একটি ছেলে আর একটি মেয়ের বিয়ে নামক সামাজিক আচারটি হয় দুটো পরিবারের মধ্যে। সামাজিক এই বন্ধনটিকে ধর্মীয় রীতি আর রেওয়াজ মেনে যিনি বিয়ের কাজটি পরিচালনা করেন তিনি হলেন কাজী। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় দু’টো বাড়ির বিয়েকে কেন্দ্র করে তাণ্ডব হয়; সেই তাণ্ডবে আবার জুটে যায় তৃতীয় পক্ষীয় পাণ্ডব। কোনো কারণে বিয়ে বাড়ি যখন শোকের বাড়িতে পরিণত হয়, সেই পরিণতির জন্য কি আমরা কাজীকে দোষারোপ করি?
বিয়ে পড়ানো যেমন কাজীর কাজ, সব নির্বাচন পরিচালনা করাও কিন্তু ইসির কাজ। এই নির্বাচন নামক গণতন্ত্রের বিয়ের দিন রাজনৈতিক দলগুলো যে তাণ্ডব চালায় সে কারণে কাজী রকিবউদ্দিনকে কাজী না বলে পাজি বলাতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে সব মহল। আমরা যে যতো বুলি আওড়াই না কেনো, স্বীকার তো করতেই হবে দিশেহারা উদ্ভ্রান্ত পাঁচজন কমিশনারের কী করার আছে?
রাষ্ট্র যখন রাজনীতির মধ্যে না থেকে শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতা অপব্যবহারে অঙ্গুলি চালায় তখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের কর্ম-কর্তব্য থাকে না, বরং কর্তা গুণে কর্ম করতে ব্যস্ত থাকে প্রশাসনিক দপ্তরগুলো।
বাদ দিলাম ভারী কথা। এবার আসি মূল কথায়।
ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ২২ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ ১০ দিনের ব্যবধানে নির্বাচনী সহিংসতায় প্রাণ গেছে ৩২ জনের। কেনো গেলো প্রাণগুলো? কেনো নির্বাচন শুধু ব্যালটের যুদ্ধ হলো না? কেনো নির্বাচনকে বুলেট যুদ্ধে
নামতে হলো? সব দায় কি শুধু নির্বাচন কমিশনের? বিয়ে ভেঙ্গে যাবার জন্য যেমন বিয়ের কাজীকে দোষ দিয়ে লাভ নেই তেমনি নির্বাচনী সহিংসতার জন্য ইসির কাজীর ঘাড়ে দোষ দিয়ে সবার দায়িত্ব আড়াল করা সম্ভব না।
কী কী কারণে ভালো হলো না নির্বাচন, কী কী কারণে বাঁচানো গেলো না প্রাণগুলো? একটু চিন্তা করলেই কিছু কারণ পাওয়া যায়।
২০১১ সালে নির্দলীয় ইউপি নির্বাচনে প্রাণহানি হয়েছিলো তিনজনের আর নির্বাচন হয়েছিলো দুইদফায়। এবার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে, হচ্ছে আধা ডজন দফায়।
আসলে যে সমস্যা
১. দলীয় প্রতীকে নির্বাচন কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে না পারার ব্যর্থতা
২. বেশি কমিশনার হবার কারণে নির্বাচন কমিশনারদের সমন্বয়হীনতা
৩. তৃণমূলে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর হাজারো ভাঙ্গন, ঐক্যের কোনো চেষ্টা না থাকা
৪. জেলার সঙ্গে ইউনিয়নের নেতাদের মারমুখী দূরত্ব
৫. এমপি, জেলা প্রশাসক এবং থানার ওসিদের এক সুতায় গাঁথা প্রেম অর্থাৎ দলীয় প্রতীকের একজন প্রার্থীর প্রশাসনের প্রার্থী হয়ে যাওয়া
৬. নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল সক্রিয়ভাবে না থাকায় একপক্ষের নির্বাচনে নিজের আয়নার সঙ্গে নিজের যুদ্ধ
৭. নির্বাচনী এলাকাগুলোতে পুলিশের ভূমিকা গুণ্ডা আর খুনিদের কোলেপিঠে নিয়ে বসে থাকার মতো। আগের রাতে
নির্বাচনী এলাকাগুলোতে গিয়ে সন্ত্রাসী ধরার বদলে নেতা আর সন্ত্রাসী খুঁজে পুলিশের মুরগী-পোলাওভোজন।
৮. স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে যারা টহলে থাকেন নির্বাচনী এলাকায় তাদের ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতো অবস্থা, কেউ কেউ তাদের বলছেন মাছরাঙ্গা।
৯. রিটার্নিং এবং প্রিসাইডিং অফিসার যারা আছেন তাদের অনেকের ভাড়াটের মতো আচরণ; তাদের উপর ইসির না থাকে নিয়ন্ত্রণ না আছে জানা শোনা, না আছে তাদের দায়বদ্ধতা। দলীয় ক্যাডারদের সামনে বরাবরই তাদের নিজের জীবন নিয়ে বাড়ি ফেরার অপেক্ষা দেখে মনে হয় প্রতি মুহূর্তে তারা বলেন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি
১০. আনসার ভিডিপির কথা কী বলবো? গ্রামের অবলা মা-বোনদের হাজার বারোশ’ টাকার জন্য হাতে লাঠি দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু তারা কেনো লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, কী তাদের দায়িত্ব কিছুই জানে না; নাই কোনো প্রশিক্ষণ আর পুরুষ আনসার ভিডিপির ক্ষেত্রে বেশিরভাগই দলীয় লোকজনকে ধরে এনে দায়িত্ব দেয়ার কাণ্ড-কীর্তি।
এমন অনেক কারণ আছে নির্বাচনে সহিংসতা আর প্রাণহানি ঘটার যা লিখলে আরব্য রজনীর কাছাকাছি পৃষ্ঠাসংখ্যা হবে। কী করবে ইসি? কী করার আছে? রাজনীতি পাল্টে গেলে এক লহমায় পাল্টে ফেলা যাবে নির্বাচন কমিশনকে। কিন্তু রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের বদল করার জন্য বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
তবে সব নির্বাচন সব কিছু ছাড়া যারা পারে সুন্দর করতে তারা কি দাঁড়াচ্ছে ভোটের লাইনে? ২০০৮ সালে ৩৩ শতাংশ তরুণ ভোটার কিন্তু বদল করেছিলো প্রেক্ষাপট। সাত বছর পর ফিরেছিলো গণতন্ত্র। অথচ ২০০৮ এর পর থেকে কোনো তরুণ প্রজন্মকে ভোটের লাইনে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সব নির্বাচনে বয়স্ক আর মধ্যবয়স্ক নারীপুরুষ এখনো ভোটের লাইন দীর্ঘ করেন আর যারা আগামী গণতন্ত্রের বাতিঘর উনারা প্রতিটি
কেন্দ্রের আশেপাশে বুকের তিনটা বোতাম খুলে চোখে লাল নীল গণতন্ত্রের সানগ্লাস পরে ব্যাক পকেটে বুলেট নিয়ে ব্যালট ছিনতাই এর মহড়াতে ব্যস্ত থাকেন।
কী করে আসবে গণতন্ত্র! নির্বাচন কমিশন এর কাছে এফডিআর করেতো আর গণতন্ত্র ঠেকানো যাবে না। গণতন্ত্র বাঁচাতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকায় আসতে হবে, তা না হলে গণতন্ত্রের ভল্ট ভেঙ্গে বারবারই খালি হবে মায়ের বুক, সাংবিধানিক দুর্যোগে বাড়তে থাকবে প্রাণহানি।
নির্বাচন কমিশনের অবস্থা দেখে রবি ঠাকুরের একটি গানের কথাই মনে পড়ে: ‘আমার পথে পথে পাথর ছড়ানো, আমার ঘোড়া তোমার হাতে লাগাম পরানো, আমার পথে পথে পাথর ছড়ানো।’
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







