বাবা-মায়েরা প্রত্যেকদিন সকালে তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠায় শিক্ষিত করার জন্য, কাজের প্রতি, নতুনত্বের প্রতি ও সৃষ্টিশীলতার প্রতি উৎসাহিত করার জন্য। এর চেয়েও বড় ব্যাপার হলো এই সন্তানরা যেকোনো ক্ষতি থেকে নিরাপদ থাকবে। ছেলেরা স্কুলে যায় বাবা-মায়ের অনুপস্থিতিতে গ্রেফতার হতে বা তাদের এবং কোনো আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নয়।
বাড়িতে তৈরি ঘড়ি নিয়ে স্কুলে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ১৪ বছরের বালক আহমেদ মোহাম্মদকে সন্ত্রাসী সন্দেহে গ্রেফতার নিয়ে ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানে লেখা এক নিবন্ধে এসব কথা বলেছেন ‘ন্যাশনাল অ্যাডভোকেসি ফর দ্য ন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর আরব আমেরিকান কমিউনিটিস (এনএনএএসি) ও এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অফ দ্য আরব আমেরিকান অ্যাসেসিয়েশন অফ নিউইয়র্ক এবং দ্য ক্যাম্পেইন টু টেক অন হেট’র শীর্ষ সংগঠক লিন্ডা সারসুর।
তিনি বলেন, তিনটি পাবলিক স্কুলের ছাত্রের মা ও একজন মুসলিম হিসেবে বলছি, আহমেদের উপর জুলুম করা হয়েছে। তাকে বাসায় তৈরি একটি ঘড়ির জন্য তার ক্লাসমেটদের সামনে হাতে হাতকড়া পড়িয়ে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়।
আমি এই জন্য আতংকিত যে, কর্মকর্তারা কোনো প্রটোকল মানেননি। এটা মুসলিম শিশু এবং মুসলিমদের জন্য আলাদা একটা বিচার ব্যবস্থার মতোই। আমার হৃদয় ভেঙে যায় যখন আহমেদ বলে যে, সে যন্ত্র সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করতে ভালোবাসে এবং সে কি করতে পারে তা তার শিক্ষককে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলো।
লিন্ডা বলেন, আমি এই অল্প বয়স্ক ছেলের সঙ্গে করা আচরণ নিয়ে যতোটা না আতংকিত তার চেয়ে বেশি আতংকিত যে, স্কুলের শিক্ষক এমনকি পুলিশ পর্যন্ত একটি ঘড়ি এবং নকল বোমা সনাক্ত করতে পারল না। আহমেদের সাথে তার নিজের শিক্ষকদের আচরণ আমেরিকার মুসলিম, মুসলিম ছাত্র, ভালো কিছু উদ্ভাবনের আগ্রহী, সংস্কারক ও প্রকৌশলীদের আসলে কি বার্তা দিচ্ছে?
তিনি বলেন, আমরা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছি। কিন্তু আমার অনুমান মুসলিম বাচ্চারা এই ব্যয় থেকে ভালো কিছু দাঁড় করতে পারবে না।
নতুন একটি উদ্ভাবনের জন্য শিশু ছাত্রকে তার শিক্ষক কারাগারে পাঠাতে পারেন এই বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়ে যে, সেই ছাত্র আমেরিকান সুদানী এবং মুসলিম। তাদের ভাষায় কেবল আমেরিকানরা অনেক ভালো। বিরোধী মুসলিম ধর্মান্ধতা এবং ইসলামোফোবিয়ায় এরা জরজর।
ঘটনাটির পর আরভিং স্কুল কর্মকর্তাদের যুক্তিহীন প্রতিক্রিয়া, টেক্সাস এক ছাত্র, এক স্কুল, এক শহর বা এমনকি একটি রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ২০১৫ সালে কেউ যদি আরব আমেরিকানদের এবং আমেরিকান মুসলিমদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধতার উদাহরণ দিতে চান আপাতদৃষ্টিতে এটি দিয়ে পার পেতে পারেন। আমাদের বিরুদ্ধে ধর্মান্ধতা গ্রহণযোগ্য (কখনো কখনো এমনকি রাজনৈতিক প্রয়োজনে) নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, পাবলিক অফিস, বুদ্ধিজীবী অথবা তাদের টেলিভিশন রেটিংয়েও এটা হয়।
লিন্ডা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম এবং শিশুরা তাদের বিশ্বাস এবং ধর্মের কারণে প্রতিদিনই বিদ্বেষের শিকার হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা দেখে মসজিদের সামনে অন্ত্র হাতে তাদের ছবি পোস্ট করা, ছবিতে তাদের নিয়ে বাঁধাধরা এক ধরনের গল্প দেখানো হয় এবং সন্ত্রাসী ও মুসলমানদের সমভাবে গণ্য করা হচ্ছে।
তিনি লিখেছেন, যাদের সাথে কাজ করি তাদের প্রশ্ন শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। অনেক আরব-আমেরিকান, আমেরিকান মুসলিম অথবা সাউথ এশিয়ান তারা সবাই প্রশ্ন করে, ‘তারা (আমেরিকান) কেনো আমাদের ঘৃণা করে? আমরা কিভাবে আমাদেরকে তাদের মতো করে তুলতে পারবো?
আহমেদ মোহামেদ আমার নিজের সহ আমাদের অনেক শিশুদের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে বালক, মেধাবী মানুষ যে নতুন কিছু উদ্ভাবন করতে চায়। তার একটি অগোছালো বেডরুম, একটি নাসা টি-শার্ট আছে। বাবা তাকে ভালোবাসেন এবং তাকে সঠিক জিনিস শেখাতে চান।
আহমেদ এবং তার মতো সব শিশু মর্যাদা এবং সম্মানের সঙ্গে আচরণের প্রাপ্য। তাদের ক্ষমতার মধ্যে আমাদের বিশ্বাস প্রদর্শন করা আবশ্যক। লিন্ডা বলেন, আহমেদের মতো একজন অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিংবা কাউকেই ষড়যন্ত্রের জন্য দায়ী করা উচিত হবে না।
শেষে লিন্ডা বলেন, আহমেদের সাথে করা এই ধরনের আচরণ পুরো সম্প্রদায়ের জন্যই অগ্রহণযোগ্য। তবে একজন নয়, চারপাশে অনেক আহমদই পর্যবেক্ষণে আছে। দয়া করে তাদের আর নিরাশ করবেন না।







