এ যেন আরেক জাহালম কাণ্ড। মাদক মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত শাহাবুদ্দিন বিহারির পরিবর্তে আসামি হিসেবে ৩ বছর ধরে কারাগারে ‘নির্দোষ’ আরমান।
অবশেষে আরমানের মুক্তি ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে করা হয়েছে একটি রিট। যার শুনানি হবে আগামী মঙ্গলবার।
এ বিষয়ে রিটের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: ‘কারাগারে আরেক জাহালম’ শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন যুক্ত করে রোববার হাইকোর্টে রিটটি করে ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশন। এরপর বিচারপতি বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি খাইরুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে রিট আবেদনটি উপস্থাপন করলে আদালত এবিষয়ে শুনানির জন্য আগামী মঙ্গলবার দিন ধার্য করেছেন।
রিট আবেদনে কারগারে আটক থাকা আরমানকে হাইকোর্টে হাজিরের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এবং তাকে আটক রাখা কেন অবৈধ হবে না সেই মর্মে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া এ রিট আবেদনে আরমানের জন্য পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে বলে জানান রিটের পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার হুমায়ুন কবির পল্লব।
গত ১৮ এপ্রিল ‘কারাগারে আরেক জাহালম’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরমানের মা এবং আরও কিছু সূত্রের বরাতে বলা হয়: ২০০৫ সালের ৩০ আগস্ট গভীর রাতে পল্লবীর ৬ নম্বর সেকশনের সি-ব্লকের ৮ নম্বর লেনের ৭ নম্বর ভবনের নিচতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে ৪০ বোতল ফেনসিডিলসহ শাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।
এসময় শাহাবুদ্দিন ছাড়াও গ্রেপ্তার হয় তার দুই সহযোগী সোহেল মোল্লা ও মামুন ওরফে সাগর। এরপর তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য আইনে পল্লবী থানায় মামলা করা হয়। এবং ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার ৩ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
এরপর এ মামলায় দুবছর জেল খেটে জামিন পান শাহাবুদ্দিন। পরবর্তী সময়ে ২০১১ সালের ১৭ জানুয়ারি আদালতে আত্মসমর্পণ করে স্বাক্ষরযুক্ত জামিননামার মাধ্যমে জামিন নেন তিনি। কিন্তু পরে আর আইনের মুখোমুখি না হয়ে ফেরারি হয়ে যান শাহাবুদ্দিন।
অবশেষে ২০১২ সালের ১ অক্টোবর শাহাবুদ্দিন ও তার দুই সহযোগীর প্রত্যেককে ১০ বছর করে কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানা করে রায় দেন জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী ঢাকার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল। সেই সাথে পলাতক শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে জারি হয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।
এরপর ২০১৬ সালের ২৭ জানুয়ারি সকালে পল্লবী এলাকায় অভিযান চালায় পল্লবী থানা পুলিশ। এসময় পল্লবীর বেনারসি কারিগর মো. আরমান বাসায় নাশতা সেরে পাশের একটি চায়ের দোকানে যান। সেখান থেকে তাকে আটক করে।
এর তিন দিন পর থানার এক পুলিশ সদস্য গোপনে আরমানের মাকে জানান, আরমান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এবং তাকে একটি মাদক মামলায় সাজা পরোয়ানাভুক্ত আসামি হিসেবে আদালতে সোপর্দ করে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পরে আরমানের মা ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে আরমানকে মেঝেতে মুমূর্ষু অবস্থায় দেখতে পান। এরপর অসুস্থ অবস্থাতেই আরমানকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে (বকশীবাজার) নেয়া হয়। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় কাশিমপুর কারাগারে। বর্তমানে আরমান কাশিমপুর কারাগারেই আছেন।
আরমানের পরিবারের অভিযোগ: পুলিশের ভুলে অথবা গোপন কারসাজিতে শুধু পিতার নামে (মৃত ইয়াসিন) মিল থাকায় মৃত ইয়াসিন ওরফে মহিউদ্দিনের ছেলে শাহাবুদ্দিনের পরিবর্তে দীর্ঘ ৩ বছর ধরে ‘নির্দোষ’ আরমান (৩৬) সাজা ভোগ করছেন। অন্যদিকে প্রকৃত আসামি শাহাবুদ্দিন আরমানের বন্দিত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য লাগাতার চাপ দিয়ে যাচ্ছেন। যে শাহাবুদ্দিন এর আগে ২০০৫ সালে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী হয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল।
আরমানের স্ত্রীর বরাতে পত্রিকার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়: শাহাবুদ্দিন গত ২৭ মার্চ তার ছোট স্ত্রী চান্দাকে নিয়ে কাশিমপুর-২ নম্বর কারাগারে আরমানের সঙ্গে দেখা করেন এবং হুমকি দিয়ে বলেন, মামলা নিয়ে যেন বাড়াবাড়ি না করা হয়।
‘‘বাড়াবাড়ি করলে ডিবি, থানা-পুলিশ, উকিল সব কিন্তু ফাঁসবে। তারা ফাঁসলে তোমাকে ছাড়বে না। আমার মামলায় তুমি জেল খাটছ, তাই আমিই তোমাকে বের করব। তোমার মাকে বলো, তোমার উকিলের কাছ থেকে যেন লিখিত নিয়ে আসে যে আমি এই মামলা আর পরিচালনা করব না।
তোমাকে ছাড়াতে যা যা করার লাগে সব করব। আর বাড়াবাড়ি করলে পুলিশ সবার মাজায় রশি দিয়ে সব ধরে আনবে। তখন কিন্তু আমারে কিছু কইতে পারবা না।’’
সম্প্রতি পাটকল শ্রমিক জাহালমের ‘ভুল আসামি’ হয়ে ২৬ মামলায় প্রায় ৩ বছর কারাভোগের ঘটনাটি পত্রিকায় প্রকাশের পর সারা দেশে আলোচনার ঝড় উঠে।
একপর্যায়ে জাহালমের বিষয়টি হাইকোর্টের নজরে আনা হলে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ জাহালমকে মুক্তির নির্দেশ দেন। হাইকোর্টের ওই নির্দেশের কয়েক ঘণ্টা পরই কারাগার থেকে মুক্তি পান জাহালম।








