্যাট কমানোর কথা বলেছি। কিন্তু অ্যামটব, আইএসপিএবি তখনো বলেনি যে ভ্যাট কমালে এধরণের জটিলতা হতে পারে। হয়তো তাদের ধারণা ছিলো ভ্যাট কমালেও তারা আগের মতো রেয়াত সুবিধা পাবে।
তিনি আরও বলেন: জটিলতা সমাধানে ইতোমধ্যে আমরা এনবিআর-এর সঙ্গে বৈঠক করেছি। এনবিআর অ্যামটব,আইএসপিএবি’র কথা মূল্যায়ন এবং দুই সংগঠনের দেয়া সমাধান ফর্মুলা পর্যালোচনা করছে। এই জটিলতা কাটিয়ে উঠতে একটু সময় লাগবে। এনবিআর এর সঙ্গে কথা বলে যেটা বুঝলাম যে সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ পর্যন্ত গ্রাহকদের অপেক্ষা করতে হবে। এসময় পর্যন্ত গ্রাহককে ইন্টারনেটের জন্য আগের মতো দাম দিতে হবে।
বাজেট পাসের পর দুই সপ্তাহের বেশি পেরিয়ে গেলেও এখনো কেন ইন্টারনেটের দাম কমছে না এই প্রশ্নের জবাব চান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার।

চ্যানেল আই অনলাইনকে তিনি বলেন: আমরা আইএসপি এবং মোবাইল অপারেটরদের জবাব চেয়েছি। আশা করছি সপ্তাহ খানেকের মধ্যে তাদের জবাব পেয়ে যাবো। আমরা বিটিআরসিকেও জানিয়েছি, বিটিআরসি জানিয়েছে তারা এ বিষয়ে নোটিশ দিয়েছে। আমি নিজে এনবিআর চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। অর্থমন্ত্রী দেশের বাইরে আছেন, তিনি আসলে তাকেও জানাবো যে সরকারের নির্দেশ কিভাবে অমান্য করা হচ্ছে।
এ অবস্থায় ইন্টারনেটের দাম নিয়ে কয়েকজন ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবফারকারী কয়েকজন শিক্ষার্থী, চাকুরিজীবীর সঙ্গে কথা বললে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বাজেটে কোন কিছুর ওপর সরকার ভ্যাট বা সরচার্জ বাড়ালে রাতের মধ্যেই সেটা কার্যকর হয়ে যায়। অথচ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেটের দাম কমাতে সরকার ভ্যাট কমিয়ে মাত্র ৫ শতাংশ করার পরও নানা অযুহাতে গ্রাহকের পকেট কাটা থামেনি।







