আরিফা নামের যে ব্যাংকার তরুণীটি কদিন আগে রাজধানীতে নির্মমভাবে খুন হয়ে গেল তার জন্যে এ শহরের কারো চোখ অশ্রুসিক্ত হয়নি, হবেও না। এই ঘৃণ্য নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে কেউ রাস্তায়ও নামেনি।পত্রিকায় যারা সামাজিক, রাজনৈতিক ইস্যুতে নিয়মিত বিবৃতি দেন তারাও নিশ্চুপ নিস্প্রভ থেকেছেন।আসলে এই শহরের একটা বড় দোষ হলো, রাজনৈতিক, সামাজিক পরিচিতি না থাকলে সে যত নির্মমভাবেই খুন হোক না কেন তাঁর জন্যে কারো মন কেঁদে উঠে না। কোনো প্রতিবাদ হয় না। এ কারণেই আরিফা হত্যাকান্ড নগরবাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আর আরিফার গায়ে রাজনৈতিক কোনো লেভেল না থাকার কারণে শহরের উচ্চকিত কন্ঠস্বরগুলোও নিস্প্রভ থেকেছে। নিশ্চিত রাজনীতির গন্ধ থাকলে অনেক নেতা সহমর্মিতা জানাতেন, বাসায় যেতেন। টেলিভিশনে এই হত্যার বিচার চেয়ে কথা বলতেন। কিন্তু তার কিছুই হয়নি। আরিফার জন্যে এই শহরের কেউ কাঁদেনি।
সমসাময়িককালে নগরে ঠিক এমন নির্মমভাবে কোনো তরুণীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি বলেই মনে হয়েছে। আরিফাকে খুন করেছে তার প্রাক্তন স্বামী। যার নাম ফখরুল ইসলাম রবিন। সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজে প্রাপ্ত ছবি আর প্রাথমিক আলামতে পুলিশ এবং আরিফার ভাইবোন নিশ্চিত হয়েছে আরিফাকে রবিনই খুন করেছে।
এখন পর্যন্ত এই খুনিকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। এদিকে ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভিডিও ফুটেজের চিত্র অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে নিজ বাসা থেকে ফোনে কথা বলতে বলতে আরিফা রুম থেকে বের হয়ে বাসার মূল গেটের দিকে যাচ্ছেন।এরপর সামনে এক যুবকের হাতে দুটি ব্যাগ আর পেছনে আরও দুটি ব্যাগ হাতে আরিফা যুবকের পিছে পিছে ফ্লাটের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। এরপরেই সেই যুবক দৌড়ে গেট দিয়ে পালিয়ে গেলেন।
পুলিশ ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে বলেছে যিনি এসেছিলেন তিনিই আরিফাকে খুন করে পালিয়ে যায়। আর এই খুনিটি হলেন আরিফার সাবেক স্বামী রবিন। এখন পর্যন্ত এই পাষন্ড খুনি গ্রেফতার হয়নি। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরিফা জামালপুরের মেয়ে। ইডেন কলেজে লেখাপড়া করেছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট মতে কয়েকবছর আগে ভালবেসেই ফখরুলের সাথে ঘর বেঁধেছিলেন আরিফা। যমুনা ব্যাংকে তিনি চাকরি করতেন। আরিফার ভালোবাসা আর বিয়ের খবর পরিবারের কেউ তেমন একটা জানতো না। কিন্তু স্বামী রবিন ভীষণরকম মাদকাসক্ত হওয়ার কারণে আরিফার সাথে রবিনের দূরত্ব বাড়তে থাকে। এরই জের ধরেই স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিনকে ডিভোর্স দিয়ে আরিফা সেন্ট্রাল রোডের যে বাসাতে খুন হন সেই বাসার নিচতলাতে অসুস্থ মাকে নিয়ে সাবলেট থাকতেন।
আরিফার ভাই এবং পুলিশের মতে, আরিফাকে হত্যা করবে বলে রবিন শুরু থেকেই হুমকি দিতে থাকে। কিন্তু আরিফা চাকরিকে অবলম্বন করে বেঁচে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। আর তাই বিপদের কথা ভেবে রবিনকে সে এড়িয়ে চলতে থাকে। রবিন তাই নতুন এক ফাঁদ পাতে। কৌশলে সে আরিফার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করে।
সেই ধারাবাহিকতায় সে আরিফাকে এই ধরনের টোপ দেয় যে, তার বাসায় আরিফার যে জিনিসপত্র আছে সেগুলো সে ফিরিয়ে দিতে চায়। প্রথম প্রথম আরিফার মন সাঁয় না দিলেও রবিন তাকে ছলেবলে বুঝাতে সক্ষম হয় সে সত্যি সত্যিই আরিফার জিনিসপত্রগুলো ফেরত দেবে। জিনিসপত্রগুলো ফেরত দিতে সে বাসায় আসবে। আরিফা সরল মনে রবিনের কথা বিশ্বাস করে।
সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজটি প্রমাণ করেছে আরিফার সাবেক স্বামী ফখরুল ইসলাম রবিন সূক্ষ্ম এক কৌশল অবলম্বন করে মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে আরিফাকে খুন করে কোন বাঁধা ছাড়াই বাসার গেট পেরিয়ে চলে যেতে সক্ষম হয়। আরিফাকে খুন করার জন্যে রবিন খুব বেশি সময় নেয়নি। সিঁড়ির কাছে আসতেই সে আরিফা গলায়, পেটে ছুরিকাঘাত করে। সিঁড়িতে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। রক্তক্ষরণে দ্রুতই মৃত্যু ঘটে আরিফার।
আসলে রবিনকে বিশ্বাস করে বাসায় ঢুকতে দেওয়ার কারণে আরিফা বুঝতেই পারেনি পাষন্ডপুরুষ তাকে খুন করতে আসছে। ফলে প্রতিরোধও সে করতে পারেনি। আর সেটা করলেও বা কী হতো? এরকম ঘটনা চোখের সামনে ঘটার পরওতো আমরা দরজার খিল আরো জোরেসোরে এঁটে বসে থাকি। কেউ এরকম ঘটনার শিকার হলে প্রতিরোধতো দূরে থাক পারলে আমরা শহরের মানুষগুলো চোখ বন্ধ করে বসে থাকি।
বলতে দ্বিধা নেই আরিফা হত্যাকাণ্ড পুরুষদের ভেতরের কদর্য চেহারাটা যেনো ফের উন্মোচন করেছে। পুরুষ তার শক্তি দেখিয়েছি একজন নারীকে হত্যা করে। ধারণা করি ভালোবেসে বিয়ে করার পরও বাঁচার জন্যে এবং একটু সুখের জন্যেই রবিনকে পরিত্যাগ করেছিল আরিফা। হয়ত চেয়েছিল মাদকাসক্ত স্বামীকে পরিত্যাগ করে মায়ের আশ্রয়েই সে আপাতত নিরাপদে থাকবে। চাকরি আর মাকেই তাই অবলম্বন হিসেবে নিয়েছিল। কিন্তু খুনি রবিনের নিষ্ঠুরতার কাছে শুধু আরিফা নয়, পুরো সমাজই যেনো হেরে গেল। বিষয়টি ঠিক যেনো এরকম, নারীর নিজের বলে কিছুই নেই। খুনি রবিন যে কতটা নিষ্ঠুর নির্মম সেটা সে আবার প্রমাণ করেছে আরিফাকে খুন করে।আবার ১৬ মার্চ ঐদিনই ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, ফেসবুকে অনুশোচনাতো দূরে থাক উল্টো লিখেছে আরও অনেককে সে দেখে নেব। এই না হলে যোগ্য খুনি! 
এই টার্গেট খুনের জবাব কী? ঠিক গত বছর চট্টগ্রামেও নির্মমভাবে খোলা রাস্তায় খুনের শিকার হন পুলিশের তৎকালীন এসপি বাবুল আখতারের স্ত্রী মিতু। মিতুর রক্তে জিইসি মোড়ের রাস্তা ভেসে গিয়েছিল। আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের কোনো সুরাহা এখনও হয়নি। খুনের সাথে কে বা কারা জড়িত তা এখনও রহস্যাবৃত। এর আগে কুমিল্লাতে তরুণী তনুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। রিসা নামের লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রীটিকে খুনি কতোই না নির্মমভাবে হত্যা করলো।
এসব হত্যাকাণ্ডকে আমরা কীভাবে বিশ্লেষণ করবো? নারীর প্রতি এই যে সহিংসতা, নির্মমতা আমাদেরকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? দিন যতই যাচ্ছে, ততই এই ধরনের সহিংসতা, নির্মমতা বাড়ছে আর বাড়ছে। প্রায়শই এই শহরে আমরা দেখছি নারীর হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার হচ্ছে। বস্তাবন্দী লাশ উদ্ধার হচ্ছে। নারীর প্রতি এই নিষ্ঠুরতা যেনো বেড়েই চলেছে।
প্রাণচঞ্চল তরুণী আরিফাকে ভীষণ নিষ্ঠুর আর নির্মম কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। রিপোর্ট মতে তার ডান কানের পেছনে গলা বরাবর তিন ইঞ্চি কাটা ছিল। বাঁচার জন্যে মা, মা বলে চিৎকারও করেছিল। কিন্তু বাঁচতে পারেনি। আরিফার অসুস্থ মা আর ভাইবোন ছাড়া আসলে আর কারো বোঝার ক্ষমতা নেই রবিন কতোটা নির্মমভাবে আরিফাকে খুন করেছে। বোঝার ক্ষমতা নেই এই রাষ্ট্রেরও। তবে রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব এখন খুনি রবিনকে দ্রুত গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা। খুন করে খুনি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নির্বিঘ্নে থাকবে এটি কোনোভাবেই হতে পারে না। পুলিশের উচিত সমস্ত ধরণের কৌশল অবলম্বন করে দ্রুত খুনি রবিনকে গ্রেফতার করে শাস্তি প্রদান করা। কেননা রবিন টার্গেট করেই খুন করেছে আরিফাকে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)








