প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের বর্তমান মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ২৪ আগস্ট। নতুন উপাচার্য নিয়োগের জন্য- বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট যে তিনজন শিক্ষকের নাম সুপারিশ করেছে, তাদের মধ্যে এবারও প্রথম নামটি রাখা হয়েছে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিকের। বিগত আট বছরের বেশি সময় ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করার পরও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাই শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারী চায় পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক দায়িত্ব গ্রহণ করুক। কেননা, বিগত আট বছরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যা দিয়েছেন তা অনেক উপাচার্যই দিতে পারেনি। বিগত এই সময়ে তিনি তার কর্মদক্ষতা ও গুণাবলী দিয়ে মন জয় করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের।
২০০৯ সালে উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি তার পুরো সময়টাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে কাজে লাগিয়েছেন। এই বয়সেও তিনি কঠিন অনিয়মের মধ্যে জীবন-যাপন করেন! তার সকাল শুরু হয় ভোর ৬ টায় আর রাতে ঘুমাতে যান ২টায়। দুপুরের খাবার খান সন্ধ্যায়! আর রাতের খাবার খান রাত ২টায়! বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল কার্যক্রমকে নিয়মিত রাখতেই নিজেকে অনিয়মের ফ্রেমে বন্দী করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকতা-কর্মচারীসহ প্রত্যেকের জন্য উপাচার্যের সাক্ষাৎ গ্রহণ খুবই সহজ বিষয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাকে যেমন অফিসে পাওয়া যায়। তেমনি, রাত ৯ টা থেকে রাত ২ টা বা ক্ষেত্রবিশেষে ভিজিটর বেশি থাকলে রাত ৩ টা পর্যন্তও তাকে তার বাসভবনের সাক্ষাৎ কক্ষে পাওয়া যায়।
ছোট বড় নির্বিশেষে প্রত্যেকের সাথে বসে কথা বলা এবং তাদের আপ্যায়ন করা তার এখনকার অভ্যাস নয়। তিনি উপাচার্য হবার আগেও তার বাসায় ছিল এই সময়ের মতই শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অবাধ যাওয়া-আসা। এমনও হয়েছে রাত ২ টায় তার বাসার সবাই ঘুমিয়ে পড়ায় তিনি নিজ হাতে কাবাব ভেজে তার ছাত্রদের আপ্যায়ন করেছে। যা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বেও বিরল!
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেতাদের অনেকের সাথেই নবীন শিক্ষকদের বহর থাকে। সেটা সকাল বা সন্ধ্যার হাঁটার সময় থেকে শুরু করে মসজিদে নামাজ পড়তে যাবার সময়ও! যারা ঐ শিক্ষককে প্রটোকল দিয়ে থাকে। অন্যদিকে, এই উপাচার্যকে প্রায়ই দেখা যায় মসজিদের সামনের কাতার তো দূরের কথা মসজিদের ভেতরেও নয়, রাস্তায় বসে সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে তার নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজ আদায় করতে! তার প্রিয়জনরা এ বিষয়ে তাকে কিছু বললে উত্তরে তাকে বলতে শুনেছি- ‘আমি তো সবসময় উপাচার্য থাকবো না, এটা টেমপোরারি পোস্ট, বাকি সময় তো ওনাদের সাথেই কাটাবো।’
২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে কঠিন সময় পার করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এ পরিস্থিতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কেননা, এই সময়ে এক মুহূর্তের জন্যও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটেনি। এমনকি তার আমলের প্রায় ৮ বছরে এক দিনের জন্যও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হয়নি। যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। নির্বাচনকালীন বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্থ হলে- তিনি সে সময়ে সাপ্তাহিক ছুটি বন্ধ ঘোষণা করে শুক্র ও শনিবার বিশ্ববিদ্যালয় চালু রেখে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রেখেছিলেন। এর ফলেই সবার পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশন জটের স্থান আজ জাদুঘরে।
রাজনীতির আতুর ঘর বলে পরিচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্ত্রের মহড়া আর গোলাগুলি ছিল খুবই স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেটাও জাদুঘরে গিয়েছে। ছাত্রনেতারা এখন আর অস্ত্রের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেনা। ছাত্রনেতারা ক্লাস শেষে এখন মধুতে যায় এবং লেখাপড়ার পাশাপাশি বইও লেখে।
এসবের পাশাপাশি, আরো কিছু দুঃসাহসিক কার্যক্রম তিনি তার আমলে সম্পন্ন করেছেন। যা বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলকে অনুপ্রাণিত করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারিদের স্বার্থে আন্দোলন করে ছাত্রত্ব হারিয়েছিলেন। এই উপাচার্যের নেতৃত্বেই বিশ্ববিদ্যালয় সেটি প্রত্যাহার করে নিয়ে সৃষ্টি করেছে ইতিহাস। যেটিতে আরেফিন সিদ্দিক নায়ক তার দুঃসাহসিক সিদ্ধান্তের জন্য। কেননা, বিগত ৫০ বছরের বিভিন্ন সময়ে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও বঙ্গবন্ধুর ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেবার সাহস কোন উপাচার্য দেখাইনি। শুধু তাই না, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট জাতির জনকের বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমনের কথা ছিল। তাকে বরণ করে নেবার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ছিল প্রস্তুত। বঙ্গবন্ধুকে বরণ করে নিতে রচিত হয়েছিল মানপত্র এবং তৈরি হয়েছিল আসন। বঙ্গবন্ধুর জন্য সংরক্ষিত সেই চেয়ারটি এতদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়েই ছিল, যেটিও কোন উপাচার্য বিগত সময়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামনে প্রদর্শনের সাহস দেখাইনি। বঙ্গবন্ধুর জন্য সংরক্ষিত চেয়ার ও তার উদ্দেশ্যে রচিত মানপত্র অাবিষ্কৃত হয়েছে এই উপাচার্যের হাত দিয়েই।
তার সময়েই নতুন ৭৫টি প্রতিষ্ঠান অধিভুক্ত হয়েছে, আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে রোবোটিক্স এন্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, সমুদ্র বিজ্ঞান, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগসহ নতুন ২৫ টি বিভাগ চালু হয়েছে, ২০০টি চুক্তি সাক্ষরিত হয়েছে, ১২৩ টি ট্রাস্ট ফান্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, র্যাংকিং বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম কুড়িয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। নতুন বিভাগের গ্রাজুয়েটরা ইতিমধ্যে স্ব স্ব ক্ষেত্রে দেশ ও দেশের বাইরে নেতৃত্ব দিচ্ছে। বছরের প্রথম দিন যেমন নতুন বর্ষের ক্লাস শুরু হচ্ছে, তেমন নিয়মিত সমাবর্তনের মাধ্যমে গ্রাজুয়েটদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের সমাপ্তি হচ্ছে শুধু তার সময়েই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট আনাও সম্ভব হয়েছে তার পক্ষেই। শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ২টি নতুন হল, রোকেয়া হলে ৯ তলা ৭ই মার্চ ভবন নির্মিত হয়েছে এবং বঙ্গবন্ধু হলের ২০ তলা নতুন ভবন, শিক্ষকদের জন্য ৩ টি আধুনিক ভবন, কর্মচারীদের জন্য ১টি এবং কর্মকর্তাদের জন্য ২০ তলার রাসেল টাওয়ারের কাজ শুরু হয়েছে। ই-লাইব্রেরি, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিকে ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় এনে ই-রিসোর্স বাড়ানোর পাশাপাশি নানা আধুনিক সুবিধা চালু হয়েছে এই সময়ে।
বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা যখন গাড়ী বিলাসিতা ও দুর্নীতির দায়ে ক্যাম্পাসে আটক থেকেছেন- সেখানে এই উপাচার্যের চরম শত্রুর পক্ষেও বলা সম্ভব নয় তিনি অসৎ। এমনকি বিগত আট বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজের জন্য প্রাপ্ত এক কোটি পঁচিশ লাখ টাকার সিটিং অ্যালাউন্সও সে গ্রহণ করেনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাটতি মেটাতে! যা বর্তমানে শুধু দুর্লভ নয় অবিশ্বাস্য। কেননা একজন শিক্ষকের কাছে এক কোটি পঁচিশ লক্ষ টাকা অনেক টাকা এবং সেটা তার পারিশ্রমিক কোন অসৎ পথের উপার্জন নয়।
সব অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কথা বলে- বঙ্গবন্ধুর আর্দশের প্রতি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সমিতির নীল দলের রাজনীতির সাথে যুক্ত এই শিক্ষক। তার নেতৃত্বেই নীল দল বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীনও শিক্ষক সমিতির নেতৃত্ব দিয়েছিল। তিনি শুধু আওয়ামী লীগের সময়েই শিক্ষক সমিতির নেতা ছিলেন না, যখন বিএনপি ও জাতীয় পার্টি ক্ষমতায় তখনও তিনি শিক্ষক সমিতির সভাপতি, সধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন তার অসাধারণ নেতৃত্বের কারণেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অনুষ্ঠিত সমাবর্তনে ড. ইউনুস কে ডক্টরস অব লজ ডিগ্রীতে ভূষিত করলে- সেই সময় যে সকল শিক্ষক সমাবর্তন বর্জন করেছিল তাদের নেতৃত্বও দিয়েছিল এই শিক্ষক।
এই দীর্ঘ শিক্ষক রাজনীতির জীবনে বহুবার তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ছাত্রদলের অনেক হামলার সম্মুখীন তাকে হতে হয়েছে। যেই সংগঠনের নেতৃত্ব তিনি নিজে দিয়েছেন, যেই সংগঠনের কর্মীদের নিজের সন্তানের মতো দেখেন, একমাত্র তারাই- তিনি গাড়িতে থাকাকালীন তার উপর আক্রমণ করেছিল। যেটি যে কোন ঘটনার জন্ম দিতে পারতো। সেদিন যারা নিজ হাতে তার গাড়ি ভাঙচুর করেছিল তারা এখনও এই উপাচার্যের বাসা বা অফিসে গিয়ে নানা সমস্যার সমাধান নিয়ে আসছে। অন্যদের মতো এনাদেরকেও তিনি আপ্যায়ন করছেন! সাথে দাঁড়িয়ে ছবি উঠছেন! তার প্রিয়জনরা কিছু বললে তিনি উত্তরে বলেন-‘এসব বাদ দাও ওরা ছোট, না বুঝে করে ফেলেছে।’ এই ব্যবহার সত্যিই আজ দুর্লভ!
বাংলাদেশের কোন শিক্ষক উপাচার্যের দায়িত্বে থাকাকালীন একই সাথে বিভাগে ক্লাস নেন এমনটা আমার জানা নেই। কিন্তু, সকল প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি এত ব্যবস্থার মাঝেও এই উপাচার্যকে নিয়মিত ক্লাসরুমে দেখা যায়। ক্লাস শেষে উপাচার্যের অফিসে অনেক শিক্ষার্থীই এসে বলে- ‘স্যার, ক্লাসে বিষয়টি বুঝতে পারেনি..।’ আবার, কেউ এসে বলে- ‘স্যার একটু দেরিতে আসায় আমার এ্যাটেনডেন্স মিস হয়ে গেছে..!’ তিনি তার অফিসে বসেই শিক্ষার্থীদের সমস্যার সমাধান দিয়ে দেন। উদারতা, সরলতা, নির্মোহ, নির্লোভী ও বিচক্ষণতার মূর্ত প্রতীক এই শিক্ষক।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)







